মুখ দেখলেই বোঝা যায়।
আপনি কি মুখ দেখে অনেক কিছু বুঝে ফেলেন?
কিছুটা তো বুঝতেই পারি।
আমার মুখ দেখে আমাকে আপনার কেমন মনে হয়।
তোমার মুখ দেখে তোমাকে খুব অসাবধানী মেয়ে বলে মনে হয়।
আপনি ঠিক বলেছেন। আমি আসলে খুব অসাবধানী। এর জন্যে মাঝে মাঝে কি সব ভয়ংকর বিপদে যে পড়ি! একবার…
একবার কি?
না থাক। আতাহার ভাই একবার আমাকে ভয়ংকর বিপদে ফেলে দিয়েছিলেন। সেই গল্পটা আমি বলতে চাচ্ছি না।
না বল, আমার শোনার দরকার।
আপনার শোনার দরকার নেই।
বলতে আমার লজ্জা লাগছে।
আমার কাছে তোমার লজ্জা পাবার কিছু নেই–তুমি বল। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে লজ্জা লাগলে অন্যদিকে তাকিয়ে বল।
নীতু খুব সহজ ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে একটা বানানো গল্প শুরু করল। কেন হঠাৎ সে এই কাজটা করল সে নিজেও জানে না। তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করা গল্পে অনেক ফাঁকফোকর থাকে, তার গল্পে তা ছিল না। গল্পটা সে খুব আগ্রহ নিয়ে বলছে—
গত বৎসরের কথা। সন্ধ্যাবেলা ছাদের চিলেকোঠায় আমি ভাইয়ার জন্যে চা নিয়ে গিয়েছি। আপনি বোধহয় দেখেননি ছাদে ভাইয়ার একটা ঘর আছে। যাই হোক, আমি চা নিয়ে গেলাম। ঘরটা অন্ধকার। ভাইয়া চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। আমি ডাকলাম। এই ভাইয়া, উঠ, চা নে। ভাইয়া চাদর সরাল–আমি দেখি আতাহার ভাই।
সে কি! সে এখানে কি করছে?
আতাহার ভাই প্রায়ই আমাদের বাড়িতে ঘুমিয়ে থাকে। সে যে দুপুরে এসে ছাদের চিলেকোঠায় শুয়েছিল, আমি জানি না। যাই হোক, আমি বললাম–ভাইয়া কোথায়? আতাহার ভাই বললেন–জানি না কোথায়। চায়ের কাপটা রেখে কাছে এসে বস তো। আমি বসলাম।
তুমি বসলে কেন?
বসব না কেন? উনাকে তো আমি সব সময় নিজের ভাইয়ের মত দেখেছি। যাই হোক, উনি তখন আমার গালে হাত দিয়ে বললেন–তোর গাল ফোলা ফোলা লাগছে কেন? মামস হয়েছে?
মামস হয়েছে মানে?
কয়েকদিন আগে সাজ্জাদ ভাইয়ের মামস হয়েছিল। বড়দের মামস হলে খুব কষ্ট হয়। আমি ভাবলাম, আতাহার ভাই সত্যি সত্যি আমার মামস হয়েছে কিনা দেখছেন।
তুমি তো দেখি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বোকাদের একজন।
হতে পারে। যাই হোক, আমি বললাম, আতাহার ভাই, আপনি চা খান। আমি চললাম। উনি বললেন, না, তুই বসে থাক আমার পাশে–বলেই এক হাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরলেন।
তারপর?
তারপর আর কিছু না।
কামাল হতভম্ব গলায় বলল, ঘটনাটা তো এখানেই শেষ হবার কথা না। তারপর কি?
নীতু খাবার খেতে শুরু করল। ছুরি দিয়ে কেটে কেটে মাছের টুকরা মুখে দিতে দিতে বলল–মাছটা দেখতে খারাপ হলেও খেতে ভাল হয়েছে।
কামাল বলল, তুমি তো কিছুই বললে না।
বললাম মতো।
আসল ঘটনা তো কিছু বলছি না। তুমি চিৎকার করে উঠলে?
শুধু শুধু চিৎকার করব কেন?
একটা লোক তোমার কোমর জড়িয়ে ধরে বসে আছে, তুমি চিৎকার করবে না?
চিৎকার করাটা লজ্জার ব্যাপার হত না? লোক জানাজানি হত।
লোকটা আর কি করল?
নীতু চুপ করে রইল। কামাল হতভম্ গলায় বলল, তোমাকে চুমু খেয়েছে?
উঁ।
উঁ-টা কি? হ্যাঁ না না?
বাদ দিন না।
বাদ দেব মানে?
যা হবার হয়ে গেছে। এখন এইসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ আছে? ছোটখাট দুৰ্ঘটনা ঘটেই থাকে।
এটাকে তুমি ছোট দূর্ঘটনা বলছ?
আচ্ছা, বেশ বড় দুর্ঘটনাই–বড় দুর্ঘটনাও কারো কারো জীবনে ঘটে। কি আর করা! আচ্ছা শুনুন–ম্যান্ডারিন ফিস। আমি আর খেতে পারছি না। আপনি আমার প্লেট থেকে নিয়ে নিন। খাবার নষ্ট করে লাভ কি?
কামাল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। বেচারার জন্যে নীতুর এখন একটু মায়া লাগছে। আহা বেচারা–গল্পটা পুরো বিশ্বাস করে বসে আছে।
সালমা বানু চোখ মেলে
সালমা বানু চোখ মেলে একজন অপরিচিত মানুষকে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। আজকাল প্রায়ই অপরিচিত লোকজন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কথা বললে এরা কথার জবাব দেয় না। কিছু কিছু মানুষের চেহারা থাকে বিকৃত। এদের দেখলে ভয় ভয় লাগে। এরা বোধহয় মানুষ না–পৃথিবীতে মানুষের বেশ ধরে অনেকেই ঘুরে বেড়ায়। তাদেরই একজন। আয়াতুল কুরসি পড়ে ফু দিলে এরা চলে যায়। কিংবা হাততালি দিলেও কাজ হয়–হাততালির শব্দ যতদূর যাবে এরা তত দূরে সরে যাবে। এক সময় তাঁর আয়াতুল কুরসি মুখস্থ ছিল। রাত-বিরাতে ভয় পেতেন–সূরা পড়তেন, ভয় কাটতো। এখন স্মৃতিশক্তিও দুর্বল হয়ে গেছে। কিছুই মনে থাকে না।
কেমন আছ মা?
অপরিচিত লোকটা তাকে মা ডাকছে কেন?
কি ব্যাপার মা, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না।
সালমা বানু খুব লজ্জা পেলেন। আতাহার দাঁড়িয়ে আছে। কি সুন্দর ইস্ত্রি করা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেছে। গায়ে সেন্ট দিয়েছে না-কি? মিষ্টি গন্ধ আসছে।
মা, আজকাল নাকি তুমি কাউকে চিনতে পারছ না?
পারছি তো।
উহুঁ, চিনতে পারছি না। বল তো আমি কে?
তুই বটু।
আচ্ছা যাক, পাস মার্ক দেয়া গেল। চিনতে পেরেও এমন অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছিলে কেন?
সালমা বানু বললেন, বোস।
আতাহার বসতে বসতে বলল, চোখে কাজল দিয়েছ নাক? চোখগুলো সুন্দর লাগছে।
ভাত খেয়েছিস বটু?
না।
হাসপাতালের ভাত খাবি?
খাব। হাসপাতালে। আজ কি রান্না মা?
জানি না। ঐ যে ট্রেতে খাবার ঢাকা দেয়া আছে। আমার সামনে বসে বসে খা। আমি দেখি।
আতাহার বাথরুম থেকে হাত ধুয়ে খেতে বসে গেল। তার ভাল খিদে পেয়েছে। খিদের কারণেই হয়ত হাসপাতালের খাবার খেতে তেমন খারাপ লাগছে না। একটা ভাজ্বি। চড়ুই পাখির রানের সাইজের একটা মুরগীর রান, ডাল।
