সাজ্জাদ নিতান্ত পরিচিতজনের মত ঘরে ঢুকে পড়ল। এখানে সে অবশ্যি খুব অপরিচিতও নয়। এর আগে সে চারদিন কাটিয়ে গেছে। ঘর-দুয়ার আগে যেমন ছিল এখনো সে রকমই আছে। সেই স্টেভি, সেই থালা-বাসন। জানালায় সেই আগের রঙজ্বলা হলুদ পর্দাঁ। দেয়ালে মাকড়সার ঝুল। মাকড়সার ঝুলের পরিমাণও স্থির। বাড়েওনি, কমেওনি। এই বাড়িটায় সময় মনে হয় স্থির হয়ে আছে। সাজ্জাদ আবার বারান্দায় এল।
মোসাদ্দেক ভাই!
হুঁ।
কণা কি এর মধ্যে এসেছিল?
না।
ন্যুড ছবির ফরমাশ এখন আর পান না?
না।
চায়ের সরঞ্জাম কি আছে?
না।
চা খেতে চাইলে কি করেন–দোকানে বলে আসেন?
হু।
আপনার এখানে আসার আমার একটা বিশেষ উদ্দেশ্য আছে মোসাদ্দেক ভাই।
আচ্ছা।
উদ্দেশ্যটা হচ্ছে–আমার একটা নুড পোট্রেট দরকার। আপনি পোট্রেটের জন্য কত নেন?
চার হাজার।
আমি আপনাকে চার হাজারের অনেকে বেশি দেব। আমাকে ভালমত এঁকে দিতে হবে।
আচ্ছা পোটেন্টটা কার–কণার?
না। কণার না। তবে কণাকে আপনি মডেল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যার পোট্রেট সে কখনো মডেল হবে না।
আচ্ছা। ঐ মেয়েটির মুখের ছবি লাগবে। বড় ছবি। সামনাসামনি ছবি এবং প্রোফাইলের ছবি।
আমি জোগাড় করে দেব। একটা ছবি শেষ করতে কতদিন লাগে?
আমি দ্রুত কাজ করি। সময় লাগে না। ধর এক সপ্তাহ। তবে ভাল করে আঁকতে সময় লাগে।
আপনি সময় নিন। কিন্তু খুব ভাল করে আঁকবেন। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড কি রকম হবে আপনাকে বলে দেব?
দাও। আমি ফরমায়েশী কাজই করি। নিজের ইচ্ছায় কিছু আঁকি না।
মনে করুন। একটা নির্জন বন। সাধারণ বন না–কদম্ব বন। বর্ষাকাল। গাছ ভর্তি কদম ফুল ফুটেছে। কদম্ব বনের মাঝখানে ছোট্ট একটা পুকুরের পাড়ে মেয়েটি নাচছে। আপন মনে নাচছে। যেহেতু চারপাশে কেউ নেই সেহেতু মেয়েটি তার নগ্ন শরীর নিয়ে চিন্তিত নয়। আমি কি দৃশ্যটা আপনাকে বুঝাতে পেরেছি?
হুঁ। ছবির সময়টা কি?
সন্ধ্যা। গাছের মাথায় সন্ধ্যার শেষ আলো পড়েছে।
আকাশ দেখা যাচ্ছে?
না। তবে পুকুরের জলে আকাশের ছায়া পড়েছে।
জটিল ছবি। আঁকতে সময় লাগবে।
আপনি সময় নিন। আমার কোন তাড়া নেই। আপনি চার হাজার চেয়েছেন–আমি দশ হাজার টাকা নিয়ে এসেছি। টাকাটা কি এখন দেব?
দাও।
সাজ্জাদ টাকা বের করে দিল। মোসাদ্দেক সাহেব টাকা হাতে নিলেন। দুবার গুনলেন। তারপর পাঞ্জাবি গায়ে বের হয়ে গেলেন। কোথায় যাচ্ছেন সাজ্জাদকে বলে গেলেন না। তার বুড়ো হাতের আঙুলের রক্ত আবার ফোটা ফোটা পড়তে শুরু করেছে। মোসাদ্দেক সাহেবের ভুরু কুঁচকে আছে। এক নাগাড়ে অনেকখানি রক্ত পড়লে ভাল হত। এক্সপেরিমেন্টটা করা যেত। শুধু শুধু রক্তটা নষ্ট হচ্ছে।
সাজ্জাদ রাত দুটায় লীলাবতীকে টেলিফোন করল। লীলাবতী ঘুমুচ্ছিল। সে টেলিফোন ধরল আধো-ঘুম ও আধো-তন্দ্রায়।
হ্যালো, কে?
আমি সাজ্জাদ–তুমি কি ঘুমুচ্ছিলে?
হুঁ।
ঘুম ভাঙালাম?
হুঁ।
দুঃখিত লীলাবতী।
দুঃখিত হবার দরকার নেই। কেন টেলিফোন করেছেন?
তুমি ঘুমুচ্ছ না জেগে আছ, এটা জানার জন্যে।
যা জানার তা তো জেনে গেছেন। এখন কি টেলিফোন রেখে দেবেন?
না, কিছুক্ষণ গল্প করব। আমার ঘুম আসছে না। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে।
আমার কথা মনে পড়ল?
ঠিক তাও না। তুমি তোমার টেলিফোন নাম্বার দেয়ালে লিখে রেখে গিয়েছিলে। চোখের সামনে নাম্বারটা জ্বলজ্বল করছে।
দেয়াল নষ্ট করার জন্যে দুঃখিত।
জন্মদিনের পার্টি থেকে যে ঘাড় ধরে বের করে দিলে তার জন্যে দুঃখিত না?
না। আমি খুব খুশি হব। যদি আর কখনো আমাদের বাড়িতে না আসেন।
আচ্ছা আসব না। দেয়ালে লেখা টেলিফোন নাম্বারটা কি মুছে ফেলব?
না, এটা থাকুক। এই নাম্বারটা ঘুমের অষুধ হিসেবে ব্যবহার করবেন। ঘুম না এলে টেলিফোন করবেন।
টেলিফোন করলে অসুবিধা নেই?
না, তাতে অসুবিধা নেই। দূর থেকে আপনি চমৎকার মানুষ। কাছ থেকে না। খুব কাছ থেকে যে আপনাকে দেখতে যাবে সেই একটা শক খাবে।
আমার নিজেরো তাই ধারণা। আচ্ছা শোন লীলাবতী, তোমার নাচ বিষয়ে একটা কথা।
নাচ প্ৰসঙ্গ থাক। অন্য প্রসঙ্গ আলোচনা করুন—
সামান্য একটা প্রশ্ন। এক অক্ষরে জবাব দেয়া যায় এ রকম।
প্রশ্নটা কি? তুমি কি সম্পূর্ণ নিজের আনন্দে একা একা কখনো নাচ? মানুষ যেমন একা একা গান গায় সে রকম?
হ্যাঁ, নাচি।
এখন বল একা একা যখন নাচ তখন কি সামনে কাউকে কল্পনা করে নিতে হয়?
লীলাবতী চুপ করে রইল। সাজ্জাদ আগ্রহের সঙ্গে বলল, চুপ করে আছ কেন? বল।
লীলাবতী নিচু গলায় বলল, হ্যাঁ, কল্পনা করে নিতে হয়।
কাজেই চিন্তা করে দেখা নৃত্যকলা এমন এক বিদ্যা যা সৃষ্টি হয়েছে অন্যের জন্যে। গান কিন্তু নিজের জন্যেও।
নৃত্যকলা নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি না।
আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি কি তোমার কয়েকটা ছবি আমাকে দেবে?
কি দেব?
ছবি। ফটোগ্রাফ।
কেন?
আছে, আমার একটা কাজ আছে। তিনটা ছবি–একটা সামনে থেকে, দুটা প্রোফাইল। লেফট প্রোফাইল এবং রাইট প্রোফাইল।
লীলাবতী গম্ভীর গলায় বলল, কেন চাচ্ছেন আগে বলুন।
সাজ্জাদ বলল, আগে বলব না। আমি টেলিফোন রেখে দিচ্ছি। ভাল থেকো।
ভাল লাগছে না। কিছু ভাল লাগছে না। ভয়ংকর কিছু করতে ইচ্ছে করছে। ভয়ংকর কিছু। ঈশ্বর মানুষকে ভয়ংকর কোণ্ড করার ক্ষমতা দিয়ে পাঠান। কিন্তু বার বার বলে দেন–তোমরা ভয়ংকর কিছু করো না। সাবধান, সাবধান, সাবধান। তিনি যদি চাইতেন মানুষ ভয়ংকর কিছু করবে না। তাহলে তাদের সেই ক্ষমতা না দিলেই পারতেন। তাদের প্রজাপতি বানিয়ে হত। তারা রঙ্গিন পাখা মেলে ফুলে ফুলে উড়বে। কোনদিন ভয়ংকর কিছু করতে পারবে না।
