মিজান উত্তর দেয়নি। হাই তুলেছে।
আমাকে একটা ভিটামিন এনে দাও না।
আচ্ছা দিব।
অন্য কিছু না তো?
মিজান আবারো হাই তুলে বিছানায় শুতে চলে গেছে। এমনও হতে পারে যে, ব্যাপার কি তা সে ভালই জানে। জেনেও চোখ বন্ধ করে আছে। নিজের সমস্যা নিয়ে কণা নিজেই ভাবে। এই সময়ে বাচ্চ-কাচ্চা সংসারে আনাটা কি ঠিক হবে? একবার মনে হয়–মোটেই ঠিক হবে না। খুব বড় ভূল হবে। বাচ্চার খাবার জুটানো যাবে না। অসুখবিসুখ হলে চিকিৎসা করতে পারবে না। এরচে এই ভাল। ঝাড়া হাত-পা। এই যেমন–আজ দুপুরে খাওয়া নেই, সে বড় গ্লাসে করে এক কাপ চা খেয়ে দিন পার করে দিল। ছোঢ় বাচ্চা তো তা করবে না।
কাজেই সবচে ভাল বুদ্ধি হচ্ছে বাচ্চা নষ্ট করে ফেলা। বাচ্চা নষ্ট করা আজকাল কোন ব্যাপারই না। সরকারি ফ্যামিলি, প্ল্যানিং হাসপাতালে গিয়ে বললেই হয়। টাকপিয়সা কিছু লাগে না। ডাক্তাররা হাসিমুখে এমআর করেন। যে হাসপাতালে যত বেশি বাচ্চা নষ্ট করা হয়। সেই হাসপাতালের তত নাম। দেশে ফ্যামিলি প্ল্যানিং হচ্ছে। জনসংখ্যা কমছে।
আগেও একটি বাচ্চা কণা নষ্ট করেছে। নষ্ট না করে তার উপায় ছিল না। সেবার ছিল ভয়াবহ অবস্থা। চুরির দায়ে পুলিশ মিজানকে ধরে নিয়ে গেছে। মেরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিয়েছে। মামলা কোটে ওঠেনি। গ্ৰীন ফার্মেসির মালিক পুলিশকে শুধু বলে দিয়েছিলেন–শক্ত মারধোর যেন করে, যাতে জন্মের শিক্ষা হয়ে যায়। যেখানে না বলতেই পুলিশ মারে সেখানে বলে দিলে কি অবস্থা তা তো বোঝাই যায়। মার খেয়ে মিজানের এমন অবস্থা হল, লোকজন চিনতে পারে না। কণাকে পর্যন্ত চিনতে পারে না। কণা তাকে হাজত থেকে আনতে গিয়েছে–সে বলল, কেমন আছেন, ভাল? বাসার সবাই ভাল?
কথা শুনে কণার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাবার জোগাড় হল। লোকটা তাকে আপনে আজ্ঞে করছে কেন? বাসার সবাই ভাল?–এই প্রশ্ন করছে কেন? বাসার সবাই মানে কি? বাসার সবাই বলতে তো তারা দুটিমাত্র প্রাণী। মিজান সেবার খুব ভূগেছে। দীর্ঘদিন কেটেছে বিছানায়। নিজে নিজে হেঁটে বাথরুমে যেতে পারে না। ধরে ধরে নিয়ে যেতে হয়। এই অবস্থায় বাচ্চ-কাচ্চার কথা চিন্তাই করা যায় না। কাজেই এক সকালবেলা কণা ফ্যামিলি প্ল্যানিং ক্লিনিকে উপস্থিত হল। ডাক্তার খুব সন্দেহজনক ভঙ্গিতে বলল, বাচ্চা নষ্ট করে ফেলতে চান?
হুঁ।
কেন?
বাচ্চা পালতে পারব না, এই জন্যে।
আপনি একা বললে তো হবে না। আপনার স্বামীকেও বলতে হবে। দুজনে মিলে ফরম ফিল-আপ করতে হবে। বিয়ের কাবিননামা আনতে হবে। আপনার স্বামী কোথায়?
সে বিছানায়। তার শরীর খারাপ।
আসতে পারবে না?
এখন পারবে না। কিছুদিন পরে পারবে।
তাহলে আপনি বরং কিছুদিন পরে আপনার স্বামীকে নিয়ে আসুন।
জ্বি আচ্ছা।
কণা চলেই আসছিল, কি মনে করে ডাক্তার তাকে বসতে বললেন। তার এক ঘণ্টার মধ্যে এমআর করে দিলেন।
অপারেশন টেবিলে কণা হাউমাউ করে কিছুক্ষণ কেঁদে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে বাসায় ফিরল। যে বাচ্চাটি পৃথিবীতে আসতে গিয়েও আসতে পারেনি, তার কথা ভেবে এখনো সে মাঝে মাঝে কাব্দে। বিশেষ করে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয়–বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে তার এখন তিন বছর বয়স হত। দুজনের মাঝখানে হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে ঘুমাতো। ঘুমের মধ্যে ফিরিশতারা এসে বলতো–এই, তোর মাকে রাক্ষস নিয়ে গেছে। সে তখন হাসত। কারণ সে এক হাতে তার মায়ের চুল ধরে আছে। সে জানে, ফিরিশতারা মিথ্যা কথা বলছে। ঘুমের মধ্যে বাচ্চারা যখন হাসে তখন তাদের কি সুন্দর যে লাগে! আর যখন ঘুমের মধ্যে কাঁদে তখন কি কষ্ট লাগে! তবে সেই কষ্টেরও আনন্দ আছে। কণার ভাগ্যে সেই আনন্দ এবং আনন্দমাখা কষ্ট লেখা নেই।
এবারের বাচ্চাটাকেও কি নষ্ট করে ফেলতে হবে? মিজান বললে তো করতেই হবে। অবশ্যি বাচ্চা বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে অনেক যুক্তি আছে—রিজিকের মালিক আল্লাহ। তিনি এই বাচ্চার উছিলায় তাদের সংসারে আয়-উন্নতি দেবেন। আল্লাহ পারেন না এমন জিনিস তো নেই। মুসকিল একটাই—অভাবী মানুষ খুব আল্লাহভক্ত হয় ঠিকই, কিন্তু আল্লাহ তাদের সমস্যা সমাধান করে দেবেন এটা কেন জানি বিশ্বাস করে না।
অবেলায় গোসল করে কণার কেমন জানি লাগছে। বার বার শরীর কেঁপে উঠছে। জ্বর আসছে কি-না কে জানে। সে ভেজা শাড়ি বারান্দায় শুকুতে দেবার জন্যে এসেছে। বারনিদায় এসেই তার রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। তার সবচে ভাল লাগে গাড়ি দেখতে। গাড়ির ভেতর বসে সুখী মানুষরা কি সুন্দর হুসাহাস করে চলে যায়। এরা নিশ্চয়ই কোনদিন বাড়ি ভাড়া নিয়ে চিন্তা করে না। বাজার হবে কি হবে না। এইসব নিয়ে চিন্তা করে না। অভাবে পড়ে এরা পেটের শিশু নষ্ট করে দেয় না।
কণা হঠাৎ লক্ষ্য করল, আতাহার যাচ্ছে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হন হন করে এগুচ্ছে। তার বাসার দিকে সে আসছে, হ্যাঁ, সেই সম্ভাবনা একেবারে যে নেই তা না। রাস্তা পার হবার জন্যে এদিক-ওদিক দেখছে। সোজাসুজ্বি হাঁটতে থাকলে বোঝা যেত কণার কাছে আসবে না। রাস্তা পার হবার চেষ্টা করছে বলেই মনে হয় এদিকে আসবে। কণা আগ্রহ ও আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করছে। এই মানুষটাকে তার ভাল লেগেছে। এর মনে কোন ঝামেলা নেই। বেশিরভাগ পুরুষ মানুষের মনেই নানান ঝামেলা থাকে। তাদের বাড়িওয়ালার বয়স ষাটের মত। চুল-দাড়ি সব পেকে সাদা ধবধব করছে। এই লোকের মনেও কত ঝামেলা। বাড়িভাড়া নিয়ে দরবার করতে এসেছে, এমন সময় এসেছে। যখন মিজান নেই। চোখের দৃষ্টি কি? যেন চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। এতক্ষণ থাকল, এত কথা বলল–একবারের জন্যেও বুড়ো তার চোখ কণার বুকের উপর থেকে সরালো না। কণার একবার মনে হয়েছিল–আহা বেচারা! যা দেখতে চাচ্ছে–দেখিয়ে দি। শখ মিটে যাক। দুদিন পর তো মরেই যাবে।
