নীতু তার কাপড় না ছেড়েই কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসেছে। আতাহারকে সে অতি দ্রুত একটা চিঠি লিখছে। চিঠিটা সে আজই তার হাতে দিয়ে দেবে। অনেক কথা মুখে বলা যায় না। চিঠিতে খুব সহজে বলে ফেলা যায়। সবচে ভাল হত চিঠিটা যদি ইংরেজিতে লিখতে পারত। ভাষার আড়াল পর্দার মত কাজ করত। I love you যত সহজে বলা যায়–আমি তোমাকে ভালবাসি। তত সহজে বলা যায় না। মুখের কাছে এসে আটকে যায়। ভালবাসাবাসির কথা বলার জন্যে অন্য এক ধরনের ভাষা থাকলে ভাল হত। সাইন ল্যাংগুয়েজের মত কোন ল্যাংগুয়েজ। যে ল্যাংগুয়েজে শুধু চোখ ব্যবহার করা হবে।
আতাহার ভাই,
খুব জরুরী কথা। খুব জরুরী। আপনি কি জানেন আমার ড্রয়ারে ২১৫টা ফনোবারবিটন ট্যাবলেট আছে? ট্যাবলেটগুলি আমি অল্প অল্প করে জমিয়েছি। যেদিন আমার গায়ে-হলুদ হবে সেদিন রাতে আমি ট্যাবলেটগুলি খাব। এর মধ্যে একটা তবে আছে। তবেটা হচ্ছে–আপনি যদি আমার ঘরে এসে আমাকে বলেন, নীতু, তোর ট্যাবলেটগুলি আমাকে দে। তাহলে আমি দিয়ে দেব এবং তখন অনেক রকম পাগলামি করব। যেমন আপনাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদব বা অন্য কিছু যা এই মুহুর্তে ভাবতে পারছি না। বা ভাবতে পারলেও বলতে পারছি না।
ইতি
নীতু
নীতুর হাত এত কাঁপছে যে হাতের লেখা হয়েছে জঘন্য। অক্ষরগুলি হয়েছে বড়ছোট। বানান ঠিক আছে কিনা কে জানে! নিৰ্ঘাত অনেকগুলি বানান ভুল হয়েছে। খুব সুন্দর একটা চিঠিও ভুল বানানের জন্যে জঘন্য হয়ে যায়। প্রথম বাক্যের দুটা বানানই তো মনে হচ্ছে ভুল–জরুরী বানান কি? হ্রস্ব-ইকার না। দীর্ঘ-ঈ কার?
তার শোবার খাটের কাছেই শেলফে চলন্তিকা থাকে। আজ সেটাও নেই। ডিকশনারি তো গল্পের বই না। কে নেবে ডিকশনারি? আশ্চর্য তো!
চিঠিটা নীতু চতুর্থবারের মত পড়ল। পুরো চিঠিতে ট্যাবলেট শব্দটা চারবার আছে। কি বিশ্ৰী লাগিছে! চিঠিটা কেমন ন্যাকা। ন্যাকা হয়ে গেছে। বাংলা ভাষাটা এমন যে আবেগ নিয়ে কিছু লিখলেই ন্যােকা ন্যাক ভােব চলে আসে। চিঠিটা বরং ইংরেজিতেই লেখা যাক। নীতু আরেকটা কাগজ নিল। কেন জানি তার সারা শরীর ঘািমছে। বুক ধক ধক করছে–। মনে হচ্ছে তার কঠিন কোন অসুখ করেছে—
Dear Ataha Bhai,
I have something important to discuss. Very important. Do you know I have 215 sleeping pills hidden somewhere in my drawer …
নীতু চিঠি হাতে নিচে নেমে এল। হোসেন সাহেব একা একা বসে আছেন। নীতু বলল, আতাহার ভাই কোথায়? হোসেন সাহেব বললেন, ওতো অনেক আগেই চলে গেছে।
নীতু বলল, ও আচ্ছা।
হোসেন সাহেব বললেন, তুই এরকম করছিস কেন? তোর কি হয়েছে? ঘেমে— টেমে কি অবস্থা। আজ তোদের ডিনার কেমন হয়েছে?
অসাধারণ হয়েছে বাবা।
বোস, গল্প করি।
নীতু বাসল, আবার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়াল। হোসেন সাহেব বললেন, কোথায় যাচ্ছিস?
নীতু বলল, বাগানে। আমার খুব গরম লাগছে। চিঠিটা সে কুচ কুচি করে ছুড়ে ফেলল। সাদা টুকরাগুলি কেমন যেন শিউলি ফুলের মত লাগছে। তাদের বাগানে প্রকাণ্ড একটা শিউলি গাছ ছিল। গাছটা কেটে ফেলা হয়েছে। শুয়োপোকার জন্যে কাটা হয়েছে। শিউলি গাছে খুব শুয়োপোকা হয়। নীতুর মনে হচ্ছে তার শিউলি ফুলের মত কাগজের টুকরোগুলির উপর দিয়ে শুয়োপোকা হেঁটে যাচ্ছে।
মোসাদ্দেক সাহেব
মোসাদ্দেক ভাই, আমাকে চিনতে পারছেন?
মোসাদ্দেক সাহেব বারান্দায় একটা জলচৌকির উপর বসে আছেন। ওয়েল কালারের হলুদ রঙের একটা টিউবের মুখ জ্যাম হয়ে গেছে। হাজার টিপটিপি করেও রঙ বের করা যাচ্ছে না। তিনি বটি দিয়ে মুখটা কেটেছেন। মুখ কাটতে গিয়ে বা হাতের বুড়ো আঙুল কেটে গেছে। ফোটা ফোটা রক্ত পড়ছে। তিনি মুগ্ধ হয়ে বুক্তের রঙ দেখছেন। রঙটা তার কাছে আশ্চর্য সুন্দর লাগছে। ওয়েল কালার কি রক্তে ডিজলভড হবে? তাহলে তার্পিনের বদলে থিনার হিসেবে রক্ত ব্যবহার করা যেত ওয়েল কালারে ব্যবহার না করা গেলেও ওয়াটার কালারে নিশ্চয়ই ব্যরহার করা যাবে। তবে রক্তের রঙ স্থায়ী না–কিছুক্ষণের ভেতর কালচে হয়ে যায়। এতে অন্য রকম একটা এফেক্ট হতে পারে। বিভিন্ন রঙের সঙ্গে রক্ত মিশিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করা যেতে পারে। তার জন্যে অনেকখানি রক্ত দরকার। বুড়ে আঙুল থের্কে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। আরো কিছু রক্ত পড়লে ভাল হত। আঙুলটা আরেকটু বেশী কাটলে ভাল হত। এর কাটল কেন?
মোসাদ্দেক সাহেব যখন রক্ত নিয়ে এই জাতীয় চিন্তা-ভাবনা করছিলেন তখনই সাজ্জাদ এসে বলল, আমাকে চিনতে পারছেন? গভীর চিন্তায় বাধা পেলে যে-কেউ বিরক্ত হয়। মোসাদ্দেক সাহেব হন না। তিনি চিন্তাটাকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন। আবার অবসর মত শুরু করেন।
মোসাদ্দেক ভাই, আমাকে চিনতে পারছেন?
মোসাদ্দেক সাহেব বললেন, কেমন আছ সাজ্জাদ?
জ্বি ভাল। আপনি দেখি আঙুল কেটে ফেলেছেন।
হুঁ।
অনেক রক্ত পড়েছে। এতটা কাটল কি ভাবে?
দা দিয়ে।
আপনার শরীর ভাল মোসাদ্দেক ভাই?
হ্যাঁ, শরীর ভাল।
আমার তো দেখে মনে হচ্ছে খুব কাহিল। অসুখ-বিসুখ না-কি?
বেশ কিছুদিন থেকে বুকে ব্যথা হচ্ছে। মনে হয় লাংস ক্যানসার।
এখনো কি হচ্ছে?
না।
আমি আপনার জন্যে দুবোতল হুইস্কি নিয়ে এসেছি। ভালটা পেলাম না–হাতের কাছে যা পেয়েছি–এনেছি। হানড্রেড পাইপার।
আচ্ছা।
তিনি এমনভাবে আচ্ছা বললেন যে খুশি হলেন কি বোজার হলেন বুঝতে পারা গোল না। আসলে তিনি রক্ত নিয়ে চিন্তা ভাবনা আবার শুরু করতে যাচ্ছেন।
