Death is the golden key
That opens the palace of eternity.
কথাটা অদ্ভুত না আতাহার?
জ্বি অদ্ভুত। আবার কবি বায়রণ বলেছেন–
Heaven gives its favourites–early death.
আতাহার বলল, সব কোটেশন আপনার মুখস্থ নাকি চাচা?
হোসেন সাহেব আনন্দিত গলায় বললেন, এক সময় ছিল। স্মৃতিশক্তি ভাল ছিল, যা পড়তাম মনে থাকত। এখন স্মৃতিশক্তি পুরোপুরি গেছে। একটা জিনিস একশবার পড়লেও মনে থাকে না।
এত কিছু মনে রাখার দরকারই বা কি?
এটাও ঠিক বলেছ। ভুলে যেতে পারাই ভাল। যে মানুষ কোন কিছু ভুলতে পারে না, সে শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে যায়।
চাচা, আজ উঠি।
বোস বোস, এখনি উঠবে কি? রাতে আমার সঙ্গে ডাল-ভাত খাও। বাসায় কেউ নেই, নীতু গেছে কামালের সঙ্গে। রেস্টুরেন্টে খাবে। কামালের সঙ্গে কি তোমার দেখা হয়েছে?
জি, একদিন দেখলাম।
ছেলেটাকে তোমার কেমন লাগল?
ভাল। খুব ভাল। খুব সুন্দর চেহারা।
কথাবার্তা কেমন মনে হল?
উনার সঙ্গে কথা তেমন কিছু হয়নি।
কামালের কথাবার্তা তেমন ইয়ে না— কমাশিয়াল ধরনের কথা। ওর বড় ভাই এসেছিল, বিয়ের খরচ চায়।
ও।
আমার মনটা খুব খারাপ হয়েছে। বিয়ের আগেই যদি এত টাকা টাকা করে, বিয়ের পরে কি হবে–চিন্তার কথা না?
চিন্তার কথা তো বটেই।
এদিকে পত্রিকা খুললেই দেখি যৌতুকের জন্যে খুন। যতবার দেখি, আঁৎকে উঠি।
আঁৎকে ওঠারই কথা।
নীতুর জন্যে আসলে তোমার মত একটা ছেলে দরকার ছিল।
চাচা, ছেলে হিসেবে আমি থার্ড ক্লাসেরও নিচে ফোর্থ ক্লাস। পরের বাড়ির গুদামে শুয়ে থাকি।
হোসেন সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, গুদামে শুয়ে থাক মানে কি?
আমরা এখন বড় মামার সঙ্গে থাকি। উনার একটা গুদাম আছে নয়া বাজারে। সেখানে ম্যানেজার থাকে আর আমি থাকি।
বল কি? তোমার মা, ভাই-বোন তারা কোথায় থাকে?
মা থাকেন হাসপাতালে। ছোটভাই আর বোন থাকে বড় মামার বাসায়।
তোমার মাকে একদিন দেখতে যাব আতাহার।
জ্বি আচ্ছা।
রুম নাম্বার-টাম্বার–এইসব কাগজে লিখে রেখে যাও। আর শোনা–তোমার গোটা পাঁচেক বায়োডাটা অবশ্যই আমাকে দিয়ে যাবে। দেখি কি করা যায়–তথ্যমন্ত্রীকে দিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা করব। আমার খুবই ঘনিষ্ট জন। দুলু বলে ডাকতাম। নানাভাবে তাকে সাহায্য করেছি। তোমার বায়োডাটা নিয়ে দুলুর হাতে দিয়ে আসব।
বলতে বলতে তাঁর মনে হল–দুলু তাঁর সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করেনি। তিনি তার অফিস থেকে লজ্জিত ও অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। তাতে কি! পুত্রের বন্ধুর জন্যে না হয় আরেকবার অপমানিত হবেন। নিজের স্বাৰ্থ উদ্ধারের জন্যে অপমানিত হওয়ায় লজ্জা আছে, কিন্তু অন্যের উপকারের জন্যে অপমানিত হওয়ায় কোন লজ্জা নেই।
আতাহার!
জ্বি চাচা।
হোসেন সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বললেন, সাজ্জাদের ব্যাপারটা কি তুমি কিছু জান?
কোন ব্যাপারটা?
হুট করে চাকরিটা ছেড়ে দিল। তোমার সঙ্গে এইসব নিয়ে কোন আলাপ হয়েছে?
জ্বি না।
ও কোথায় আছে সেটা কি জান বাবা?
জ্বি না চাচা, জানি না।
ও কি ড্রাগ-ট্রাগ খায়?
শখ করে মাঝে মাঝে খায়। একে ঠিক ড্রাগ খাওয়া বলে না। কৌতূহল মেটানোর জন্যে।
অতিরিক্ত কৌতূহল কি ভাল আতাহার?
সবার জন্যে ভাল না। কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষদের প্রধান অস্ত্রই কৌতূহল। এরা জীবনকে নানানভাবে, নানান দিক থেকে দেখবে।
জীবনকে দেখার জন্যে ড্রাগ খেতে হবে? জীবনকে দেখার জন্যে চোখ পরিস্কার থাকা দরকার না? মাথাটা পরিষ্কার থাকা দরকার না? ঘোরের মধ্যে তুমি জীবন কি দেখবে?
আতাহার চুপ করে রইল। হোসেন সাহেব বললেন, আতাহার শোন–আমি সাজ্জাদকে নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তায় আছি। আমার মনে হয় ওকে কোন ভাল সাইকিয়াট্রিস্টকে দিয়ে দেখানো দরকার। তুমি কি বল? শুধু ওর একার চিকিৎসরই যে দরকার তা না, তোমার নিজেরো চিকিৎসা দরকার। ঠিক বলছি না আতাহার?
জ্বি চাচা, আজ উঠি। মাকে দেখার জন্যে আজ ভাবছিলাম একটু হাসপাতালে যাব।
তাহলে ভাত দিতে বলি। বেথুন ভাজতে বলেছি। খাবার সময় গরম গরম ভেজে দেবে। নতুন গাওয়া ঘি আছে। বেগুনভাজা, গাওয়া ঘি খেতে অপূর্ব। এর অবশ্যি বেগুনটা ঠিকমত ভজিতে পারে না। ন্যাত। ন্যা তা হয়ে যায়। তোমার চাচী চালের গুড়া দিয়ে মাখিয়ে কি করে যেন বেগুন ভাজতো। অপূর্ব লাগতো। শক্ত একটা খোসার মত থাকতো, ভেতরটা মাখনের মত মোলায়েম। স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। বুঝলে আতাহার, আমি মাঝে মাঝে রাতে স্বপ্নে দেখি ঐ বেগুন ভাজা দিয়ে ভাত খাচ্ছি। স্বপ্নে খাওয়ার কোন টেস্ট নাকি পাওয়া যায় না। আমি কিন্তু পাই। আরেকদিন স্বপ্নে দেখলাম, গরম গরম জিলাপি খাচ্ছি। তারও স্বাদ পেয়েছি। স্বপ্ন ভাঙার পরেও দেখি মুখ মিষ্টি হয়ে আছে। তারপর জেগে উঠে মুখের মিষ্টি ভােব কাটানোর জন্যে একটা পান খেলাম।
জিলাপি কি চাচীর খুব প্রিয় ছিল?
তুমি ঠিকই ধরেছ। জিলাপি। ওর খুব প্রিয় ছিল। গরম গরম জিলাপির জন্যে পাগল ছিল। একবার হয়েছে কি, শোন–ট্রেনে করে সিলেট যাচ্ছি, আখাউড়া স্টেশনে হঠাৎ সে দেখল— টিকিট ঘরের পাশে তোলা উনুনে জিলাপি ভাজা হচ্ছে–আমাকে বলল, জিলাপি খাব। আমি বললাম, জিলাপি খাবে কি? এক্ষুণি ট্রেন ছেড়ে দেবে। সে বলল, না ছাড়বে না। তুমি এক দৌড়ে যাও। কি আর করা–গেলাম। সত্যি সত্যি ট্রেন ছেড়ে দিল। আমি. আর দৌড়ে উঠতে পারলাম না। জিলাপির ঠোঙ্গা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি–আমার সামনে দিয়ে ট্রেন চলে গেল। তোমার চাচী দেখি জানোলা দিয়ে মাথা বের করে হাত নেড়ে খুব টা-টা দিচ্ছে।
