সামনের রাস্তায় গনি সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। আতাহার বিস্মিত হয়ে বলল, গনিভাই আপনি? কোথায় যাচ্ছিলেন?
গনি সাহেব বললেন, কোথাও যাচ্ছিলাম না–তোমার খোঁজেই এসেছি।
আতাহার বিস্মিত হয়ে বলল, আমার খোঁজে?
হ্যাঁ তোমার খোঁজে। তোমাকে তো আবার রাত বারোটার আগে এলে পাওয়া যায় না।
ব্যাপার কি?
তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে এসেছি। তোমার বাবা মারা গেছেন এই খবর তুমি আমাকে দাও নাই–আমার মনটা খারাপ হয়েছে। আমি সাজ্জাদের কাছে বাসার ঠিকান, চাইলাম–সে তোমার ঠিকানা জানে না–এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা? ঠিকানা অবশ্য আরো আগেই জোগাড় হয়েছে–আমি পড়ে গেলাম অসুখে। ফু জ্বর–একশ চারপাঁচ পর্যন্ত উঠে। আতাহার, আমার আসতে দেরি হয়ে গেল।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন–আসুন, ভিতরে আসুন।
মধ্যরাতে গৃহস্থের বাড়িতে যেত নেই। গৃহস্থের অকল্যাণ হয়। আমি আধুনিক মানুষ হলেও এইসব আবার মানি। এটা ধর।
এটা কি?
তেমন কিছু না–তোমার একটা কবিতা ছেপেছি। ভাবলাম নিজের হাতে দিয়ে আসি। জোছনা নিয়ে তুমি যে কবিতাটা লিখেছ–সেটা হয়েছে। আর ধর, এই খামটা ্রাখ–একশ টাকা আছে। সম্মানী।
গণিভাই, ঠিক করে বলুন কবিতা ছাপা হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে। কবিতাটা পড়ার পরই হঠাৎ আমার জোছনা দেখার ইচ্ছা করল–তখন বুঝলাম তুমি পেরেছ।
আতাহার মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখেছে। একটা খুব হাস্যকর ব্যাপার হয়েছে–তার চোখে পান এসে গেছে। তার বড়হ লজ্জা লাগছে।
আতাহার!
জ্বি।
কবিতা নিয়ে আমি অনেক বড় বড় কথা বলি, বক্তৃতা দেই–আমি নিজে কিন্তু লিখতে পারি না। আমি যে জিনিসটা পারি না–তোমরা পার–তখন একই সঙ্গে আনন্দ হয়–আবার ঈর্ষাও হয়।
আপনি কখনো লেখার চেষ্টা করেননি।
কে বলেছে করিনি? যাই আতাহার।
আসুন আপনাকে একটু এগিয়ে দেই।
আস। রাস্তা নিৰ্জন–তুমি বড় রাস্তা পর্যন্ত আমার সঙ্গে চল।
দুজন নিঃশব্দে হাঁটছে। এত দীর্ঘ সময় গণি সাহেব কখনো চুপচাপ থাকেননি। আতাহারের হঠাৎ করে এই মানুষটাকে খানিকটা তার বাবার মত লাগল। রশীদ সাহেবও নিঃশব্দে হাঁটতেন। হাঁটার সময় তাঁর মাথাটা নিচু হয়ে থাকতো–যেন তিনি ফুটপাতের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে আছেন। জগতের সব রূপ ফুটপাতে দেখে ফেলেছেন। এর বাইরে তার আর কিছু দেখার নেই।
কণা আজ অবেলায় গোসল করেছে
কণা আজ অবেলায় গোসল করেছে। দুপুরে খুব খিদে লেগেছিল। বাজার হয়নি বলে রান্না হয়নি। চা বানিয়ে চা খেল। খিদে নষ্ট করার জন্যে অতিরিক্ত চিনি দেয়া চা খুব ভাল। এক কাপ চা খেলেই খিদে নষ্ট হয়ে যায়। সে পুরো এক গ্লাস খেয়ে ফেলল। এতে তার খিদে নষ্ট হয়ে গেলো ঠিকই কিন্তু গা গুলাতে শুরু করল। গা গুলানোর এই রোগ তার নতুন হয়েছে। প্রায়ই গা কেমন কেমন করে। হঠাৎ হঠাৎ কোন কোন গন্ধ তীব্র হয়ে নাকে বাঁধে। সমস্ত শরীর ঝড়-ঝা করতে থাকে। এমনকি ঘরবাড়ি পর্যন্ত দুলতে শুরু করে। এইসব লক্ষণ ভাল লক্ষণ না। তাদের জন্যে তো নয়ই। মিজান নতুন কোন চাকরি জোগার করতে পারেনি। প্রাণপণে খুঁজছে। পাচ্ছে না। তবে পেয়ে যাবে। দুমাসের বেশি। চাকরি ছাড়া অবস্থায় সে কখনো ছিল না। দুমাস কোনমতে কাটানো নিয়ে কথা।
সময় খারাপ। খারাপ সময়েই পৃথিবীতে শিশুরা আসে। তাদের শিশুও খুব একটা খারাপ সময় বেছে নিয়েছে। তাদের এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিশুটার ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। মিজানের সঙ্গে খোলাখুলি কথা হওয়া প্রয়োজন। মিজানকে পাওয়াই যাচ্ছে না। অনেক রাত করে এত ক্লান্ত হয়ে ফিরে যে, কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। বেশিরভাগ সময় না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তাকে ঝামেলায় ফেলতে মায়া লাগে।
এমিতেই ঝামেলার শেষ নেই–তিন মাসের বাড়িভাড়া বাকি পড়েছে। এই সমস্যা কণা নিজেই সামাল দিয়েছে। কানের দুলজোড়া বিক্রি করেছে। আট আনা সোনার দুল। খাদের জন্যে তিন আনা কেটেছে। টাকা। যা এসেছে তাতে টারে টারে বাড়ি ভাড়া হয়ে অল্প কিছু বেঁচেছে। সেই টাকায় কণা তিন প্যাকেট ডানহিল সিগারেট কিনে এনে হরলিক্সের কৌটায় মুখ বন্ধ করে রেখেছে। সিগারেট ড্যাম্প হয়ে গেলে খেয়ে কোন মজা নেই। মিজান মাঝে-মধ্যে হঠাৎ জেগে উঠে বলে–ঘরে কোন সিগারেট আছে?
ঘরে সিগারেট থাকবে কোথায়? ঘরতো আর দোকান না।
তখন মিজান বলে–একটু খুঁজে-টুজে দেখ তো টুকরা-টাকরা কিছু পাওয়া কি-না।
টুকরা পাওয়া গেলেও তাতে লাভ হয় না। মিজান সিগারেট এমনভাবে খায় যে ফিল্টার পর্যন্ত পুড়ে যায়। এখন সিগারেট চাইলে সে হরলিক্সের কোটা খুলে দিতে পারবে। সিগারেট চাচ্ছে না। বাড়িতে ফিরে মিজান যা করে তা হচ্ছে–ভোস ভোস করে ঘুমায়। তাঁর শরীরও খারাপ করেছে। পায়ে পানি এসেছে। পা ফুলে থাকে। আঙ্গুল দিয়ে চাপলে ফোলা ডেবে যায়। গৰ্ভবতী মেয়েদের পায়ে পানি আসে। সেই হিসেবে তার পায়ে পানি আসার কথা। মিজানের পায়ে কেন আসবে? ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা করানো দরকার। তা সে করবে না। নিজের চিকিৎসা নিজেই করবে। অসুধের দোকানে যারা কাজ করে তারা কিছুদিনের মধ্যেই ডাক্তার বনে যায়। নিজেই নিজের এবং আত্মীয়স্বজনের চিকিৎসা করে। কিছু বললে চোখ সরু করে বলে, ডাক্তার কি আমার থেকে বেশি জানে?
কণা তার বর্তমান শারীরিক সমস্যার কথা বলার চেষ্টা করেছে। মিজান শুনেও শুনেনি। যেমন কণা বলল, প্রতিদিন সকালে আমার বমি বমি হয়–কি হয়েছে বল দেখি? আমার মনে হয় ভিটামিনের অভাব।
