মানুষ কয়লার চেয়েও খারাপ ভাইজান।
সাজ্জাদ বলল, এসট্রে আছে কণা? সিগারেট খাব।
কণা এসট্রে এনে দিল। সুন্দর বাহারি এসট্রে। এ রকম গৃহস্থালিতে এত সুন্দর এসট্রে থাকার কথা না। কৃস্টেলের মাছ। মাছের পিঠে ছাই ফেলার ব্যবস্থা। কণা বলল, এসট্রেটা কত সুন্দর, দেখছেন ভাইজান?
হুঁ সুন্দর।
এইটাও চুরির। তার এক দূর সম্পর্কের মামা আছে। বিরাট ধনী। গুলশানে বাড়ি। তার কাছে গেছিল। আসার সময় পকেটে কইরা নিয়া আসছে।
বল কি?
এইটা হইল ভাইজান কপাল। কপালে লেখা ছিল–চোর স্বামী। পাইলাম চোর স্বামী। হি হি হি। ভাইজান চা খাইবেন?
চা খাওয়া যেতে পারে।
কফিও আছে।
কফি আছে?
একটা টিন কিন্যা আনছে–সত্তর টেকা দাম। মাঝে মধ্যে মিজাজ খুব ভাল থাকলে বলে, ও চাঁদের কণা, দেখি কফি বানাও।
তোমাকে চাঁদের কণা ডাকে?
একেক সময় একেক নাম। আবার যখন রাগ উঠে তখন ডাকে–বান্দি।
কণা চা বানানোর জন্যে ভেতরে চলে গেল। সাজ্জাদ চেহারে বসে পা নাচাতে লাগল। বাজছে এগারোটা। এই সময় তার অফিসে থাকার কথা। আজ সে অফিস কামাই করেছে। তবে চিঠি পাঠিয়েছে–হাই ফিভারে সে শয্যাশায়ী। অফিস থেকে কেউ দেখতে না চলে এলেই হয়। কণার স্বামীর বাসায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটুকু? সে এসে যদি দেখে অপরিচিত একজন লোক তার ঘরে বসে পা নাচাচ্ছে, তখন তার কাছে কেমন লাগবে? খুব ভাল লাগার কথা না। তবে ভাল না লাগলেও সে চুপ করে থাকবে। বিনীত ভঙ্গিতে কথা বলবে। কণার মত স্ত্রী যে স্বামীর আছে সেই স্বামী ভদ্র ও বিনীত হবে এটা ধরেই নেয়া যায়।
ভাইজান চা নেন।
কণা শুধু তার জন্যে চা আনেনি। তার নিজের জন্যেও এনেছে। সাজ্জাদের পাশের চেয়ারে সে বসেনি। বসেছে সামনে মেঝেতে। পদ্মাসনের ভঙ্গিতে বাসা। বসার ভঙ্গি সুন্দর। এইসব সুন্দর সুন্দর বসার ভঙ্গি নিশ্চয় ছবির মডেল হতে গিয়ে শিখেছে। মোসাদ্দেক সাহেব শিখিয়েছেন।
চিড়িয়াখানা দেখতে গিয়েছিলে?
জ্বি। আতাহার ভাই নিয়া গেল।
তোমার হাসবেন্ড গিয়েছিল?
জ্বি।
কোন জন্তুটা দেখে সবচে মজা পেয়েছ?
আমার কাছে ভাল লাগছে হাতি।
হাতি দেখার জন্যে তো কেউ চিড়িয়াখানায় যায় না। হাতি তো সব সময়ই দেখা যায়।
তারপরেও হাতি দেখতে ভাল লাগে। কি বিরাট জানোয়ার!
তোমার স্বামীর কাছে কোন জন্তুটা ভাল লেগেছে?
তার এইসব চেৎ-ভেৎ নাই। তার কাছে ইন্দুরও যা, হাতিও তা।
তোমার যখন আবার হাতি দেখার ইচ্ছা করবে–আমাকে খবর দেবে–আমি ব্যবস্থা করব।
আপনেরে খবর দিব ক্যামনে?
একটা কাগজ দাও, আমি টেলিফোন নাম্বার লিখে দিচ্ছি।
সাজ্জাদ টেলিফোন নাম্বার লিখে উঠে দাঁড়াল। কণা তার পেছনে পেছনে আসছে। সাজ্জাদ বলল, দরজা খোলা রেখে চলে আসছি যে? কণা হাসিমুখে বলল, আর আছেই কি আর নিবই-বা কি?
রাস্তা পর্যন্ত কণা নেমে এল। সে নেমে এসেছে খালি পায়ে, তার জন্যে কোন রকম অস্বস্তিও বোধ করছে না।
ভাইজান, এইটা আপনের গাড়ি!
আমার না, আমার বাবার গাড়ি।
কি সুন্দর গাড়িা!
পছন্দ হয়েছে?
খুব পছন্দ হয়েছে। সুন্দর গাড়ি দেখলে আমার ইচ্ছা করে গাড়িত কইরা সারাদিন ঘুরি।
একদিন গাড়ি পাঠিয়ে দেব। সারাদিন ঘুরবে।
জ্বি আচ্ছা।
তোমার চা খুব ভাল হয়েছে। চার জন্যে ধন্যবাদ।
কণা হাসল। সাজ্জাদ। বলল, যাই, কেমন?
কণা ঘাড় কাত করে সম্পমতি জানোল। কণার কিছু ব্যাপার সাজ্জাদের চোেখ পড়েছে। যেমন সে যখন চা শেষ করে চলে যাবার জন্যে উঠ দাঁড়িয়েছে তখন কণা বলেনি, আরেকটু বসে যান। যা মেয়েরা সব সময় করে থাকে। গাড়িতে উঠে সে যখন বলল, কণা যাই? তখনো কণা ঘাড় কত করে সায় দিয়েছে। বলেনি, আবার আসবেন।
ড্রাইভার বলল, স্যার, কোনদিকে যাব?
শহরে কয়েকটা চক্কর দাও।
সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় কাঠানোর কোন ব্যবস্থা করা দরকার। আতাহার সঙ্গে থাকলে ভাল হত। আতাহার ঢাকায় নেই। দেশের বাড়িতে গিয়েছে। পৈতৃক জমিজমা বিক্রির জন্যে গিয়েছে। কবে আসবে কে জানে।
সুবর্ণের অফিসে যাওয়া যেতে পারে। গনি সাহেবকে ধন্যবাদ দেয়া দরকার। তিনি তার একটা অনুবাদ ছাপিয়েছেন–বেশ ভালভাবে ছাপিয়েছেন। মূল ইংরেজ্বি কবিতা পাশাপাশি ছাপিয়েছেন। এতে মূলের সঙ্গে অনুবাদ মিলিয়ে পড়ার আলাদা আনন্দ পাঠক পাবে। তিনি ফুটনোটে কিছু কথা বলেছেন। সেই কথাগুলিও সুন্দর। গুছিয়ে লেখা। গদ্যের অনুবাদ এবং কবিতার অনুবাদের পার্থক্য বলতে বলতে তিনি লিখেছেন। গদ্য অনুবাদেও মূলের খুব কাছাকাছি থাকে। এটা গদ্যের সার্বজনিন।তাই প্রমাণ করে। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে–নতুন পৃথিবীতে সাৰ্বজনিন ব্যাপারগুলিই শেষ পর্যন্ত টিকবে। কাজেই এই আশংকা অমূলক নয়–ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কবিতা থাকবে না। গদ্য গ্ৰাস করবে কবিতাকে। আজ হতে শতবর্ষ পরে–কেউ কবিতা পাঠ করবে। এমন মনে হয় না।
গনি সাহেব অফিসে ছিএলন, সাজ্জাদকে দেখে আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, আরে তুমি? আসি আসা। তোমার চেহারায় উজ্জ্বল একটা ভাব চলে এসেছে–কি ব্যাপার বল তো?
চাকুরি করছি।
ভেরী গুড।
একসিলেন্ট। আজকালকার ইয়ং ছেলেমেয়েদের একটা ধারণা হয়েছে কবিতা লিখলে চাকরি-বাকরি কিছু করা যাবে না। পুরোপুরি বোহেমিয়ান হতে হবে। রাতে ঘুমুতে হবে পার্ক করা বাসে। তড়িফাঁড়ি খেতে হবে। ওদের বলার চেষ্টা করি–ইয়ং ম্যান, রবীন্দ্রনাথ কবিতা যেমন লিখতেন, পাশাপাশি জমিদারিও দেখাশোনা করতেন। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে কাব্যের বিরোধ নেই। কাব্যচর্চা হচ্ছে সুন্দরের অনুসন্ধান।
