চা-টা কিছু খেয়েছ আতাহার?
জ্বি।
মনসুর আলি গলা উচিয়ে ডাকলেন, কুহু, একটা কাগজ আর কলম দাও।
কুহু কাগজ আর বলপয়েন্ট দিয়ে গেল। সেই বলপয়েন্টে লেখা হয় না। আতাহার সেই কলমেই তার নাম-ঠিকানা লিখলা। কেউ পড়তে পারবে না। তাতে কি? তার লেখার কথা, সে লিখল। অদৃশ্য কালিতে নাম লিখে আতাহারের মনটা ভাল লাগছে। কেন লাগছে তা সে জানে না। সে হেঁটে হেঁটে রওনা হল হাসপাতালের দিকে।
আশ্চর্য, পথে নামতেই আতাহারের মাথায় পঙতি ওড়াউড়ি করতে লাগল। এরকম তো কখনো হয় না।
টেবিলের চারপাশে আমরা ছজন।
চারজন চারদিকেল দুজন কোনাকুনি
দাবার বোড়ের মত
খেলা শুরু হলেই একজন আরেকজনকে খেয়ে ফেলতে উদ্যত।
আমরা চারজন শান্ত, শুধু দুজন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে।
তাদের স্নায়ু টানটান।
বাড়ালের নখের মত তাদের হৃদয় থেকে
বেরিয়ে আসবে তীক্ষ্ণ নখ।
খেলা শুরু হতে দেরি হচ্ছে,
আম্পায়ার এখনো আসেনি।
খেলার সরঞ্জাম একটা ধবধবে সাদা পাতা
আর একটা কলম।
কলমটা মিউজিক্যাল পিলো হাতে হাতে ঘুরবে
আমরা চারজন চারটে পদ লিখব।
শুধু যে দুজন নখ বের করে কোনাকুনি বসে আছে
তারা কিছু লিখবে না।
তারা তাদের নখ ধারালো করবে
লেখার মত সময় তাদের কোথায়?
প্রথম কলম পেয়েছি আমি,
আম্পায়ার এসে গেছেন।
পিস্তল আকাশের দিকে তাক করে তিনি বললেন
এ এক ভয়ংকর খেলা,
কবিতার রাশান রোলেট–
যিনি সবচে ভাল পদ লিখবেন
তাকে তৎক্ষণাৎ মেরে ফেলা হবে।
আমার হাতের কলম কম্পমান
সবচে সুন্দর পদ এসে গেছে আমার মুঠোয়।
মদিনা নীতুদের নতুন কাজের মেয়ে
মদিনা বলল, আফা, উনি আইছে।
মদিনা নীতুদের নতুন কাজের মেয়ে। আঠারো-উনিশ বছর বয়স। বিয়ে হয়েছিল, স্বামী তাড়িয়ে দিয়েছে। এত সুন্দর একটা মেয়েকে স্বামী তাড়িয়ে দিল কেন নীতু বুঝতে পারে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে সুন্দর একটা মুখ দেখলেই তো মনটা ভাল হয়ে যাবার কথা। মদিনা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। শাড়ির আঁচল এমনভাবে মুখের উপর টেনে ধরে আছে যে মুখ ভাল দেখা যাচ্ছে না। টান টানা সুন্দর চোখ শুধু দেখা যায়।
নীতু বলল, উনিটা কে?
কামাল ভাইজান।
ও আচ্ছা–বসতে বল, আমি আসছি।
মদিনার মুখ থেকে শাড়ির আঁচল সরে গেছে। এবার তার মুখ পুরোটা দেখা যাচ্ছে। শাড়ির আঁচলে সে এতক্ষণ মুখ ঢেকে রেখেছিল কেন তাও বোঝা যাচ্ছে। ঠোটে লিপস্টিক দিয়েছে। মেরুন রঙের লিপস্টিকটা পাওয়া যাচ্ছিল না। এখন বোঝা যাচ্ছে লিপস্টিকটা কোথায়।
আফা, উনারে চা দিমু?
দাও।
মদিনা চলে যাচ্ছে। তাকে কঠিন কঠিন কিছু কথা শোনানো দরকার। কাজের মেয়ে ঠোঁট গাঢ় করে লিপস্টিক দিয়ে ঘুরবে কেন? চুরির ব্যাপারটা তো আছেই। সুন্দর একটা মেয়ে যদি আরো সুন্দর হতে চায় তাতে রাগ করা যায় না। কাজের মেয়ে সুন্দর হতে পারবে না, সাজতে পারবে না। এমন তো কোন কথা নেই।
নীতু ভুরু কুঁচকে বসে রইল। তার খুব মেজাজ খারাপ লাগছে। কামাল এসেছে বলে কি মেজাজ খারাপ? হতে পারে। এই মানুষটাকে দেখলেই তার মেজাজ খারাপ হয়। আশ্চর্য, এমন একটা মানুষকে সে বিয়ে করতে যাচ্ছে যার নাম শুনলেই তার বিরক্তি লাগে। নীত্যু ঘড়ি দেখল, সাতটা বাজে, সন্ধ্যা এখনো হয়নি। তার আসার কথা সন্ধ্যার পর। তারা দুজনে একটা রেস্টুরেন্টে খেতে যাবে। বিয়ে করতে এসেছ বিয়ে করা। দুদিন পরে পরে রেস্টুরেন্টে খাওয়া-খাওয়ি কি? লোকটা সুন্দর করে কথা পর্যন্ত বলতে পারে না। ঐদিন রেস্টুরেন্টে গিয়ে বেয়ারাকে আঙুলের তুড়ি বাজিয়ে ডাকছিল। বেয়ারা শুনেও না শোনার ভান করল। তখন সে হ্যালো হ্যালো করে ডাকতে লাগল। হ্যালো হ্যালো করছিস কেন? এটা কি টেলিফোন?
লোকটির সব কথাবার্তা নীতুদের বিষয়সম্পত্তি এবং টাকাপয়সা নিয়ে। আশ্চৰ্য্য, এটা কথা বলার কোন বিষয়? জগতে কথা বলার কত প্রসঙ্গ আছে। চুপচাপ বসে থেকেও তো রাজ্যের কথা বলা যায়। সেদিন রেস্টুরেন্টে খেতে বসে নীতুর লজ্জার সীমা রইল না। কামাল বলল, তুমি দেখি কিছুই খাচ্ছ না।
নীতু বলল, আমার খিদে নেই। আপনি খান।
আমি তো খাচ্ছিই। পয়সা দিয়ে কিনেছি, খাব না। মানে? চিকেনটা তো ভাল হয়েছে। বেশ ভাল।
নীতু আতংকিত চোখে দেখল, লোকটা কড়মড় শব্দে মুরগির রান চিবাচ্ছে। তারচেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার ঘটল। যখন সে নীতুর থালা থেকে মুরগীর মাংস তুলে নিতে নিতে বলল, নষ্ট করে লাভ নেই। কি বল?
নীতু কিছু বলল না। মাথা নিচু করে রইল। সে মুখভর্তি মাংস নিয়ে বলল, গুলশানে তোমাদের একটা বাড়ি আছে না?
নীতু বলল, জ্বি।
কয় কাঠার জমি বল তো?
আমি ঠিক জানি না।
সে কি! নিজের বিষয়সম্পত্তির হিসাব জান না?
এইসব বাবা দেখেন।
উনি তো দেখবেনই। তবে উনি তো আর সারাজীবন বেঁচে থাকবেন না। তখন তোমাদেরই দেখতে হবে। গুলশানে তোমাদের ঐ বাড়ি কি ভাড়া দেয়া?
জ্বি।
ভাড়া কত আসে জান?
জ্বি না।
অনেক টাকা ভাড়া আসার কথা। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর একটা সুবিধা হয়েছে। গুলশান এলাকা জাতে উঠে গেছে। ডিপ্লোমেটিক জোন। বড় বাড়িগুলি এক লাখ দেড় লাখ টাকায় ভাড়া হচ্ছে।
ও।
গ্রামে তোমাদের প্রপাটি কেমন আছে?
প্ৰপাটির কথা জানি না। তবে গ্রামে আমাদের খুব সুন্দর একটা দোতলা বাড়ি আছে। সামনে পুকুর।
কে থাকে সেখানে?
কেউ থাকে না। শীতের সময় মাঝে মাঝে আমরা বেড়াতে যাই।
