লীলাবতীর বন্ধুরা খুব হৈ-চৈ করছে। এদের মধ্যে একজন ম্যাজিশিয়ান আছে যে ম্যাজিক দেখাচ্ছে এবং যা দেখাচ্ছে তার রহস্যই বের হয়ে পড়ছে। তাতে দর্শকদের আনন্দের কোন ঘাটতি হচ্ছে না। দড়ি কাটা খেলার সময় ম্যাজিশিয়ান দড়ি এবং কাচি হাতে উঠে দাঁড়াতেই একজন বলল, দেখুন, আপনার হাতের তালুতে কি? ম্যাজিশিয়ান বলল, কেঁচি।
হাত উপুড় করে দেখান। মনে হচ্ছে আরো কিছু আছে।
আর কিছু নেই, শুধুই কেঁচি।
দেখি না।
না, দেখানো যাবে না।
দেখাতে হবে।
বাধ্য হয়ে ম্যাজিশিয়ান হাত উপুড় করল। দেখা গেল হাতের তালুতে দড়ির একটা ছোট্ট টুকরা লুকানো। চারদিকে আনন্দের বান ডেকে গেল। ম্যাজিকের কৌশল ধরা পড়ে যাচ্ছে এই আনন্দ ম্যাজিকের আনন্দের চেয়েও বেশি।
জাহানারা বারবিকিউ তদারক করছেন। স্টেজ তৈরি হচ্ছে। বারবিকিউ-এর কয়লার আঁচ ঠিক আছে কি-না–— মাংস ঠিকমত ঝলসানো হচ্ছে কি-না। তিনি তাই দেখছেন। বার ঘণ্টা ধরে মাংস সিরকায় ড়ুবিয়ে রাখার কথা–তাঁর ধারণা, বাবুর্চি এই কাজটা করেনি। তিনি ভুরু কুঁচকে একটু পর পর আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন। বৃষ্টি এখন বন্ধ হয়েছে, তবে আকাশে মেঘের যেমন আনাগোনা, আবারো শুরু হবে। চুলা নিয়ে হলঘরে চলে যেতে হবে। ঘরের ভেতর বারবাকিউ, এ রকম হ্যাস্যকর কথা কে কবে শুনেছে? গাড়ির হৰ্ণ শুনে তিনি বারান্দা থেকে গাড়ি-বারান্দায় নেমে এলেন। লীলাবতীর বন্ধুবান্ধব কে কে আসছে তিনি দেখে রাখতে চান। লীলাবতীর বন্ধুবান্ধবদের ধরণ পাল্টে যাচ্ছে। এইসব খেয়াল রাখা দরকার। অহংকারী, জেদী ও দুর্বিনীত মেয়েদের মা হওয়া
গাড়ি থেকে সাজ্জাদ নোমছে। সাজ্জাদের সঙ্গের ছেলেটিকে তিনি চেনেন না। অপরিচিত যে কোন মানুষ দেখলে জাহানারার ভুরু কুঁচকে যায়–এবার কুচকালে না। সাজ্জাজের কোন বন্ধু হবে। এ বাড়ির দরজা সাজ্জাদের জন্যে যেমন খোলা–সাজ্জাদের বন্ধুর জন্যেও খোলা।
সাজ্জাদ বলল, কেমন আছেন খালা?
জাহানারা আনন্দিত গলায় বললেন, তুই কেমন আছিস?
খুব ভাল আছি। আপনার কন্যার জন্মদিনে বন্ধু নিয়ে এসেছি–এর নাম আতাহার। বাংলাদেশের সবচে বড় কবি হবার মত প্রতিভা দিয়ে জন্মেছিল–প্রতিভা ঠিকমত কাজ করছে না বলে আজেবাজে জিনিশ লিখে বেড়াচ্ছে। আর আতাহার–এই অসম্ভব রূপবতী মহিলার নাম জাহানারা। আমার দূর সম্পর্কের খালা। তাঁর কন্যা বিখ্যাত নর্তকী লীলাবতী। মায়ের রূপ মেয়ে পুরোপুরি পায়নি, যা পেয়েছে তাও কম না।
জাহানারা বললেন, তুই তো কখনো এক সঙ্গে এতগুলি কথা বলিস না। আজ বললি কি করে?
সাজ্জাদ বলল, আজ গাঁজা খেয়ে এসেছি খালা।
গাঁজা খেয়ে এসেছিস মানে?
বিকট গন্ধ পাচ্ছেন না? এই গন্ধ বিখ্যাত গ্রাসের গন্ধ।
জাহানারার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এমন চমৎকার একটা ছেলের এই অদ্ভুত স্বভাব কেন? জন্মদিনের উৎসবে সে গাঁজা খেয়ে আসবে কেন? আর যদি আসেই—বলার দরকার কি?
জাহানারা বললেন, জন্মদিনের খবর তোকে কে দিল?
লীলাবতী কাল রাত দুটার সময় টেলিফোন করে জানিয়েছে। সে না-কি রাজস্থানী নাচ নাচবে। রাজস্থানী নাচ আবার কি কে জানে? কথকফথতের নাম শুনেছি।
জাহানারার কাছে লীলাবতীর রাজস্থানী পোশাক পরে বসে থাকার কারণ স্পষ্ট হল। তবে মনে মনে এক ধরনের তীব্র আংশিকা বোধ করলনে। সাজ্জাদ চমৎকার ছেলে কিন্তু এই ছেলের কাছ থেকে দূরে থাকা সবচে মঙ্গল। এইসব ছেলেদের খুব কাছাকাছি যেতে নেই। এই তথ্য তিনি তার মেয়েকে দিতে চান। কিন্তু ভরসা পান না। সাজ্জাদের ব্যাপারে তার মেয়ের ভেতর এক ধরনের ঘোর কাজ করছে। এই ঘোর হঠাৎ করে কাটাতে গেলে সমস্যা হবে। বড় ধরনের সমস্যা হবে।
জাহানারা বললেন, ভেতরে চলে যাও। লীলাবতী বন্ধুদের সঙ্গে ম্যাজিক দেখছে।
ম্যাজিক হচ্ছে না-কি?
হুঁ।
ভালই হল, অনেকদিন ম্যাজিক দেখি না। খালা যাই তাহলে, ম্যাজিক দেখি গিয়ে।
তারা যখন ভেতরে ঢুকল তখন ম্যাজিকপর্ব শেষ হয়েছে। একটা মেয়ে মূকাভিনয় জাতীয় কিছু করছে। নিশ্চয়ই খুব মজাদার কিছু কারণ সবাই খুব হাসছে। সাজ্জাদকে ঘরে ঢুকতে দেখে লীলাবতী ছুটে এল। মূকাভিনয় থেমে গেল। ছেলেমেয়েরা হাসি হঠাৎ বন্ধ করে দেয়ায় সাজ্জাদের নিজেরই খারাপ লাগছে। একটু পরে ঘরে ঢুকলেই হত।
সাজ্জাদ বলল, তোমার জন্মদিনে এক বন্ধুকে নিয়ে এসেছি।
লীলাবতী আতাহারের দিকে না তাকিয়েই বলল, ভাল করেছেন। আমি ভেবেছিলাম। আপনি আসবেন না।
তুমি তো আসতে বললে?
আমি তো অনেকবারই আসতে বলি, আপনি আসেন না। তারপরে একবার আমি নিজেই গেলাম। আপনি ঘরে থেকেও বলে পাঠালেন, বাসায় নেই–পার্কে বেড়াতে গেছেন।
বুঝলে কি করে ঘরে ছিলাম?
দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বলল, ভাইয়া ঘরে। আমি আপনাদের বসার ঘরে গিয়ে বসলাম, কাজের মেয়ে কিছুক্ষণ পরে এসে বলল, আপনি পাকে বেড়াতে গেছেন।
সাজ্জাদ হেসে বলল, ঘরে বসে থেকেও অনেক সময় পাকে বেড়ানো যায়। আমার শরীরটা ঘরে ছিল–মন ছিল পার্কে। তুমি নিশ্চয়ই আমার শরীরের সঙ্গে দেখা করতে যাওনি। দেখা করতে গিয়েছিলে মনের সঙ্গে।
লীলাবতী তাকিয়ে আছে। আতাহার লক্ষ্য করছে মেয়েটির চোখে পানি জমতে শুরু করেছে। চোখ পানিতে ভরে উঠতে শুরু করছে। কি আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য! সে অনেকবার ভেবেছে এই পৃথিবীর অপূর্ব কিছু দৃশ্যের সে একটা তালিকা করবে। যেমন–
১. গরমের দুপুরে মেঝেতে শুধুমাত্র একটা বালিশ পেতে তরুণী শুয়ে ঘুমুচ্ছে। তার মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের হাওয়ায় মাথার কিছু চুল উড়ছে।
