সাজ্জাদ বলল, অসুন্দরের ভেতরও সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়।
এইসব ফালতু কথা–এবং বোগাস কথা। মল-মূত্রের ভেতরে সৌন্দর্য নেই। কি খাবে বল, চা না কফি?
আপনার বাড়ির সমস্যা কি মিটেছে?
কোন সমস্যা?
ঐ যে প্রতি বুধবার রাতে বাড়িতে কারা যেন মল-মূত্র ঢেলে আসত। হ্যাঁ, মিটেছে। সিকিউরিটি গার্ড রেখেছিলাম। গার্ড বিদায় করে দিয়েছি। ভাল কথা, সাজ্জাদ, তোমার চারটা অনুবাদের মধ্যে একটা ভাল হয়েছে। শুধু ভাল না, বেশ ভাল। ছেপে দিয়েছি। দেখেছি বোধহয়।
জ্বি দেখেছি। থ্যাংক য়্যু।
থ্যাংকস দেবার কিছু নেই। জিনিস ভাল হলে ছাপা হবে। বাসায় মল-মূত্র না ঢাললেও ছাপা হবে। মল-মূত্র দিয়ে বাড়ি মাখানোর শিশুসুলভ আচরণ করার কোন প্রয়োজন ছিল না।
সাজ্জাদ চুপ করে রইল। টেবিলে চা দিয়ে গেছে। চায়ের সঙ্গে বেলা বিসকিট।
খাও, চা খাও। যেদিন কাণ্ডটা প্রথম ঘটল আমি ভেবেছিলাম–কালপ্রিট হচ্ছে আতাহার। এর পেছনে তুমি আছ ভাবতে পারিনি। যাই হোক–পাস্ট নিয়ে হৈ চৈ করার কোন মানে হয় না। তবে তোমাদের প্রতি আমার এডভাইস হচ্ছে–গ্রো আপ। শিশু হয়ে থেকে না–গ্রো আপ। তোমরা গ্রোঁ আপ না করলে তোমাদের সৃষ্টিও গ্রো আপ করবে না। সৃষ্টিও শিশু থেকে যাবে। বুঝতে পারছি?
জ্বি পারছি।
ঐদিন রহমতউল্লাহ এসেছিল, তাকেও বললাম, রহমতউল্লাহ, গ্রো আপ। গ্রো আপ। ইনফেনসিতে আর কতকাল থাকবে? রহমতউল্লাহ ইদানীং ছদ্মনাম নিয়ে লিখছে–পার্থ সারথী বসু আমি বললাম, বাপ-মা রহমতউল্লাহ নাম রেখেছে, রহমতউল্লাহ নামেই লিখবো। পার্থ সারথী বসু লেখার মানে কি? তোমার কি ধারণা, হিন্দু নাম হলে লেখক-লেখক ভাব বেশি ফুটে? না-কি এই নাম বেশি আধুনিক বলে মনে হয়? সে কথা বলে না। তারপর গত শুক্রবারের পাত্রকা খুলে দেখি, সে আমাকে নিয়ে একটা ছড়া লিখেছে। ছড়ার শিরোনাম–কমিভূক। বুঝলাম, এখনো ইনফেনসিতে রয়ে গেছে।
সাজ্জাদ। বলল, উঠি গনি ভাই।
গনি সাহেব বললেন, না না, উঠবে কেন, বাস। তোমরা ইয়াং ব্লাড। তোমাদের সঙ্গে গল্প করতে ভাল লাগে। আতাহার কেমন আছে?
জ্বি, ভাল আছে।
ঐদিন নিউমার্কেটের পেছনে যে মার্কেটের মত আছে। সেখানে গিয়েছিলাম গ্রাস কিনতে, হঠাৎ দেখি আতাহার। দেখে মনে হল অসুখ-বিসুখ হয়েছে। চোখ-মুখ শূকনা। আমি বললাম, কি হয়েছে তোমার?
সে বলল, কিছু হয়নি। আমি খুব ভাল আছি। আনন্দে আছি। তাকে দেখে অবশ্যি মনে হল না সে আনন্দে আছে। অবশ্যি বাংলাদেশ যুবসমাজের জন্যে খুব আনন্দের জায়গা নয়।
আতাহারের বাবা মারা গেছেন।
সে কি! কবে?
গত শনিবারের আগের শনিবারে।
আতাহার তো আমাকে কিছু বলল না। বলল না কেন?
গনি সাহেব খুবই বিস্মিত হলেন। দুঃখিত গলায় বললেন, তোমাদের আমি অনেক কঠিন কঠিন কথা বলি। কিন্তু তোমাদের স্নেহ করি। এই স্নেহটাকে তোমরা হয়ত আন্তরিক বলে মনে কর না। আন্তরিক মনে করলে আতাহার তার বাবার মৃত্যু-সংবাদ আমাকে দিত। আমি সাহিত্যের বাইরে সান্তনার দু-একটা কথাও বলতে পারি। আতাহারের বাসার ঠিকানা কি?–
নতুন বাসার ঠিকানটা জানি না।
বাসা বদলেছে?
জ্বি।
তুমি তার এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তুমি তার নতুন ঠিকানাও জান না? আশ্চর্য তো! অবশ্য তোমাদের ব্যাপারে আশ্চর্য হওয়া ঠিক না। তোমরা অতি অদ্ভুত এক শ্রেণী। অতি অদ্ভুত!
অদ্ভুত বলছেন কেন?
তোমাদের আচার-আচরণ অদ্ভূত লাগে বলেই অদ্ভুত বলছি।
গনি ভাই, উঠি?
এই যে তুমি আমাকে গনিভাই বলছি, এটাও কি অদ্ভূত না? আমার বয়স তেষট্টি। মাথায় একটা কাচা চুল নেই–আমাকে ভাই বলছি। চাচা ডাকাটাই কি শোভন হত না? পনেরো বছরের চেংড়া ছেলে ঘরে ঢুকে বলে–গনি ভাই, একটা কবিতা নিয়ে এসেছি। কবিতা ছাড়া এমি দেখা করতে এলে চাচা ডাকত। হাতে কবিতা তাই–ভাই। এ হল সাহিত্যের ভাই।
সাজ্জাদ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, চাচা, আজ তাহলে উঠি? আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম।
গনি সাহেব ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন।
সাজ্জাদ ঠিক করল সে অফিসে ফিরে যাবে। অফিসে গিয়ে বলবে, ঘাম দিয়ে হঠাৎ জ্বর কমে গেল। ঘরে শুধু শুধু শুয়ে থাকার কোন কারণ না থাকায় চলে এসেছি। দেখি ফাইলপত্র কি আছে?
চিড়িয়াখানাতেও যাওয়া যায়। কণা যেমন হাতি দেখে এসেছে সেও গিয়ে হাতি দেখে এল। শিকলে বাধা হাতি দেখার ভেতর অন্য ধরনের আনন্দ আছে। হাতিকে বলা যায়–হে শক্তিমান পশু, সহস্ৰ শৃঙ্খলে মুক্তির স্বাদ পাবার ক্ষমতা তোমাকে দেয়া হয়নি। এই ক্ষমতা শুধুমাত্র মানুষের।
অফিসে যাবে, না চিড়িয়াখানায় যাবে, এই দোটানা থেকে সাজ্জাদ মুক্তি পাচ্ছে না। মানিব্যাগে কোন কয়েন নেই যে হেড অর টেইল টস করবে। তার হয়ে অন্য কেউ এই সিদ্ধান্তটা নিলে ভাল হত।
ড্রাইভার বলল, স্যার কোনদিকে যাবেন?
সাজ্জাদ বলল, কোনদিকেই যাব না। তুমি গাড়ি নিয়ে চলে যাও। আমি খানিকক্ষণ হাঁটব।
জ্বি আচ্ছা।
আচ্ছা দাঁড়াও। চল, অফিসের দিকে চল।
সাজ্জাদের ড্রাইভার অন্যসব ড্রাইভারদের মতই রোবট শ্রেণীর। মালিকের অস্থিরতা তাদের স্পর্শ করে না। যা বলা হবে তাই তারা করবে। হুকুমের বাইরে যাবে না। সে বলবে না–গাড়ি রেখে আপনি হাঁটবেন কেন স্যার? বাইরে তো বৃষ্টি হচ্ছে। তেমন জোরালো ভাবে হচ্ছে না। তবে জোরালোভাবে শিগগিরই শুরু হবে। আকাশে মেঘা জমছে। দীর্ঘদিনের ড্রাইভার তার জগৎ সংকুচিত করে ফেলে একটা গাড়ির ভিতর। গাড়ির বাইরে সে কিছু চিন্তা করতে পারে না। চাকায় হাওয়া কতটুক আছে? চল্লিশ পিএস আট। পিছনের বাঁদিকের চাকায় মনে হচ্ছে একটু কম। স্টিয়ারিং বদলানোর সময় ঘাস ঘ্যাস শব্দ হচ্চেছ কেন? সুন্দর সূর্যালোকিত সকল তাদের মুগ্ধ করে না। তাদের মুগ্ধ করে যখন সামনের রাস্তা থাকে ফাঁকা। গাড়ি চলে শব্দহীন মসৃণ ভঙ্গিতে। সমস্ত পৃথিবীটা চলে আসে চার চাকার সামান্য গাড়িতে।
