সাজ্জাদ সিগারেটের প্যাকেট বের করে দিল। আতাহার বলল, সিগারেট খাব না।
সাজ্জাদ। বলল, সিগারেট না, গাজা। দি গ্রেট গ্রাস। প্রথম শ্রেণীর। যত্ন করে তৈরি করা। থু-তিনটা খা, দেখবি ভাল লাগবে। আমি আজ সকাল থেকে খাচ্ছি।
এখন যাচ্ছিস কোথায়?
লীলাবতীর জন্মদিনের উৎসবে।
লীলাবতীটা কে?
এই পৃথিবীর সেরা রূপবতীদের একজন।
লীলাবতীর কথা তো আর কখনো শুনিনি।
সাজ্জাদ হাসল।
আতাহারের মনে হল, সাজ্জাদের অনেক কিছুই আসলে সে জানে না। পরীক্ষণেই মনে হল–শুধু আতাহার না, সাজ্জাদ নিজেও জানে না।
পরিপূর্ণভাবে নিজেকে যে মানুষ জেনে ফেলে জীবন তার কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। সে তখন জীবন থেকে মুক্তি কামনা করে। কবি মায়াকোভস্কি নিজেকে জেনে ফেলেছিলেন–কাজেই জীবন তার কাছে অর্থহীন হয়ে গিয়েছিল। তিনি নিজেই সেই জীবনের ইতি করেছিলেন।
লীলাবতীদের বাড়ি
লীলাবতীদের বাড়ি ওয়ারীতে। বাড়ি না বলে দুর্গ বললেও খুব ভুল হবে না। জেলখানার মত উঁচু পাচিলে বাড়ি ঘেরা। গেট নিশ্চিছন্দ্ৰ লোহার। ফাঁক-ফোকর নেই যে ভেতরের কোন দৃশ্য হঠাৎ চোখে পড়বে। এই জাতীয় বাড়ির ভেতরটা সাধারণত অন্য রকম হয়ে থাকে। গেট পেরিয়ে ভেতরে পা দিলেই আধুনিক কেতার বাংলো টাইপ বাড়ি দেখা যায়। লীলাবতীদের বাড়ি সে রকম নয়। নোনা ও শ্যাওলা ধরা পঁচিলের মত বাড়িটাও নোনা ও শ্যাওলা ধরা। ফরিদার মা জাহানারা গত দশ বছর ধরে এই বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করার পরিকল্পনা করছেন। জাহানারা এমন এক মহিলা যিনি তার সমস্ত প্রতিভা শুধুমাত্র পরিকল্পনাতেই ব্যয় করেন। অর্থ-বিত্তহীন মানুষদের প্রধান বিলাস পরিকল্পনা। জাহানারা বেগমের অর্থবিত্ত দুটাই আছে। বেশি পরিমাণেই আছে। জাহানারার স্বামী ওয়াকিল আহমেদ অর্থ ও বিত্ত দুটোই প্রচুর পরিমাণে রেখে মারা গেছেন। জাহানারা সেই সঞ্চিত অর্থ কিছুই খরচ করতে পারেননি।
মেয়েকে নিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবেন এই জাতীয় পরিকল্পনা তাঁর ছিল। এখনো আছে–সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি।
আজ লীলাবতীর ১৮তম জন্মদিন।
এই জন্মদিন তিনি কিভাবে পালন করবেন তা নিয়ে গত তিনমাস ধরে চিন্তা করেছেন। একটি মেয়ের ১৮তম জন্মদিন খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি ঠিকঠাকমত হোক তিনি মনে-প্ৰাণে তা চেয়েছিলেন। বয়স ১৮ হয়েছে। লীলাবতী ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে পারবে–কাজেই তিনি ভেবেছিলেন মেয়েকে ছোট্ট একটা গাড়ি কিনে দেবেন। সেই গাড়ি শেষ পর্যন্ত কেনা হয়নি। তাঁর রঙ পছন্দ হয়নি। তাঁর পছন্দ লাল রঙ। সেই লাল–রঙের লাল না। সূর্য ডোবার পরে পরে আকাশে যে লাল রঙ দেখা যায়। সেই রঙ। তেমন পাওয়া যায়নি। কোন লাল রঙ তার চোখে লাগল না।
জন্মদিনে বাড়ির ছাদে একটা গানের আসর করবেন–এই পরিকলল্পনাও ছিল। কয়েকজন গায়িকার সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলেন। তিনজনের একটা তালিকা করেছিলেন। যেহেতু একক গানের অনুষ্ঠান সেহেতু তিনজনের ভেতর কাকে বলবেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেটা ঠিক করতে পারলেন না। জন্মদিনের অনুষ্ঠান অবশ্যি তার পরেও ভালমত হয়েছে। লীলাবতীর বন্ধুবান্ধবরা ঝাক বেঁধে এসেছে। জাহানারা কখনো কোন অনুষ্ঠানে তার বা তার শ্বশুরবাড়ির কাউকে আসতে বলেন না। তারপরেও অনেকে এসেছে। বাড়ির প্রধান দরজায় লাল-নীল ক্ৰীশমাস বাতি জ্বলছে–নিভাছে। লীলাবতী এই বাতি দেখে মার সঙ্গে খানিকক্ষণ রাগারগি করল। সে মাথা ঝাকিয়ে বলল, মা, আমার কি বিয়ে না-কি? বাতি-ফ্যাতি কেন?
জাহানারা বিরক্ত গলায় বললেন, উৎসবে বাতি জ্বলে। এটা নতুন কিছু না। তুই ও রকম মাথা ঝাকিয়ে কথা বলবি না তো। অসহ্য লাগে।
লীলাবতী বলল, (আবার মাথা ঝাকিয়ে–সে মাথা না বঁকিয়ে কথা বলতে পারে না)। আমার সব কিছুই তোমার অসহ্য লাগে?
জাহানারার মুখে এসে গিয়েছিল বলেন–হ্যাঁ লাগে। শেষ মুহুর্তে নিজেকে সামলালেন। বললেন না। মেয়ের জন্মদিন। এই দিনে কঠিন কঠিন কথা না বলাই ভাল। তবে সত্যি কথা হচ্ছে লীলাবতীর বেশিরভাগ জিনিশই তার অসহ্য লাগছে। বিশেষ করে জন্মদিন উপলক্ষে যে পোশাকটা পরেছে–সেটা তো রীতিমত অশালীন।
জাহানারা বললেন, তুই এটা কি পরেছিস?
লীলাবতী বলল, রাজস্থানী একটা ড্রেস পরেছি মা।
আজকের দিনে রাজস্থানী ড্রেস কেন? এটা কি রাজস্থান? তুই কি রাজস্থানের মরুভূমিতে বাস করছিস?
হ্যাঁ–আমার কাছে বাড়িটাকে রাজস্থানের মরুভূমির মতই লাগছে মা।
সুন্দর দেখে একটা শাড়ি পর। আঠারো বছরের জন্মদিনে সব মেয়েরা শাড়ি পরে। লীলাবতী বলল, আমি পরি না। আমি রাজস্থানী ড্রেস পরি। তা ছাড়া আজ আমি নাচব। শাড়ি পরে নাচব কিভাবে?
জাহানারা মনে মনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর মনে হল, তার একচল্লিশ বছরের জীবনে তিনি যে কয়টা বড় ভুল করেছিলেন–তার মধ্যে একটা হচ্ছে মেয়েকে নাচ শেখানো। আট বছর বয়সে তিনি নিজে নাচের স্বকুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে
লীলাবতীর বাবা ওয়াকিল আহমেদ সাহেব এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, দিনরাত বাসায় নূপূরের শব্দ, এইসব কি? নাচ হচ্ছে এক ধরনের লাফালাফি–এর মধ্যে শেখার কি আছে? শিখতে চাইলে গান শিখুক।
জাহানারা বিরক্ত হয়ে বললেন, নাচ যদি লাফালাফি হয় তাহলে তো গানও চিৎকার। গান শিখে তাহলে লাভ কি?
জাহানারা মেয়েকে গান শেখাননি–নাচই শিখিয়েছেন। এখন মনে হচ্ছে তিনি ভুল করেছেন। লীলাবতী হয়ছে দুর্বিনীত, অহংকারী ও জেদী। তার মাথায় কিছু একটা ঢুকলে তা আর বের হয় না। স্থায়ীভাবে বসে যায়। নাচ মেয়ের মাথায় বসে গেছে। এখন তাঁর মনে হয় কাঁটা দিয়ে মাথার ভেতর থেকে জিনিস তোলার ব্যবস্থা থাকলে তিনি তুলে ফেললেন।
