তথ্যমন্ত্রীর বাড়িভতি মানুষ। সবাই দর্শনপ্রার্থী। মন্ত্রীর পিএ বলল, কি জন্যে দেখা করতে এসেছেন? নাম-ঠিকানা এইসব একটা কাগজ লিখুন।
হোসেন সাহেব বললেন, কিছু লিখতে হবে না। তুমি গিয়ে বল, হোসেন আলি সাহেব এসেছেন। সেতাবগঞ্জের হোসেন আলি। আর কিছুই বলতে হবে না। নাম শুনলেই ছুঢ়তে ছুড়তে আসবে।
আপনাকে একটু বসতে হবে। ভেতরে এখন ভিজিটার আছে।
ঠিক আছে, বসলাম খানিকক্ষণ।
আপনার কোন কার্ড থাকলে দিন। ভেতরে পাঠিয়ে দেই।
আমার কোন কার্ড নেই। আমি তো আর ছুটকা-ফটিকা বিজনেস করি না যে কার্ড নিয়ে ঘুরব। হা হা হা।
কার্ড আজকাল শুধু বিজনেসম্যানরাই রাখেন না–সবাই রাখেন।
তুমি রাগ করছ নাকি বাবা? এম্নি বললাম, দেখি একটা কাগজ দাও, আমি নামঠিকানা লিখে দেই। কাগজটা দুলুর হাতে দেবে। ম্যাজিক দেখবে। তোমাদের মন্ত্রীর ডাকনাম দুলু। তোমরা বোধ হয় জান না।
পিএ গম্ভীর মুখে কাগজ এনে দিল। হোসেন সাহেব সেই কাগজে লিখলেন–
দুলু,
কেমন আছিস?
অনেক দিন খোঁজ নেই। খোঁজ নিতে এলাম।
হোসেন আলি
পিএ নিজেই কাগজ নিয়ে গেল। কিছুক্ষণের ভেতরই ফিরে এসে বলল, স্যার এখন খুব ব্যস্ত। আপনাকে কিছুদিন পরে আসতে বলেছেন।
হোসেন সাহেব কল্পনাও করেননি। এ জাতীয় ব্যাপার ঘটতে পারে। দুলু কি তাকে চিনতে পারেনি? চিঠিতে তিনি অবশ্যি সেতাবগঞ্জ লিখেননি। তার প্রয়োজন বোধ করেননি। নাকি দুলু লেখায় সে রাগ করেছে? রাগ করার তো কথা না।
হোসেন সাহেব লজ্জিত হয়ে বাসায় ফিরলেন। দুপুরে ভাত পর্যন্ত খেতে পারলেন না। ইদানীং তাঁকে ঘন ঘন লজ্জা পেতে হচ্ছে। সেদিন নীতুর কারণেও খুব লজ্জা পেলেন। যে ছেলেটির সঙ্গে নীতুর বিয়ে হচ্ছে তার কিছু ভাগ্নে-ভাগ্নি নীতুকে নিয়ে চায়নীজ খাবে। সব ঠিকঠাক করা আছে। হোসেন সাহেব নীতুকে টাকা দিয়ে দিলেন, খাওয়া-দাওয়ার পরে বিলটা যেন নীতু দেয়। নীতু টাকা নিল। বিকেলে সে হঠাৎ বলল, সে যাবে না। তার প্রচণ্ড মাথাধরা।
হোসেন সাহেব বললেন, মাথাধরার দুটা ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে থোক। ব্যথা কমে যাবে। এখনো তো দেরি আছে। সাতটার সময় যাবি।
নীতু কঠিন মুখে বলল, আমি যাব না। বাবা। তুমি ওদের টেলিফোন করে জানিয়ে পাওঁ।
যাবি না কেন?
বললাম না মাথাব্যথা। তুমি এক্ষুণি ওদের টেলিফোন করে দাও।
টেলিফোনটা তুই কর। মাথাব্যথার ব্যাপারটা বুঝিয়ে বল।
না, আমি করতে পারব না। তুমি কর।
আমার করা কি ঠিক হবে?
অবশ্যই ঠিক হবে।
আমি টেলিফোন করলে ওরা নানানভাবে চাপাচাপি করতে থাকবে। তুমি করলে তোমাকে কিছু বলতে পারবে না।
হোসেন সাহেব টেলিফোন করলেন। মাথাব্যথার কথাটা তিনি বলতে পারলেন না। মাথাব্যথা মেয়েদের সহজ এক্সকিউজ। মাথাব্যথার জন্যে কেউ কোন প্রোগ্রামে যেতে পারছে না শুনলেই মনে হয় মিথ্যা কথা। কাজেই তিনি বললেন, নীতু আজ দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হঠাৎ পা মচকে পড়ে গেছে। পায়ে অসম্ভব ব্যথা। তিনি চিৎকার শুনে ভেবেছিলেন পা ভেঙেই গেছে। তবে আসলে ভাঙেনি। হলুদের পুলটিশ লাগিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। সে তো কোনক্রমেই চায়নীজে যেতে পারবে না।
নীতুর কথাই ঠিক। ওরা আর চাপাচাপি করল না। তবে সন্ধ্যাবেল দল বেঁধে নীতুকে দেখতে চলে এল।
তিনি তখন বারান্দায় বসেছিলেন আর নীতু বাগানে হাঁটাহাঁটি করছিল। কি ভয়ংকর লজ্জার কথা! সেই লজ্জা তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়ে নীতু তাদের সঙ্গে চায়নীজ খেতে চলে গেল। একা একা বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে তাঁর মনে হল–কিছু কিছু মানুষের বোধহয় জন্মই হয় লজ্জা পাবার জন্যে। সারাজীবনে তিনি কতবার লজ্জা পেয়েছেন তার তালিকা তৈরি করলে সেই তালিকার জন্যে দশ-বারো দিস্তা কাগজ লাগার কথা। এর মধ্যে রাশিচক্রের কোন ব্যাপার আছে কি? জন্মতারিখ অনুসারে তিনি মীন রাশির জাতক। এই রাশিতে যাদের জন্ম তারা কি ক্রমাগতই লজ্জা পায়? রাশিচক্রের কিছু বইপত্র এনে পড়তে হয়। খবরের কাগজে রোজদিনকার রাশিফল ছাপা হয় তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েন। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছেন, ভাল ভাল কথা কোনটাই মিলে না। কিন্তু খারাপ কথা সবই মিলে। এও এক রহস্য। এই রহস্য নিয়ে আতাহারের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
আতাহারের সঙ্গে অনেকদিন হল বসা হচ্ছে না। বাবার মৃত্যুর পর সে এ বাড়িতে আসা কমিয়ে দিয়েছে। আর এলেও তার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না। আতাহারকে সান্তুনা দিয়ে তিনি যেসব কথা বলবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন তার কোনটিই এখনো বলা হয়নি। আত্যহারের জন্যে তিনি মৃত্যু-বিষয়ে বেশ পড়াশোনাও করেছেন। কোরআন শরীফ থেকে কিছু আয়াত টুকে রেখেছেন। সব গুছিয়ে বলতে হবে। মৃত্যুশোকে কাতর মানুষকে সান্ত্ৰনা দেয়া কঠিন কর্ম। কোরআন শরীফ থেকে তিনি রহস্যময় একটা আয়াত খুঁজে বের করেছেন। সবশেষে এই আয়াত নিয়েও কথাবার্তা বলা যাবে।
তিনি ঠিক করেছেন, আতাহারকে নিয়ে বাগানে চলে যাবেন। গাছের নিচে বেতের চেয়ার নিয়ে দুজন মুখোমুখি বসবেন। তিনি বলবেন, আতাহার শোন, মৃত্যু সম্পর্কে আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থে অনেক কিছু আছে। তার ভেতর সবচে রহস্যময় কথাগুলি শোন। সূরা আল-যুকারে বিয়াল্লিশ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন–
মরণ এলে আল্লাহ প্ৰাণ নেন,
যারা মারা যায় না তাদেরও, ওরা যখন ঘুমিয়ে থাকে।
তারপর যার জন্যে মৃত্যু অবধারিত করেছেন, তিনি তার প্রাণ রেখে দেন।
আর অপরদের এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফিরিয়ে দেন।
এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।
