আতাহার বারান্দায় আসতেই কণা বলল, আতাহার ভাই, আপনার জন্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।
বুঝলে কি করে আমি আসছি?
বারান্দায় শাড়ি শুকানোর জন্যে আসছি, তারপর দেখি আপনি। রাস্ত পার হতে এত সময় নিলেন। আমি দেখি, দাঁড়িয়ে আছেন তো দাঁড়িয়েই আছেন।
রাস্ত পার হতে আমার খুব ভয় লাগে। রাস্তাগুলিকে আমার নদীর মত মনে হয়। আমার নদী বরাবর যেতে ভাল লাগে। কিন্তু নদী পার হতে ইচ্ছা করে না।
আপনি অদ্ভুত অদ্ভূত কথা বলেন।
সবার সঙ্গে বলি না।
কাদের সঙ্গে বলেন?
যারা অদ্ভুত কথাগুলির অর্থ বুঝতে পারে না তাদের সঙ্গে বলি। যারা বুঝতে পারে কখনো তাদের সঙ্গে বলি না।
কথাগুলির অর্থ কি?
আতাহার হাসল। কণা বলল, অর্থ আমাকে বলবেন না?
না।
আসেন, ঘরে আসেন।
তোমার স্বামী কোথায়?
চাকরি খুঁজছে।
ফিরবে কখন?
অনেক রাতে ফিরে।
তোমার শরীর খারাপ নাকি কণা? চোখ-মুখ শুকনা লাগছে।
কণা হাসল। কেন হাসল সে নিজেও জানে না। আতাহার ঘরে ঢুকে পরিচিত ভঙ্গিতে চেয়ারে বসেছে। কণা বলল, চা খাকেন?
আতাহার বলল, খুব দ্রুত বানালে খাব। আমি এখানে পাঁচ মিনিটের বেশি বসব না। একটা কাজে এসেছি, কাজটা সেরে চলে যাব।
কণা বিস্মিত হয়ে বলল, আমার সঙ্গে আবার কি কাজ?
সাজ্জাদ কোথায় আছে তুমি কি জান?
কণা আরো অবাক হয়ে বলল, উনি কোথায় আছেন। আমি কি করে জানব?
ও তো তোমার কাছে প্রায়ই আসে।
দুইবার আসছেন।
শেষবার করে এসেছে বলে তো?
দিন-তারিখ তো মনে নাই, ধরেন। দশ দিন।
তারপর আর আসেনি?
জ্বি না।
তোমাকে কিছু বলেছে?
না, কি বলব?
এসে কি করল?
চা খেয়েছেন, তারপর চলে গেছেন। বেশিক্ষণ বসেন নাই।
ও আচ্ছা।
উনার কি হয়েছে?
আতাহার সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে বলে আমার ধারণা। ও তোমাকে বিয়ে করতে চায়।
কণা তাকিয়ে আছে। তার চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে না। সে খুব বিস্মিত হয়েছে। দুঃখ-কষ্টে বড় হওয়া মেয়েরা জীবনে অনেক বিচিত্র এবং ভয়ংকর ঘটনার মুখোমুখি হয় এত অল্পতে তারা বিস্মিত হয় না।
এই জাতীয় কথা সে তোমাকে বলেনি?
জ্বি না।
যাই হোক, আমাকে বলেছে। আমি তোমাকে আগেভাগে জানিয়ে রাখলাম।
উনি আপনার সঙ্গে মজাক করেছে।
ও মজা করার ছেলে না। সে যা করে খুব ভেবে-চিন্তে করে।
কণা চা বানাতে বসেছে। মাঝে মাঝে কৌতূহলী চোখে আতাহারকে দেখছে। হঠাৎ সে মাথা নিচু করে হাসল। আতাহারের চোখে এই দৃশ্য র্গাথা হয়ে গেল। তার কাছে মনে হল–মানুষের সৌন্দর্য আশেপাশের সবকিছু নিয়ে। মানুষ কখনো একা একা সুন্দর হয় না।
কণা!
জ্বি।
আমার ধারণা তুমি খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। এই সমস্যা তুমি নিজেই সামাল দিতে পারবে। তোমার স্বামীকে কিছু বলার দরকার নেই।
জ্বি আচ্ছা। ভাইজান আপনারে এমুন পেরেশান লাগতেছে কেন?
সারাদিন হাঁটাহাঁটি করি এই জন্যে পেরেশান লাগে।
আতাহার উঠে দাঁড়াল। সে কোথায় যাবে বুঝতে পারছে না। সাজ্জাদের বাসায় যাওয়া দরকার। হোসেন সাহেব বার বার খবর পাঠাচ্ছেন। যেতে ইচ্ছা করছে না। সেখানে যাওয়া মানেই এক গাদা উপদেশ শোনা। সান্ত্ৰনার বাণী শোনা। অন্যকে সান্তনা দিতে মানুষ এত ভালবাসে কেন কে জানে?
কণা উঠি?
ভাইজান আরেকটু বসেন। এই এক মিনিট।
কেন?
আপনার সাথে কথা বলতে বড় ভাল লাগে ভাইজান।
আতাহার বসল। রূপবতী নারীদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে নেই। প্রত্যাখান করলে অভিশাপ লাগে। রূপের অভিশাপ। রূপ তখন ধরা দেয় না। একজন কবির উপর রূপের অভিশাপ পড়া ভয়াবহ ব্যাপার।
আরেক কাপ চা দেই ভাইজান?
আতাহার অন্যমনস্পক গলায় বলল, দাও। সে মনে মনে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কণা তুমি এত সুন্দর কেন?
ইডিয়ট বলে গালি
হোসেন সাহেব নিজেকে মনে মনে ইডিয়ট বলে গালি দিলেন। এরচেয়েও কোন খারাপ গালি দিতে পারলে ভাল হত। খারাপ গালি মাথায় আসছে না। আতাহার তার সামনে বিনীত ভঙ্গিতে চুপচাপ বসে আছে। তাকে সান্তনা দেবার জন্যে যে সব কথাবার্তা তিনি ভেবে রেখেছিলেন তার একটাও মনে পড়ছে না। মাথা পুরোপুরি শূন্য। বুক অব কোটেশন থেকে মৃত্যুর উপর তিনটা কোটেশন মুখস্থ করে রেখেছিলেন। তিনটার একটাও মনে আসছে না। স্মৃতিশক্তি মনে হচ্ছে পুরোপুরি গেছে। কিছুদিন পর হয়ত ছেলেমেয়েদের নামও মনে পড়বে না। এদেরকে ডাকতে হবে–এই যে। এই যে दgठन।
আতাহার বলল, চাচা, আপনি আমাকে খোঁজ করছিলেন?
এমি খোঁজ করছিলাম–অনেকদিন তোমাকে দেখি না। তোমার স্বাস্থ্যটাও খারাপ হয়েছে।
চুল কাটিয়েছি তো, এইজন্যেই খারাপ দেখাচ্ছে।
ভেরী ট্রু–চুল কটালে ছেলেদের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ব্যাহত হয়। আমি যতবার চুল কাটাতাম, তোমার চাচী রাগ করতেন। শেষে একবার ঠিক করলাম আর চুলই কটাব না। বাবড়ি চুলের মত হয়ে গেল। মাথায় উকুন হল। তোমার চাচী তাতেই খুশি। মেয়েরা নিজেরা চুল লম্বা রাখে তো, এইজন্যে পুরুষদের চুলও লম্বা দেখতে পছন্দ করে।
জ্বি, তাই হবে।
তোমার বাবার মৃত্যু সংবাদে খুবই দুঃখিত হয়েছি আতাহার। যদিও মৃত্যু হচ্ছে একটা শ্বাশত ব্যাপার। একে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। আমরা যে বেঁচে আছি এটাই একটা মিরাকল।
জ্বি।
হোসেন সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, তিনটা কোটেশনের একটা মনে পড়েছে। একটা যখন মনে পড়েছে তখন অন্য দুটাও মনে পড়বে।
আতাহার!
জ্বি।
মৃত্যু প্রসঙ্গে মহাকবি মিল্টনের একটা কথা আছে–আমার কাছে খুবই যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কবি মিল্টন বলেছেন–
