মানুষের একটা চেষ্টাই থাকে পৃথিবীটাকে ছোট করে ফেলার। কেউ পৃথিবী নিয়ে আসেন তাঁর সংসারে। কেউ তাঁর অফিসে। একজন স্কুল টিচার–তাঁর স্কুলে। এই জন্যেই কি সাধকরা ঘর-সংসার ছেড়ে দেন?
সাজ্জাদ অফিসে ঢুকে পর পর দুইেকাপ কফি খেলো। প্রায় দুটার মত বাজে। প্রচণ্ড খিদে লেগেছে। কফি খাওয়ায় খিদে নষ্ট হয়ে ভেঁাতা। যন্ত্রণার মত হচ্ছে। সে তৃতীয় আরেক কাপ কফির অর্ডার দিয়ে প্যাড়ের কাগজ টেনে নিয়ে দ্রুত একটা দরখাস্ত লিখে ফেলল–
ডিরেক্টর, এডমিনস্ট্রেশন
এরনাস ইন্টারন্যাশনাল
ঢাকা
বিষয় : চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রার্থনা।
জনাব, সবিনয়ে নিবেদন। আমার পক্ষে চাকরি করা সম্ভব হচ্ছে না। অফিসের খুঁটিনাটি আমি লিখতে পারছি না, আমার ভালও লাগছে না। যতই দিন যাচ্ছে আমার পৃথিবী ততই ছোট হয়ে আসছে। ভয় হচ্ছে, এক সময় পৃথিবীটা অফিসের এয়ারকুলার বসানো ঘরেই আবদ্ধ হয়ে যায়। কিনা। এরকম কোন ভয়াবহ সম্ভাবনার দিকে আমি যেতে চাই না। আমি আমার সমগ্র মানবজীবনে চারটি হলেও ভাল কবিতা লিখে যেতে চাই। তার জন্যে যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট স্বীকার করে নিতে আমার কোন আপত্তি নেই। কাজেই আমি চাকরি থেকে অব্যাহতি কামনা করছি।
বিনীত
সাজ্জাদ হোসেন
চিঠি শেষ করেই সাজ্জাদ একটা টেলিফোন করল। জনৈকা ভদ্রমহিলা টেলিফোন ধরে বললেন, কে?
সাজ্জাদ বলল, মা, আমি সাজ্জাদ।
কয়েক মুহূর্ত ভদ্রমহিলা কোন কথা বললেন না।
সাজ্জাদ বলল, তুমি কেমন আছ মা?
ভাল।
আমি কেমন আছি জিজ্ঞেস করছি না কেন?
তুই কেমন আছিস?
খুব খারাপ। ভয়ংকর খারাপ। মা, আমি লিখতে পারছি না।
কবি-লেখক–এদের তো এমন সমস্যা প্রায়ই হয়। লেখা বন্ধ হয়ে যায়। রাইটার্স ব্লক তো লেখকদের পুরানো ব্যাধি। তুই বরং কোনখান থেকে ঘুরে আয়।
আমার কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না।
তুই বরং একটা বিয়ে-টিয়ে কর–তোর কি কোন পছন্দের মেয়ে আছে?
মেয়েটার নাম কি?
কণা।
কি রকম পছন্দ? বেশ পছন্দ, না মোটামুটি পছন্দ?
বেশ পছন্দ।
পছন্দ হলে বিয়ে করে ফেলে। পাশে সাবক্ষণিক একজন কেউ থাকলে তোর অস্থিরতা কমবে।
মেয়েটিকে বিয়ে করার সামান্য সমস্যা আছে মা।
সমস্যা কি?
মেয়েটি বিবাহিত।
সে কি?
তুমি চমকে উঠলে কেন মা?
তোর কি মনে হয় না–তুই চমকে ওঠার মত কথা বলেছিস?
না। কারণ তুমিও বিবাহিতা ছিলে— বাবাকে এক কথায় ছেড়ে অন্য একজনকে–
সাজ্জাদ টেলিফোন নামিয়ে সিগারেট ধরাল। বেল টিপে তার সেক্রেটারিকে ডেকে বলল, দ্রুত চিঠিটা টাইপ করে নিয়ে আসুন। দশ মিনিটের ভেতর। দশ মিনিটের বেশি এই অফিসে থাকলে দমবন্ধ হয়ে আমি মারা পড়ব।
এই দশ মিনিট কাটানো যায় কিভাবে? মাঝে মাঝে দশ মিনিট অনন্তকালের মত দীর্ঘ হতে পারে। আইনস্টাইন, স্পেশাল থিওরী অব রিলেটিভিটি। টাইম ডাইলেশন। সাজ্জাদের মনে হচ্ছে এই দশ মিনিট আর কাটবে না। এমন কেউ কি তার আছে যার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে ভাল লাগে? লীলাবতী আছে–লীলাবতী। তার টেলিফোন নাম্বারটা যেন কত? মনে পড়ছে না। তার শোবার ঘরের দেয়ালে লেখা। চোখ বন্ধ করে সাজ্জাদ শেবার ঘরের দেয়ালটা দেখার চেষ্টা করল। দেয়াল দেখা যাচ্ছে, কিন্তু লেখা পড়া যাচ্ছে না।
সাজ্জাদ যখন অফিস থেকে বের হল তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। সে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এগুচ্ছে। সে বাসায় যাবে না। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে চলে যাবে। ঘোর বর্ষা নেমেছে–এখনো কদম ফুল দেখা হয়নি। কদম গাছের নিচে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আজ সে গাইবে–বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান। সাজ্জাদের গলা ভাল। আশ্চর্য রকম ভাল। গানের চর্চা করলে সে অনেকদূর এগুতে পারত। গান পরাশ্রয়ী বিদ্যা। অন্যের সুর আশ্ৰয় করে সে বিকশিত হয়। একজন কবি কখনো পরাশ্রয়ী বিদ্যার চাচা করতে পারেন না।
হোসেন সাহেব লক্ষ্য করেছেন
হোসেন সাহেব লক্ষ্য করেছেন তিনি যখন খুব আনন্দে থাকেন তখনই বড় বড় নিরানন্দের ব্যাপারগুলি ঘটতে থাকে। মনে করা যাক, তিনি খুব আগ্রহের সঙ্গে তাঁর প্রিয় খাবার কই মাছের ঝোল খাচ্ছেন, হঠাৎ দেখা গেল ঝোলের ভেতর মরা একটা মাছি। মাছিটা শুরুতেই দেখেছিলেন, তখন ভেবেছেন পেয়াজের খোসা। শুরুতে পরীক্ষা করার প্রয়োজন বোধ করেননি। আরাম করে বেশ কিছুক্ষণ খাওয়ার পর হঠাৎ চামচ দিয়ে সেই পেয়াজের খোসা পাতে নিয়ে দেখবেন–হাত-পা কুকড়ে একটা মরা মাছি পড়ে আছে। এতক্ষণ তিনি তাড়িয়ে তাড়িয়ে মৃত মাছির রসমািখানো ঝোল খাচ্ছিলেন।
সাজ্জাদের চাকরির পর তিনি মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন, পিতা হিসেবে তিনি তাঁর দায়িত্ব শেষ করেছেন। এখন সত্যিকার অবসর জীবন শুরু করতে পারেন, তখনই দেখলেন সাজ্জাদ অফিসে যাওয়া বন্ধ করেছে। এর মানে কি? তিনি ভেবেছেন ছুটি নিয়েছেন। শরীর খারাপ সেই জন্যে ছুটি। কারণ সাজ্জাদ এই কদিন ঘরেই আছে, কোথাও বের হচ্ছে না। শরীর খারাপ বলেই বের হচ্ছে না। ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে তাঁর ভয়ভয় লাগছে। জিজ্ঞেস করবেন, সে বলে দেবে, অফিস আর ভাল লাগছে। না বাবা। এরচে না জিজ্ঞেস করাই ভাল। নীতুকে জিজ্ঞেস করলেন, কি রে, সাজ্জাদ অফিসে যাচ্ছে না কেন?
নীতু চোখ-মুখ শক্ত করে বলল, আমি কি জানি?
তুই জিজ্ঞেস করিসনি?
আমি কেন জিজ্ঞেস করব? তুমি জিজ্ঞেস কর।
নীতু বেশ কিছুদিন থেকেই তার সঙ্গে ক্যাট ক্যাট করে কথা বলছে। তিনি বুঝতে পারছেন না–হঠাৎ করে তিনি কি সবার কাছে অপ্রিয় হয়ে গেলেন? সেদিন তথ্যমন্ত্রীর বাসায় গেলেন। তাঁর অনেক দিনের পরিচিত মানুষ। ভাবলেন, দেখা করা যাক। সেইজন্য সাক্ষাত। সাজ্জাদের চাকরির খবরটা দেবেন। নীতুর বিয়ে হচ্ছে সেই খবর দেবেন।
