তোমাদের রান্না তো মা খারাপ না।
সালমা বানু আনন্দিত ভঙ্গিতে হাসলেন। অনেকদিন পর পরিবারের একজনকে তিনি তার সামনে খেতে দেখলেন।
বাসার খবরাখবর কি বল তো বটু?
খবরাখবর ভাল।
ঐ দিন তোর বাবা এসে এমন হৈ-চৈ শুরু করেছে, আমি লজ্জায় বাঁচি না।
আতাহার তীক্ষু দৃষ্টিতে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। বিস্মিত গলায় বলল, বাবার কথা কি বললে মা?
কি বললাম?
বাবা এসে খুব হৈ-চৈ করেছেন। বাবা মারা গেছেন সেটা তো মা তুমি জান! জান না?
হুঁ জানি।
তোমার কি মনে থাকে না?
মনে থাকবে না কেন?
মা শোন, তোমার ভাবভঙ্গি ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে–আমি পাগল-টাগল হবার চেষ্টা করছি। ছেলেরা পাগল হলে মানায়, মেয়েরা পাগল হলে মানায় না।
তোর যে কি অদ্ভুত কথাবার্তা! পাগলের আবার মানামানি কি?
তোমার লজিক তো মা ঠিকই আছে। ভেরী গুড। মতির মা কোথায়?
জানি না।
তোমাকে একা ফেলে গেল কোথায়?
একা ফেলে যায়নি তো–তুই তো আছিস।
আমি তো আর সারারাত থাকব না। চলে যাব।
আরেকটু থাক।
মতির মা না আসা পর্যন্ত থাকব। চিন্তা করার কিছু নেই।
সংসার কিভাবে চলছে?
সংসার কিভাবে চলছে তা নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না মা। সংসার খুব ভালমত চলছে।
তোর বাবা যেভাবে মুখ-টুখ কালো করে আমার খাটের পাশে বসে থাকে তা থেকে তো মনে হয় সংসার চলছে না।
আবার বাবাকে কোথেকে নিয়ে এলে?
সালমা বানু খুবই লজ্জা পেলেন। তাই তো, বার বার তিনি একই ভুল করছেন। এই জাতীয় ভুল করা ঠিক না। মৃত মানুষ কখনো ফিরে আসে না। স্বপ্নে দেখা দিতে পারে–কিন্তু বাস্তবে কখনো না।
হাসপাতাল থেকে বেরুতে বেরুতে রাত বারোটা বেজে গেল। আগে এত রাতে বাসায় ফেরার সময় ভয়ে আত্মা শুকিয়ে যেত। বাবা বারান্দায় বসে থাকতেন। তিনি দরজা খুলে দিতেন। তারপর বড় ধরনের ভূমিকম্প হত। রেকটার স্কেলে যে ভূমিকম্পের মাপ হল সাত পয়েন্ট পাঁচ।
এখন দরজা খুলে দেয় মিলি। সে কিছুই বলে না। রশীদ সাহেবের মৃত্যুর পর তার মধ্যে কিছুটা জবুথব্রু ভােব চলে এসেছে। সংসারের কাজকর্মেও এলোমেলো ভােব চলে এসেছে। কয়েকদিন আগে মাছ, ডাল, আর ভাজ্বি রান্না করে সবাইকে খেতে ডেকেছে। প্লেট নিয়ে বসার পর মিলি লজ্জিত গলায় বলেছে–ভাত তো রান্না হয়নি। এরকম ভুল কেউ করে!
মিলির বিয়ের কথা হচ্ছে। এই মাসেই বিয়ে হয়ে যাবে। মনিকা দূর থেকে সব ব্যবস্থা করেছে। ছেলে আমেরিকায় থাকে–গীন কার্ড পেয়েছে। যার সঙ্গে বিয়ে হবে সেও আমেরিকা যেতে পারবে।
মনিকা লিখেছে–
মিলি,
বাবার মৃত্যুতে সংসার যে ভেঙে পড়েছে তা আমি দূর থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারছি। আতাহার, ফরহাদ দুটা অপদার্থ। কোনদিন সংসার দেখবে না। তোকে সে দেখেশুনে বিয়ে দেবে সেই আশায় গুড়েবালি। তোকে তোর নিজের পথ নিজেকেই দেখতে হবে।
আমি তোর জন্যে বর ঠিক করেছি। আহামরি কিছু না। আমাদের ভাগ্যে আহামরি কিছু জুটবে এটা মনে করাও ভুল। ছেলের একমাত্র যোগ্যতা সে আমেরিকায় বাস করে।
আমাকে ভাবী ডাকে এবং খুব মানে। ক্যাব চালায়। টেক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে বিয়ে এটা ভেবে মুখ বাকিয়ে বসবি না। বাংলাদেশের ট্যাক্সি ড্রাইভার আর আমেরিকার টেক্সি ড্রাইভার এক না।
ছেলের স্বভাব-চরিত্র ভাল। তবে তার আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। আমেরিকান এক মেয়েকে বিয়ে করেছিল। কনট্রাক্ট ম্যারেজ। বিয়ের পর গ্রীন কার্ড পেয়েছে। এখন ডিভোর্স নিয়ে যে যার পথ দেখেছে। আমি তোকে সবকিছু খোলাখুলি লিখলাম। এখন তোর বিবেচনা।
আমার পরামর্শ নিলে এই বিয়েতে রাজি হওয়া তোর জন্যে মঙ্গলজনক হবে। তুই তোর মতামত অতি দ্রুত আমাকে জানাবি। যদি হ্যাঁ হয়, তবে ছেলে এসে বিয়ে করে তোকে নিয়ে চলে যাবে। চট করে তোকে ভিসা দেবে না। কামাল বলেছে, সে তোকে প্রথম সুইডেন নিয়ে যাবে। সেখান থেকে আমেরিকা আনবে। তোকে বলতে ভুলে গেছি। ছেলের নাম কামাল। ওর কয়েকটা ছবি পাঠালাম।
মার শরীর আরো খারাপ করেছে শুনে খুব ভয় পাচ্ছি। মারও ভালমন্দ কিছু হয়ে যাবে না তো! বিপদ আসতে শুরু করলে আসতেই থাকে। এদিকে তোর দুলাভাই আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে যে, তুই কল্পনাও করতে পারবি না। ঐ দিন ব্রেকফাস্টের টেবিলে গরম কফির কোপ আমার দিকে ছুড়ে দিল। কপাল কেটে রক্তারক্তি। গোলও পুড়েছে। এইসব কথা লিখতেও লজ্জা লাগে।
বাবার মৃত্যুর খবর শুনে তার মাথায় প্রথম ঢুকেছে। সংসার চালানোর জন্যে
আশ্চর্য মানুষের মন–কত ছোট হয়! আমি তাকে বললাম, তোমার টাকা তারা খরচ করবে কিভাবে? টাকা তো তোমার একাউন্টে।
যাই হোক, বাসার যাবতীয় খবর জানাবি। মার চিকিৎসার খরচ কোথেকে আসছে, সংসার কিভাবে চলছে–এইসব আমার জানা দরকার। জেনেও কিছু করতে পারব না।
তুই ভাল থাকিস। বিয়ের ব্যাপারে মত থাকলে আমাকে জানাবি।
ইতি তোর মনিকা আপু
পুনশ্চ–১ : পঞ্চাশ ডলার পাঠালাম। এই টাকা দিয়ে এতিমখানায় বাবার নাম করে এক বেলা খাবার ব্যবস্থা করবি।
পুনশ্চ–২ : তোর চিঠিতে দেখলাম–বড় মামা সবাইকে তার বাড়িতে উঠার পরামর্শ দিয়েছেন। পরামর্শটা ভাল। তোর তো বিয়েই হয়ে যাবে। থাকছে শুধু ফরহাদ আর আতাহার। মার যা অবস্থা শুনছি। তাকে বাকির খাতায় লিখে রাখাই ভাল। ফরহাদ আর অত্যাহার মামার বাসায় থাকলে ওদের ইশ হবে। আতাহার নিশ্চয়ই চক্ষুলজ্জায় পড়ে চাকরি-বাকরির চেষ্টা করবে। তোরা রাজি হয়ে যা। বড় মামাকে আমি পৃথক পত্র দিয়েছি।
