কাজের মেয়েটি এসে জানাল, ভাত দেয়া হয়েছে। হোসেন সাহেব আতাহারকে নিয়ে খেতে গেলেন। তাকে খুব আনন্দিত মনে হল। বেগুন ভাজা খেতে ভাল হয়েছে। এতটা ভাল হবে তিনি আশা করেননি। বেথুন এবং ঘিয়ের গন্ধ মিলে অপূর্ব গন্ধ বেরুচ্ছে।
আতাহার!
জ্বি চাচা।
বেগুনভাজা কেমন লাগছে?
অসাধারণ।
তোমার চাচীর হাতের বেগুনভাজা একদিন তোমাকে খাওয়াতে পারলে বুঝতে কি জিনিস। সেটা সম্ভব না। কেন সম্ভব না তা নিশ্চয়ই জান।
জ্বি জানি।
আমাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ নেই। যোগাযোগ না থাকাই অবশ্যি ভাল। তবে ঠিক করেছি, নীতুর বিয়ের খবরটা তাকে টেলিফোনে দেব। হাজার হলেও সে মা। নিজের মেয়ের বিয়ের খবর জানার অধিকার তার আছে। তাই না?
জ্বি।
বিয়ের কার্ড হাতে নিজেই যদি যাই সেটা কি খারাপ হবে?
জ্বি না।
তাই করব। কার্ডটা দিয়ে চলে আসব। খুব বেশি হলে এক কাপ চা খাব। সাধারণ ভদ্রতার কিছু কথা–কেমন আছ, ভাল আছি। টাইপ। তারপর চলে আসা। তোমাকে নিয়েই না হয় যাব।
আমাকে নিয়ে যাবার দরকার কি চাচা?
তৃতীয় একজন ব্যক্তি থাকলে কথাবার্তা বলার সুবিধা হয়–এই আর কি। তুমি যেতে না চাইলে–থাক।
আপনি বললে আমি অবশ্যি যাব।
আতাহার!
জ্বি।
তুমি কি হাতদেখা-টেখা এইসবে বিশ্বাস কর?
কেন বলুন তো চাচা?
একজন খুব ভাল পামিস্টকে আমি হাত দেখিয়েছিলাম–নাম হল জ্যোতিষ ভাস্কর অভেদানন্দ। কথাবার্তা শুনে শুরুতে মনে হয়েছিল ফ্রড। পরে দেখলাম, ফ্রড না। ভাল জানেন। তিনি আমাকে বললেন, আফটার সিক্সটি সেভেন আমার জীবন খুবই আনন্দময় হবে।
তাই নাকি?
কিভাবে তা হবে কে জানে। উনি আমাকে একটা এমেথিস্ট পাথর ব্যবহার করতে বলেছেন।
ব্যবহার করছেন?
পাথর আনিয়েছি–ভাবছি। একটা আংটি করব। ক্ষতি তো কিছু নেই–তাই না? আমাদের নবী নিজেও না-কি আকিক পাথর ব্যবহার করতেন। পাথরের একটা গুণাগুণ তো থাকতেই পারে। পারে না?
জ্বি পারে।
বৃদ্ধের প্রতি গভীর মমতায় আতাহারের চোখ ভিজে উঠার উপক্রম হল। খাওয়া শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই সে চলে গেল না। চুপচাপ বসে হোসেন সাহেবের কথা শুনতে লাগল।
মৃত্যু সম্পর্কিত আরেকটি কোটেশন হোসেন সাহেবের মনে পড়ে গেছে। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলছেন–
আতাহার শোন, বেকনের একটা প্রবন্ধ আছে মৃত্যু বিষয়ে। প্রবন্ধটার নাম–Essay on death. বেকন সেখানে বলছেন–Heaven gives its favourities—early death, অর্থটা হচ্ছে–অল্প বয়সে তারাই মারা যায় যারা প্রকৃতির প্রিয় সন্তান। তোমার বাবা অবশ্যি অল্প বয়সে মারা যাননি–পরিণত বয়সে মারা গেছেন। তবু সন্তানের কাছে এই মৃত্যুও গ্রহণযোগ্য না। কেউ দেড়শ বছর বাঁচার পরেও তার সন্তান কাঁদতে কাঁদতে বলবে–বাবা, কেন এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন।
আতাহার একবার ভাবল বলে, চাচা, এটা কবি বায়রনের লাইন বলে একটু আগেই আপনি আমাকে শুনিয়েছেন। তারপর ভাবল, কি দরকার? কথাটাই আসল, কে বলল সেটা কোন ব্যপার না। এই জাতীয় কথা অন্যের মৃত্যুতে একজন রিকশাওয়ালাও বলে। যেহেতু সে রিকশা চালায়–তার কথা কোটেশন হিশেবে ব্যবহার করা হয় না।
আতাহার!
জ্বি চাচা।
তোমাকে আমি অত্যন্ত পছন্দ করি।
সেটা চাচা আমি জানি।
শুধু আমি একা না, এই পরিবারের সবাই তোমাকে পছন্দ করে। শুধু নীত্র ব্যাপারটা বলতে পারছি না। ও অবশ্যি খুব চাপা মেয়ে… আতাহার, কফি খাবে?
জ্বি না।
খাও, একটু কফি খাও। খাওয়া-দাওয়ার পর কফি হজমের সহায়ক। নিউজ উইক পত্রিকায় একবার পড়েছিলাম। অল্প পরিমাণে কেফিন হাটের জন্যেও ভাল। হাটের রক্ত সঞ্চালন এতে ভাল হয়।
নীতু ফিরে এসেছে। নীতুর পেছনে পেছনে আসছে কামাল। নীতুর হাতে একটা বেলীফুলের মালা। কামাল কিনে দিয়েছে। আতাহারকে দেখে কামালের ভুরু কুঁচকে গেল। চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেল। নীতু বলল, আতাহার ভাই, আপনি এত রাত পর্যন্ত আছেন? আপনার কি ঘর-সংসার বলে কিছু নেই? আশ্চর্য!
হোসেন সাহেব মেয়ের উপর খুব বিরক্ত হলেন। মেয়েটা আতাহারের সঙ্গে এত খারাপ ব্যবহার করে কেন? মৃত্যুশোকে কাতর একটা মানুষের সঙ্গে মমতা ও ভালবাসা নিয়ে কথা বলা দরকার–এই সহজ সত্যটা তার মেয়ে জানবে না কেন?
হোসেন সাহেব কামালের দিকে তাকিয়ে বললেন, কামাল বাবা, দাঁড়িয়ে আছ কেন? বস।
জ্বি না, আমি বসব না, চলে যাব।
তোমাদের ডিনার কেমন হয়েছে?
জ্বি ভাল হয়েছে।
আতাহারের সঙ্গে কি তোমার পরিচয় হয়েছে? অতি ভাল ছেলে।
কামাল শুকনো গলায় বলল, জ্বি, পরিচয় হয়েছে।
নীতু দোতলায় উঠে গেছে। কামালও চলে গেছে। পটে করে কফি দিয়ে গেছে। হোসেন সাহেব কফি ঢালতে ঢালতে বললেন, নীতুর কথায় তুমি কিছু মনে করো না আতাহার।
আমি কিছু মনে করিনি।
অল্প বয়সে মার আদর না পেলে ছেলেমেয়েগুলি অন্য রকম হয়ে যায়। নীতু, সাজ্জাদ এরা দুৰ্ভাগা। অল্প বয়সে এরা মারি ভালবাসা পায়নি।
আপনার ভালবাসা তো পেয়েছে।
সেটা এখনো পাচ্ছে। বাবার ভালবাসায় কোন একটা জিনিসের অভাব আছে। সেই ভালবাসায় কাজ হয় না। অনেকটা খাবারের ভিটামিনের মত। খাবার ঠিক আছে। কিন্তু পাটিকুলার একটা ভিটামিন নেই। তাই না?
আতাহার কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলল, হতে পারে।
সাইকোলজিস্টদের উচিত সেই ভিটামিনটা কি তা খুঁজে বের করা।
জ্বি।
আতাহার মনে মনে বলল, এই ভিটামিনটার নাম হবে–ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স এর মত ভিটামিন-ভি কমপ্লেক্স। ভালবাসা কমপ্লেক্স ভিটামিন।
