২. বাচ্চা একটা ছেলের হাত থেকে গ্যাস বেলুন ছুটে গেছে। বেলুনটা আকাশে উঠে যাচ্ছে। ছেলেটা হতভম্ব হয়ে বেলুনটার দিকে তাকিয়ে আছে। কান্ন। তার বুকের কাছে জমা হয়ে উঠেছে, এখনো গলার কাছে আসেনি।
৩. প্রেমিক-প্রেমিকা রিকশা করে যাচ্ছে। রিকশার হুড় খোলা। ছেলেটা ক্ৰমাগত বক বক করছে, হাত-পা নাড়ছে, মেয়েটা বসে আছে মাথা নিচু করে। তার ঠোঁটের কোণায় চাপা হাসি।
৪. বাচ্চা মেয়ে মায়ের হাইহিল। পরে হাঁটার চেষ্টা করছে। এঁকেবেঁকে যাচ্ছে।
৫. একটি তরুণীর চোখ ধীরে ধীরে পানিতে ভরে উঠছে। শেষ পর্যন্ত সে অবশ্যি কাঁদবে না। চোখের জল চোখেই শুকিয়ে ফেলবে।
৬. স্ত্রী রাতে স্বামীর জন্যে এক কাপ চা নিয়ে এসেছেন। স্বামী বিস্মিত হয়ে বললেন, চা চাইনি তো? তারপর–অতি আনন্দের সঙ্গে চায়ের কাপের জন্যে হাত বাড়ালেন।…
লীলাবতীর চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রু গাড়িয়ে পড়ল না। চোখেই মিশে গেল। সে আতাহারের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি বসে বসে অরুর পেন্টোমাইম দেখুন, আমি সাজ্জাদ ভাইয়ের সঙ্গে দুটা কথা বলে আসি। অসম্ভব জরুরী।
লীলাবতী সাজ্জাদকে তার নিজের ঘরে নিয়ে এসেছে। ঘরটা প্ৰকাণ্ড। এক কোণায় ছোট্ট খািট। জাহানারা তার ছোট্ট মেয়ের জন্যে অর্ডার দিয়ে ছোঢ় খাট বানিয়েছিলেন। সেই মেয়ে বড় হয়েছে। এই খাটে ঘুমুলে তার পা খানিকটা বের হয়ে থাকে। কিন্তু খাট লীলাবতী বদলাবে না, সে তার ছোট্ট খাটেই এখনো ঘুমায়। ঘরে পাশাপাশি দুটা সোফা। সাজ্জাদ সোফায় বসতে গেল। লীলাবতী বলল, আপনি খাটে বসুন। পা তুলে বসুন।
কেন?
কারণ আমি আপনাকে নাচ দেখাব। আপনি কখনো আমার নোচ দেখেননি। আজ দেখতে হবে। ঘরটা আমি নাচের জন্যে তৈরি করে রেখেছি।
ভাল কথা। তোমার এই ঘরে সিগারেট খাওয়া যায়?
যায়। তবে এখন খেতে পারবেন না। নাচ শেষ হোক, তারপর খাবেন। যতক্ষণ আমি নাচব, এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
এই রকম সব কঠিন শর্ত মেনে নাচ দেখাটার কি কোন প্রয়োজন আছে?
হ্যাঁ আছে। আমার অনেক দিনের শখ আপনাকে নাচ দেখাব। কাজেই আপনাকে দেখতে হবে। নাচটা আপনার জন্যে হয়ত জরুরী না, আমরা জন্যে জরুরী।
কেন?
আপনাকে আমি ঠিক বুঝতে পারব না কেন। নাচ হচ্ছে নিবেদন।
সেই নিবেদন তো শরীরের নিবেদন। শরীরের নিবেদন কি স্থূল নিবেদন না?
শরীরের নিবেদন কেন বলছেন? মনের নিবেদন বলতে অসুবিধা কি? মনটা চোখে দেখা যাচ্ছে না। শরীরের ছন্দে আমি প্রকাশ করছি আমার মন।
তাও তো তুমি ঠিকমত প্রকাশ করতে পারছি না। তোমার শরীর তুমি ঢেকে রেখেছ কাপড়ে। ছন্দ ধরার জন্যে তোমার শরীর দেখতে হবে না?
লীলাবতী হতভম্ব হয়ে বলল, আপনি কি বুঝতে পারছেন। আপনি খুব কুৎসিত কথে বলছেন?
কুৎসিত কথা বলছি?
হ্যাঁ।
তাহলে সম্ভবত গাঁজা খেয়ে আসার কারণে বলছি। তোমার এখনো আসার আগে গাঁজা খেয়েছি। যাই হোক, দেখি তোমার নাচ।
আপনাকে কিছু দেখতে হবে না। আপনি চলে যান।
চলে যাব?
অবশ্যই চলে যাবেন। আপনার বন্ধু থাকুক। আপনার জন্যে আপনার বন্ধুকে বাসা থেকে বের করে দেব তা ঠিক হবে না।
লীলাবতী কাঁদছে। সাজ্জাদ সিগারেট টানতে টানতে বের হয়ে এল।
আবার ঝেঁপে বৃষ্টি নেমেছে। জাহানারা বারবিকিউয়ার সরাতে ব্যস্ত। তিনি সাজ্জাদের চলে যাওয়া দেখলেন না।
আতাহার মুগ্ধ হয়ে পেন্টোমাইম দেখছে। অরু মেয়েটা মূকাভিনয় এত সুন্দর করে! আগে সবাই হাসছিল। এখন কেউ হাসছে না। অরু মেয়েটি মূকাভিনয়ের মাধ্যমে একটি দুঃখী মেয়ের জীবন-কাহিনী দেখাচ্ছে।
কণা না-সূচক মাথা নাড়ল
সাজ্জাদ বলল, তুমি আমাকে চিনতে পারছ?
কণা না-সূচক মাথা নাড়ল। কিন্তু তার চোখে চাপা হাসি। মনে হচ্ছে সে বেশিক্ষণ হাসি চেপে রাখতে পারবে না। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়বে।
আমাকে চিনতে পারছি না?
জ্বি না।
সাজ্জাদ বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, ও আচ্ছা। কণা শাড়ির আঁচল গায়ে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল, আচ্ছা, আপনে কেমন মানুষ ভাইজান? আপনেরে কেন চিনব না?
আপনে সাজ্জাত ভাইজান।
ও আচ্ছা, যাক, মনে আছে তাহলে?
ভাইজান বসেন দেখি।
কণার ঘরে এসে সাজ্জাদ বেশ অবাকই হয়েছে। সে ভেবেছিল ঘরের সাজসজা বস্তির মত হবে। ব্যাপার তা নয়। সবকিছুই সুন্দর করে গোছানো। পরিষ্কার, ছিমছাম। দুটা কাঠের চেয়ার আছে। চেয়ারে কুশন দেয়া। একপাশে খাট আছে। খাটে টানটান করে ফুলতোলা চাদর বিছানো। অপ্রত্যাশিতভাবে খাটের পাশে বুকশেলফ। বেশকিছু বই আছে বুকশেলফে! বইগুলির নোম পড়া যাচ্ছে না। একটা বই চেনা যাচ্ছে–বিষাদসিন্ধু।
সাজ্জাদ বসতে বসতে বলল, তোমার হাসবেন্ড কোথায়? ফার্মেসিতে?
জ্বি না। তার এই চাকরিও গেছে। সে চাকরির খুঁজে বাইর হইছে।
দুদিন পরপরই কি তার চাকরি চলে যায়?
কণা খিলখিল করে হাসল যেন এমন মজার প্রশ্ন সে শুনেনি। শাড়িপরা মেয়েরা হাসির সময় মুখে এক পর্যায়ে আঁচল চাপা দেয়। সে দিচ্ছে না। সাজ্জাদের ধারণা হল, কণা জানে তার উচ্ছ্বসিত হাসির আলাদা সৌন্দর্য আছে।
বুঝলেন ভাইজান, ওর হইছে চুরির অভ্যাস। অষুধপত্র সরায়। পকেটে কইরা প্রত্যেক রাইত দুনিয়ার ট্যাবলেট আনে। তারপরে একদিন ধরা পড়ে। চাকরি নট হয়। আবার চাকরি হয়।
চুরির অভ্যাস তুমি দূর করার চেষ্ট কর না?
চেষ্টায় কোন ফয়দা নাই ভাইজান। কথায় আছে না–কয়লা ধুইলে না যায় ময়লা।
সেটা কয়লার ব্যাপারে সত্যি। মানুষের ব্যাপারে সত্যি না। মানুষ তো কয়লা না।
