বুঝতে পারছি কিছু আতাহার–কি রহস্যময় কথা আল্লাহ পাক বলছেন। আল্লাহ যারা মারা যায় না। তাদের প্রাণও নেন যখন তারা ঘুমিয়ে থাকে। এর অর্থ কিছু বুঝতে পারছি? গভীরভাবে চিন্তা কর। গভীরভাবে চিন্তা করলেই দেখবে, সব পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। এই জগৎ, এই সংসার যে কি বিশাল মায়া আতাহার–আমরা তা বুঝতে পারি না। বুঝতে পারি না বলেই প্রিয়জনদের মৃত্যুতে কাতর হই। ব্যথিত হই। বরং আমাদের উল্টোটা হওয়া উচিত। মৃত্যু প্রসঙ্গে মহামতি বালজাকের একটা কথাও আমার খুব প্রিয়। তিনি তাঁর বিখ্যাত Le Pere Goriot গ্রন্থে বলেছেন–মৃত্যু আছে বলেই জীবন সুন্দর। মৃত্যু না থাকলে জীবনের মত কুৎসিত আর কিছু হত না।
আতাহারকে বলার জন্যে তিনি আরো অনেক তথ্য জোগাড় করে রেখেছেন। সে আসছে না। এই ছেলেটিকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেন। তার দুঃসময়ে তিনি কিছু করতে পারছেন না, এটা দুঃখজনক ব্যাপার। তাঁর মনের খুবই গোপন বাসনা–নীত্র সঙ্গে আতাহারের বিয়ে হোক। একদিন তিনি স্বপ্নেও দেখেছেন। নীতুর বিয়ে হচ্ছে–বর আসতে দেরি করছে। সবাই চিন্তিত। গুজব শোনা যাচ্ছে–বর আসছে না। তিনি নিজে দুঃশ্চিন্তায় মারা যাচ্ছেন, এমন সময় আতাহারের সঙ্গে দেখা। সে লুঙ্গি এবং গেঞ্জি পরে বিয়ের গেট সাজাচ্ছে। তিনি আতাহারকে প্রচণ্ড ধমক দিলেন–এরকম শুভদিনে তুমি লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে বসে আছ? তোমার কি স্বাভাবিক বৃদ্ধিও নেই? আতাহার বলল, চাচা, আমার পায়জামা-পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করতে দিয়েছি, এখনো আসেনি। গেট সাজানোর কাজটা শেষ করেই আমি পায়জামা-পাঞ্জাবি পরব।
তিনি আরো রেগে গিয়ে বললেন, তুমি গেট নিয়ে ব্যস্ত আর এদিকে শুনছি। বর আসছে না। মেয়েরা কান্নাকাটি করছে।
আতাহার বিস্মিত হয়ে বলল, মেয়েরা কান্নকাটি করবে। কেন? আমিই তো কর। আমি আলাদা করে আসব কিভাবে? আমি তো এসেই আছি। এই সময় তীব্র ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙার পর তিনি বুঝলেন যে, তার গভীর আনন্দ হচ্ছে। আনন্দে তাঁর চোখ পর্যন্ত ভিজে গেল। আর তখনি তার মনে হল এই বিয়ে সম্ভব না। আতাহার নীতুকে ছোটবোনের মত দেখে। তুই—তোকারি করে। নীতু তাকে ঠিক পছন্দও করে না। সব সময় কঠিন কঠিন কথা বলছে। তিনি অনেকবার নীতুকে বলতে শুনেছেন, রোজ রোজ মানুষের বাড়িতে এসে নাশতা খেতে আপনার লজ্জা লাগে না? সকালবেল ভিখিরীর মত এসে বসে থাকেন। ওদের সঙ্গে আপনার তফাৎ একটাই–ওরা থালা হাতে আসে, আপনি থালা ছাড়া আসেন।
যে ছেলের প্রতি নীতুর এরকম মনোভাব সেই ছেলের সঙ্গে বিয়ে হওয়া ঠিক না। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি শ্ৰদ্ধাবোধ থাকা দরকার। একজন আরেকজনকে শ্রদ্ধা করবে। তবেই না সংসার সুন্দর হবে। প্রথমে শ্রদ্ধা তারপর ভালবাসা।
এখন যে ছেলেটির সঙ্গে নীতুর বিয়ে হচ্ছে তার প্রতি নীতুর শুদ্ধাবোধ কতটুক তিনি জানেন না। জানতে পারলে ভাল হত। এইসব বিষয় নিয়ে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে তার অস্বস্তি লাগে, তবু একদিন তিনি বলবেন। দীর্ঘ একটা বক্তৃতা দেবেন। তিনি এটা নিয়ে ভাবছেন। গভীরভাবেই স্বভাবছেন।
হোসেন সাহেব বাগানে হাঁটছিলেন। ঘাসগুলি অনেক বড় বড় হয়েছে। কাটা দরকার। মালি বাগানের দেখাশোনা কিছুই করছে না। বর্ষাকালে নাকি বাগানে হাত দিতে নেই। সব গাছ যে রকম আছে সেরকম রেখে দিতে হয়। গাছকে বিরক্ত না করে বর্ষার পানি খাওয়াতে হয়। বাগানের কাজ বর্ষার শেষে। মালির কথা তিনি বিশ্বাস করবেন কি করবেন না বুঝতে পারছেন না। তার কথাবার্তা খুব বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না–তবে কথা খুব জোরালোভাবে বলে। হোসেন সাহেব লক্ষ্য করলেন, সাজ্জাদ বেরুচ্ছে। সন্ধ্যাবেলায় ছেলেমেয়েদের ঘর থেকে বের হতে দেখলে ভাল লাগে না। সন্ধ্যা ঘরে ফেরার সময়, ঘর থেকে বেরুবার সময় না। সাজ্জাদ। বাবার দিকে তাকাল। হোসেন সাহেব হাসলেন। এত দূর থেকে সাজ্জাদ তার হাসি দেখবে না, তারপরেও অভ্যাসবশে হাসলেন–বুঝানোর চেষ্টা করলেন, আছি, আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি। তোমাদের সুসময়ে এবং দুঃসময়ে আছি। হোসেন সাহেব মনে মনে আশা করছিলেন সাজ্জাদ তাকে একা বাগানে হাঁটতে দেখে এগিয়ে আসবে। দুজনে কিছু কথাবার্তা বলবেন। কথা অনেক বড় ব্যাপার–মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয় কথায়। সাজ্জাদ গেটের কাছে চলে গিয়েছে। হোসেন সাহেবের ইচ্ছা করল গলা উচিয়ে ছেলেকে ডাকেন। সাজ্জাদ গেটের কাছে আরো কিছুক্ষণ থাকলে হয়ত ডাকতেন। সে গেট খুলে দ্রুত বের হয়ে গেল।
নীতু বাসায় নেই। কোন এক বান্ধবীর জন্মদিনে নাকি গেছে। বান্ধবীর বাড়ি উত্তরায়। ফিরতে দেরি হবে। খুব বেশি দেরি হলে সে থেকে যাবে। কে জানে সাজ্জাদও হয়ত রাতে ফিরবে না। এতবড় বাড়িতে রাত কাটাতে হবে একা। আজকের দিনের রাশিফলে লিখেছিল, অপ্রত্যাশিত আনন্দের ঘটনা ঘটতে পারে। শরীরের প্রতি লক্ষ্য রাখুন। স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা।
অপ্রত্যাশিত আনন্দের কিছু এখনো ঘটেনি। সম্ভাবনা একেবারে যে শেষ হয়ে গেছে তা না। তিনি আতাহারকে আনার জন্যে গাড়ি পাঠিয়েছেন। বলে দিয়েছেন যত রােতই হোক গাড়ি আতাহারের জন্যে অপেক্ষা করবে। তাকে সাথে করে নিয়ে আসবে। অনেকদিন ছেলেটাকে দেখা যায় না। সে সন্ধ্যায় চলে এলে তাকে নিয়ে বাজারে যাবেন। নীতুর বিয়ের কার্ড পছন্দ করবেন। এবং আজ তিনি আতাহারকে দামী একটা পাঞ্জাবি কিনে দেবেন। ছেলেটার দুটা মাত্র পাঞ্জাবি।
