সাজ্জাদ হাত বাড়িয়ে এডমন্ড স্পেনসারের কবিতার বই টেনে নিল। কোন বাছাবাছি না। বই খুললে প্রথম যে কবিতাটি বের হবে সেটাই পাঠ করা হবে। পাঠ এবং তাৎক্ষণিক অনুবাদ। লীলাবতী পাশে থাকলে ভাল হত। তাকে বলা যেত–লীলা তুমি হাতে কলম নাও। নাচের মুদ্রার মত কলামটা ধর যেন এটা কলম না, এটা একটা পদ্মফুল। তারপর আমি যা বলব তুমি লিখে ফেলবে। কবিতার পালা শেষ হলে নাচ হবে–তুমি নাচবে আমি দেখব। ঘরে বাতি থাকবে না। তুমি নাচবে অন্ধকারে আমি অন্ধকারেই তোমাকে দেখার চেষ্টা করব। পৃথিবীর প্রকৃত রূপ লুকিয়ে থাকে অন্ধকারে। কারণ কল্পনার জন্ম অন্ধকারে, পরাবাস্তবে। সাজ্জাদ বই খুলল—
Unhappy verse, the witness of my unhappy state,
লীলাবতী তাড়াতাড়ি লেখ–
অসুখী পংক্তিমালা, দেখো দেখো আমার অসুখ দেখো।
হচ্ছেনা অসুখী পংতিমালা অসুখ দেখবে না। সে অসুখের সাক্ষি হবে। তাছাড়া পংক্তিমালা কখনো অসুখী হয় না … এডমন্ড স্পেনসার সাহেব এইসব কি হাবিজাবি লিখছেন?
বরিশালের ছায়াময় শহরের জীবনানন্দ দাস কি বলেন?
নির্জন আমের ডালে দুলে যায়–দুলে যায়–বাতাসের সাথে বহুক্ষণ।
শুধু কথা, গান নয়–নীরবতা রচিতেছে আমাদের সবের জীবন।
মন্দ না–নীরবতা রাচিতেছে আমাদের সবের জীবন। এক আশ্চর্য নীরবতা আমাদের ভেতর অথচ আমরা বাস করি সরব পৃথিবীতে। এক আশ্চর্য অন্ধকার আমাদের ভেতর–অথচ আমরা বাস করি আলোর ভুবনে। মাতৃজঠরের অন্ধকারের স্মৃতি মাথায় নিয়ে আমরা আলোর আরাধনা করি। উল্টোটা করাই কি যুক্তিযুক্ত না?
সাজ্জাদ ড্রয়ার খুলল। তার পা টলছে, হাত কাঁপছে তাকে কেমন যেন নেশাগ্ৰস্ত মনে হচ্ছে। অথচ সে কোন নেশা করেনি। এখন করবে। আফিং-এর একটা ডেরিভেটিভ শরীরে ঢুকিয়ে দেবে। মরফিনকে এসিটিক এনহাইড্রাইড দিয়ে মিশিয়ে যে বস্তুটি তৈরি করা হয়েছে যার নাম হেরোইন। হেনরিখ ড্রেসার সাহেবের মহান (?) আবিহুকার! যখন প্রথম তৈরি করা হল তখন পৃথিবীর প্রথম সাড়ির বিজ্ঞানীরা মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন–এটি একটা বড় ধরনের আবিষ্কার। এই আবিষ্কার ব্যবহৃত হবে মানব কল্যাণে। আজ উল্টোটা হয়েছে। হেনরিখ ড়েসার সাহেব ফ্রাংকেনস্টাইন তৈরি করেছেন।
সাজ্জাদ শাদা পাউডারের দ্রবণ তৈরি করল খুব সাবধানে। পাকা কেমিষ্টের মত। হাইপারডারমিক সিরিঞ্জে দ্রবণটা ঢুকাল। এই কাজটিও করা হল নিখুঁতভাবে। এখন শুধু শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া–ব্যাপারটা দুভাবে করা যেতে পারে। চামড়ার নিচে ঢুকিয়ে দেয়া, কিংবা সরাসরি কোন রক্তবাহী শিরায় ঢুকিয়ে দেয়া। রক্তে ঢোকার সঙ্গে সমস্ত শরীর কেঁপে উঠবে। প্রচণ্ড একটা ঝড় শরীরের উপর দিয়ে বয়ে যাবে। শরীরের প্রতিটি জীবকোষ এক সঙ্গে নেচে উঠবে।
লীলাবতী তুমি কি এই নাচের খবর জান? না, তুমি এই নাচের খবর জান না। এ এক অদৃশ্য নাচ।
তারপরের সময়টা নৃত্যক্লান্ত নর্তকীর অবসাদের মত। সে অবসাদও আনন্দময় অবসাদ। এক ধরনের মুক্তি। সরব পৃথিবী থেকে মুক্তি, আলো থেকে মুক্তি। উল্টো যাত্রা।
If in bed, tell her that my eyes can take not rest :
If at board, tell her that my mouth can eat no meat;
If at her virginals, tell her I can heat no mirth.
এটা করে কবিতা? কে আবৃত্তি করছে? সাজ্জাদ কুণ্ডুলি পাকিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। খোলা জানোলা দিয়ে শীতল হওয়া আসছে। শীত লাগছে। শরীর কাঁপিছে। ভাল লাগছে। খুব ভাল লাগছে। যিনি কবিতা আবৃত্তি করছেন তার কণ্ঠ ভরাট। কে এই ভদ্রলোক কে? ঘরে বাতি জ্বলছে। বাতির আলো ধীরে ধীরে কমে আসছে। কি সুন্দর করেই না আলো কমছে। আহ অন্ধকারের দিকে যাত্রা এত আনন্দময়?
সাজ্জাদ চোখ বন্ধ করে গাঢ় স্বরে বলল, লীলাবতী এসো, তুমি এসো। বিছানায় উঠে এসো। না আমাকে স্পর্শ করার কোন দরকার নেই। তুমি শুধু তাকিয়ে থাক আমার দিকে–আমি তাকিয়ে থাকবে তোমার আশ্চর্য সুন্দর চোখের দিকে। তুমি জান তোমার চোখের দিকে তাকালে আমি কি দেখি? I can see the universe. তুমি কি একটা কাজ করতে পারবে? তোমার চোখ দুটা আমাকে দিয়ে দেবে? তোমার শরীর তোমারই থাকুক। সেই শরীর নিয়ে যত ইচ্ছা তুমি নেচে বেড়াও শুধু চোখ দুটা আমাকে দিয়ে দাও। আমি একটা হরলিক্সের কৌটায় দুটা চোখ রেখে দেব। না চোখ নষ্ট হবে না। আমি ফরমালিনে ড়ুবিয়ে রাখব। তুমি কি জান ফরমালিন কি? ফরমালিন হচ্ছে ফাইভ পার্সেন্ট ফরমালডিহাইডের দ্রবণ।
এর রাসায়নিক সংকেত হচ্ছে–HCHO
সাজ্জাদ নিজের মনেই হাসল। ঘরের আলো আরো কমে আসছে–সুন্দর একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কে এসেছে। ঘরে? লীলাবতী? তার কি হেলো সিনেশন হচ্ছে? মরফিন ডিরিভেটিভের কি হেলো সিনেটিং এফেক্ট আছে? সাজ্জাদ বিড় বিড় করে বলল, এসো লীলাবতী, এসো!
সুন্দর একটা গান ছিল না ঘরে আসা নিয়ে? এসো আমার ঘরে এসো, . . এই জাতীয়। গানের সুর মাথায় আসছে, কথা আসছে না। আবার যখন কথা মনে আসছে তখন সুর মনে আসছে না। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্রের মত। যখন গতি জানা যায় তখন অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। দুটি অনিশ্চয়তার গুনফল সমান h প্ল্যাংক কনসটেন্ট। এই ভদ্রলোক ১৯০৫ সনে জার্মান ফিজিক্যাল সোসাইটির মিটিং-এ বলেছিলেন–আচ্ছা মাথার মধ্যে অংক ঘুরছে কেন? গান কোথায় গেল? গান?’
এসো আমার ঘরে…
মিলির বিয়ে
মিলির বিয়ে বেশ স্বাভাবিকভাবে হয়ে গেল। বাঙালী বিয়ে যেভাবে যেভাবে হওয়া উচিত সেভাবেই হল। গায়ে-হলুদে মাছ পাঠাল বরের বাড়ি থেকে। সেই মাছ সাইজে প্রকাণ্ড হল না। মাঝারি সাইজের কাতল। মিলির মামি বললেন, মনে হচ্ছে ফকিরের পুল। সরপুটি পাঠিয়ে দিয়েছে।
