আতাহার বসে আছে মনসুর আলির বাড়ির বারান্দায়। তার সামনে চানাচুর এবং চা। চানাচুর দীর্ঘদিনের পুরানো, খেতে টক টক লাগছে। চায়ে চিনি-দুধের পরিমাণ বেশি, খেতে গরম লাচ্ছির মত লাগছে। আতাহার চানাচুর এবং চা। দুইই আগ্রহের সঙ্গে খাচ্ছে।
মনসুর আলি বাড়িতে নেই–সেলুনে চুল কাটাতে গিয়েছেন। বাড়িতে খবর দিয়ে গিয়েছেন–আতাহার এলে যেন বসতে বলা হয়। আর মনসুর আলি তাকে নিয়ে চিত্রনায়িকা মৌ-এর এপার্টমেন্ট হাউসে যাবেন। মৌ আজ সন্ধ্যার পর যেতে বলেছেন।
আতাহার ইস্ত্রি করা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে এসেছে। আসার আগে আয়নায় নিজেকে দেখেছে–নিজেকে নায়কের মতই লেগেছে। ভদ্র বিনয়ী মধ্যবিত্ত নায়ক এরকমই হওয়া উচিত। তবে জানি দুশমন ছবির নায়ক কেমন হওয়া উচিত কে জানে। নাম থেকে আন্দাজ করা যায় কংফু, কেরাতে পারদশী নায়ক। প্রয়োজনে সাব-মেশিনগান বের করে ট্যা ট্যা শব্দে গুলি চালাতে হবে। নায়িকাকে নিয়ে যখন-তখন পার্কে লুকোচুরি খেলতে খেলতে গান ধরতে হবে–
ও আমার জন
তোমাকে দেখে আমার উড়ে গেছে প্ৰাণ
আ আ আ
উ উ উ।
এইসব জটিল প্রক্রিয়া শিখতে আতাহারের কোন আপত্তি নেই। বরং আগ্রহ আছে। সত্যি সত্যি ছবির জগতে নায়ক হয়ে গেলে কবিতা ছাপানো তার জন্যে সহজ হবে। কে জানে গনি সাহেব নিজেই হয়ত বাসায় চলে এসে বলবেন, এই যে নায়ক, বর্ষ শুরু সংখ্যার জন্যে কিছু দাও। বর্ষ শুরু সংখ্যায় তোমার কবিতা থাকবে না এটা কেমন কথা
প্রচুর ইন্টারভ্যু তখন ছাপা হবে। প্রশ্ন কর্তারা বিচিত্র সব প্রশ্ন করবে। তাদের প্রশ্নের বিচিত্ৰ উত্তর দেয়া যাবে। সেই সব সাক্ষাতকার বিশাল ছবিসহ ছাপা হবে।
প্রশ্ন : আতাহার ভাই, অভিনয় এবং কবিতা এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাধ্যমে আপনি কাজ করছেন–আপনার অনুভতি কি?
উত্তর : নিজেকে প্রথম শ্রেণীর গর্দভের মত লাগছে।
প্রশ্ন : আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না–একটু কি ব্যাখ্যা করবেন?
উত্তর : দুটি ভিন্ন মাধ্যমে কাজ করা মানে প্রচুর কাজ করা। প্রচণ্ড পরিশ্রম করা। গাধা। যা করে। সেই অর্থে বলেছি।
প্রশ্ন : আপনার প্রথম কবিতা লেখার অনুভূতি এবং প্রথম অভিনয়ের অনুভূতি সম্পর্কে কি কিছু বলবেন?
উত্তর : একটিতে পেয়েছি সৃষ্টির অনুভূতি, অন্যটি অনাসৃষ্টির অনুভূতি।
প্রশ্ন : দয়া করে একটু যদি ব্যাখ্যা করেন।
উত্তর : ব্যাখ্যা করতে পারছি না। আমার স্টুডিওতে যাবার সময় হয়ে গেছে। গাড়ি চলে এসেছে। অন্য একদিন আমার সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলে তারপর আসবেন। আমার ব্যস্ততা বুঝতেই পারছেন।
প্রশ্ন : অবশ্যই বঝতে পারছি। আপনি হচ্ছেন বাংলাদেশের সবচে ব্যস্ত নায়ক। যাবার আগে আপনি কি দয়া করে নয়া চিত্র ভুবনের পাঠকপাঠিকাদের জন্যে কোন বাণী দেবেন?
উত্তর : তোমরা ভাল হও। সুন্দর হও।
প্রশ্ন : খুব সুন্দর বলেছেন আতাহার ভাই। একটু যদি কষ্ট করে লিখে দেন তাহলে অফসেটে প্রিন্ট করে ছাপিয়ে দেব। পাঠক-পাঠিকারা স্বচক্ষে আপনার হাতের লেখা দেখবে। এই একটা বাড়তি পাওনা।
মনসুর আলি আতাহারকে সন্ধ্যা ছাঁটার আগেই আসতে বলেছেন। সে এসেছে সাড়ে পাঁচটায়। এখন প্রায় নটা বাজতে চলল। নাপিতকে দিয়ে তিনি যদি একটা একটা করে চুলও কাটান তাহলেও এত সময় লাগার কথা না। আতাহারকে দ্বিতীয় দফায় চা দেয়া হয়েছে। চায়ের সঙ্গে ক্রম বিসকিট। এবারের বিস্কিটগুলিও ভাল, চা-টাও ভাল। আরো ঘণ্টা দুই পরে যদি চা দেয় তাহলে দেখা যাবে সেই চা এর চেয়েও ভাল। চায়ের সঙ্গে নাশতাও ভাল।
মনসুর আলি সাহেবের একতলা বাড়িটা মফঃস্বলের বাড়ির মত। চারদিকে ফাঁকা। মূল বাড়ি থেকে বারান্দা বড় হয়ে এসেছে। শুধু মফঃস্বলের বারান্দায় এত মশা থাকে না–এই বারান্দায় হাজারে-বিজারে মশা। মনে হয় কাছেই কোথাও মশার চাষ হচ্ছে। উন্নত মানের মশা। যাদের শরীর স্বাস্থ্য এবং কামড়াবার শক্তি সবই উন্নত মানের।
বাড়ির ভেতর থেকে ন-দশ বছরের একটা ছেলে এসে বলল, চাচা, আপনি কি ভিতরে এসে বসবেন?
আতাহার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে চলে এল। সে জানে মশারা এতে বিভ্রান্ত হবে না–তাকে খুঁজে বের করে ফেলবে। তবু এক জায়গায় আর কতক্ষণ বসে থাকা যায়। হাতপায়ে ঝি-ঝি ধরেছে। বসার ঘরে কিছু ম্যাগাজিন বা বই-টই থাকতে পারে। বইম্যাগাজিন পড়ে যদি সময় কিছুটা কাটে। আতাহার ঠিক করে রেখেছে সে ঠিক এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, যাতে মনসুর আলি সাহেব পরবর্তী সময়ে তাকে বলতে না পারেন–আরে, তুমি হুট করে চলে যাবে? সামান্য দু-তিন মিনিট অপেক্ষা করতে পারলে না? তোমরা এত ব্যস্ত–ব্যস্ততার জন্যেই কিছু হয় না।
মনসুর আলি সাহেব এলেন রাত দশটা কুড়ি মিনিটে। আতাহারকে বসে থাকতে দেখে তিনি অবাকও হলেন না, অস্বস্তিও বোধ করলেন না। স্বাভাবিক গলায় বললেন, আতাহার শোন–আমার সঙ্গে ম্যাডামের কথা হয়েছে। উনার বাড়ি থেকেই এখন আসছি। ম্যাডাম এই রোল নতুন কাউকে দিতে চন না। পুরানো কাউকে দিয়ে করাতে চান। উনার পছন্দের একজন আছে, বুঝতেই পারছি, ম্যাডামের কথামত কাজ করতে হবে। ময়না ভাইকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবে। উনি হয়ত মনে করছেন আমি কোন চেষ্টা করিনি। এটা ঠিক না, চেষ্টা করেছি। তবে তোমার কথা মনে থাকবে। তুমি তোমার ঠিকানা এবং টেলিফোন নাম্বার লিখে রেখে যাও। কোন ব্যবস্থা হলে খবর দেব।
