এটা তো ঠিক না। লোকজন না থাকলে বারভূতে লুটপুটে খাবে।
কেন? নিজেদের একটা বাড়ি–মাঝে-মধ্যে ছুটি কাটাতে যাবে, এর আলাদা একটা চার্ম আছে না? বসতবাড়ি স্বকুলে দেবার পেছনে তো কোন যুক্তি নেই। এই বাড়ি নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে স্কুল হবে সে হিসেবে বানানো হয়নি। তাছাড়া স্কুল-কলেজ এইসব সরকারি সেক্টরে হওয়া উচিত। প্রাইভেট সেক্টরে না। সবই যদি প্রাইভেট সেক্টারে হয় তাহলে সরকার করবে কি? সরকারেরও তো কিছু করতে হবে। তাই না?
জ্বি।
চুপচাপ বসে থাকলে তো হবে না। এইসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। তোমার বাবা তো এইসব নিয়ে ভাবেন না–তোমার বড় ভাইও না। একজন কাউকে তো ভাবতে হবে।
আপনি ভাবুন।
নীতুর হাসি পাচ্ছিল। কি আশ্চর্য মানুষ! বিয়ের আগেই শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তির চিন্তায় অস্থির হয়ে আছে। বিয়ের পর কি হবে কে জানে? বাবা ভাল স্বামীই তার জন্যে জোগাড় করেছেন। নীতুর ধারণা, বিয়ের এক বছরের মাথায় লোকটা উঠে-পড়ে লাগবে বিষয়সম্পত্তি নিজের নামে লেখাপড়া করিয়ে নিতে।
নীতু নিচে নেমে এল। সে সুন্দর একটা শাড়ি পরেছে। চুল বেঁধেছে। ঠোটে লিপস্টিক দিয়েছে। আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে উঠেছে–মনে হচ্ছিল ড্রাকুলার দূর সম্পর্কের কোন বোন বসে আছে। যে কিছুক্ষণ আগেই রক্ত খেয়ে এসেছে। সেই রক্তের খানিকটা ঠোঁটে লেগে আছে। নীতু রুমাল দিয়ে ঠোঁটের লিপস্টিক মুছে ফেলল। এখন নিজেকে লাগছে। মরা মানুষের মত। মনে হচ্ছে সে তিনদিন আগে মারা গেছে, তাকে বারডেমের মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছিল, আজ বের করে আনা হয়েছে। রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়ার পর আবার তাকে বারডেমে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
কামাল হাত-পা ছড়িয়ে ঘরোয়া ভঙ্গিতে বসে আছে। তাকে দেখতে সুন্দরই লাগছে। খুব হালকা হকয়েরি শার্টে তাকে ভাল মানিয়েছে। আজেবাজে পুরুষদের চেহারা সবসময় সুন্দর হয়। কামাল বলল, তোমার বাবা কোথায়?
উনি ছোট চাচার বাসায় গেছেন।
উনি থাকলে গুলশানের বাড়ির ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করতাম। তোমাকে জেনে রাখতে বলেছিলাম–জাননি মনে হয়।
জেনেছি। তের কাঠা জমির উপর বাড়ি।
বল কি! ১৩ কঠা–এ তো অনেক জমি, গোল্ড মাইন। ভাড়া কত পাচ্ছ?
পঁচিশ হাজার।
কি পাগলের মত কথা বল? তের কাঠা জমির উপর যে বাড়ি তার ভাড়া মাত্র ২৫ হাজার?
বাড়িটা ছোট, বেশির ভাগই ফাঁকা জায়গা।
তোমরা যা করছি তা রীতিমত ক্রাইম।
চলুন যাই।
কামাল বিরক্ত মুখে উঠে দাঁড়াল। আর তখনি দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল আতাহার। সে বিস্মিত মুখে বলল, পেত্নী সেজে কোথায় যাচ্ছিস?
নীতুর চোখে পানি এসে যাবার মত হল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, রেস্টুরেন্টে খেতে যাচ্ছি আতাহার ভাই।
রেস্টরেন্টে খেতে যাচ্ছিস। একটু সুন্দর-টুন্দর হয়ে যা। তোকে দেখে মনে হচ্ছে ডেডবডি। তুই খেতে বসবি আর দেখবি রাজ্যের মাছি তোর মাথার উপর ভিনভন করছে। তোকে ডেডবাড়ি ভাবছে।
নীতু বলল, আতাহার ভাই, আমি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি—উনি কামাল আহমেদ।
আতাহার লজ্জিত গলায় বলল, ও, আচ্ছা আচ্ছা। ভাই, আপনার ভবিষ্যৎ স্ত্রীকে নিয়ে কিছু রঙ্গ—রসিকতা করলাম। দয়া করে কিছু মনে করবেন না। আপনার চেহারা সুন্দর, সেটা চাচাজানের কাছে শুনেছি–কিন্তু আপনি যে ছদ্মবেশী রাজপুত্র তা কেউ বলেনি।
কামাল সরু চোখে তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। নীতু বলল, আতাহার ভাই, বাসায় তো কেউ নেই।
কোন অসুবিধা নেই। আমি বারান্দায় বসে এক কাপ চা খেয়ে যাব।
বারান্দায় বসে চা খেতে হবে না। ঘরে বসেই খান। আমি বলে দিয়ে যাচ্ছি।
শুধু চা যেন না দেয়–খিদেয় মারা যেতে বসেছি।
গাড়িতে উঠতে উঠতে কামাল বলল, ভদ্রলোক কে?
নীতু বলল, ভাইয়ার বন্ধু।
খুব আসা-যাওয়া নাকি?
হুঁ।
করেন কি?
কিছু করেন না–বাউন্ডেলে।
এইসব বাউন্ডেলে ছেলে।পুলেদের বেশি প্রশয় দেয়া ঠিক না। তোমার সঙ্গে যেসব কথা বলল, খুবই অবজেকশন্যাবল।
নীতু হাসল। কামাল বলল, হেসো না–এই টাইপটা হল সুযোগ-সন্ধানী টাইপ। সুযোগের জন্য বড়লোক বন্ধুদের পেছনে পেছনে ঘুরবে। চামচগিরি করবে।
আপনি ঠিকই বলেছেন। উনি বিরাট চামচা।
একেবারেই প্রশ্ৰয় দেবে না। প্রশ্ৰয় দিলেই এরা মাথায় উঠে পড়ে। পেত্নীর মত দেখাচ্ছে, ডেডবাডি, মাছি ভিন ভন করবে–এইসব কি ধরনের কথা? রসিকতার ও তো সীমা থাকবে?
রেস্টুরেন্টে খেতে বসেও কামাল আবার আতাহারের প্রসঙ্গ তুলল। গম্ভীর মুখে বলল, আতাহার সাহেবের পারিবারিক অবস্থা কি?
পারিবারিক অবস্থা খুব খারাপ।
খুব খারাপ মানে কি?
উনার বাবা মারা গেছেন। মা হাসপাতালে। উনি তাঁর ভাইবোনদের নিয়ে তার এক মামার বাসায় থাকেন।
এই অবস্থা?
হ্যাঁ, এই অবস্থা।
এরা ধান্ধবাজ হবেই। এরা বড়লোক বন্ধুদের পেছনে নানান ধান্ধা নিয়ে ঘুরবে। খুব সাবধান। খুব সাবধান।
আমি সাবধানই আছি।
আসলে এদের বাড়িতে ঢুকতে দেয়াই উচিত না। তুমি যে একে বাড়িতে রেখে চলে এলে, কাজটা ঠিক করনি।
বাবা উনাকে খুব পছন্দ করেন।
তা তো করবেনই। মানুষকে খুশি করার যাবতীয় কায়দা-কানুন। এরা জানে। ওরা এটা করে নিজেদের সারভাইবেলের জন্যে। পরগাছা মনোবৃত্তি।
নীতু হাসল। কামাল নীতুর হাসি পছন্দ করল না। বিরক্ত মুখে বলল, হাসবে না। নীতু। হেসে হেসে আমরা বিপদে পড়ি। যখন ঘাড়ের উপর এসে পড়ে, আমাদের হাসি শুধু তখনি বন্ধ হয়।
এইসব মানুষের সাইকোলজ্বি আপনি এত ভাল করে জানেন কি ভাবে?
