এইটাই নিয়ম। পুত্র নিজের হাতে পিতার দেহ নামাবে।
নিয়ম তো জীবিতদের জন্যে। মৃতদের জন্য আবার নিয়ম কি?
মৌলানা বিস্মিত হয়ে তাকাচ্ছেন। আতাহার নিজেও তার নিজের কথায় বিস্মিত হচ্ছে। কি বলছে সব পাগলের মত? সে একই শুধু পাগলের মত আচরণ করছে। কই আর কেউ তো করছে না। ফরহাদ চিৎকার করে কাঁদছে। একজন বয়স্ক পুরুষের এই ভঙ্গিতে কান্না হাস্যকর। তারপরেও এই হাস্যকর ব্যাপারটা স্বাভাবিক লাগছে।
পিতার মৃত্যুতে পুত্র-কন্যারা কাঁদবেই। কাদাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আতাহার কাঁদতে পারছে না। তার বিরক্তি বোধ হচ্ছে।
বৃষয়ি পড়তে শুরু করছে। বেশ ভাল বৃষ্টি। কবরের ভেতর বৃষ্টির পানি জমতে শুরু করেছে। বৃষ্টির জমা পানি রশীদ সাহেবের খুব অপছন্দ ছিল। সেই অপছন্দের জিনিসটা তাঁর মৃত্যুর সময় ঘটল। তাঁকে শুইয়ে দিতে হল পানির ভেতর।
মৌলানা সাহেব বললেন, পানির মধ্যে লাশ রাখা হয়েছে। এই জন্যে কেউ মন খারাপ করবেন না। পানি হল আল্লাহ পাকের রহমত।
না, আতাহার মন খারাপ করছে না। বরং তার ভাল লাগছে। এই ভেবে যে, প্রবল বৃষ্টি হঠাৎ শুরু হওয়ায় দাফন পর্ব দ্রুত শেষ হয়ে গেল। এখন বাসায় ফেরা যায়।
আতাহারের বাসায় ফিরতে ইচ্ছা করছে না। তার মাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। বাসায় ফিরে তাকে কি অবস্থায় সে দেখবে কে জানে? তিনি, মিলি এবং ফরহাদ মিলে কান্নার কোরাস শুরু করবে–সেখানে আতাহার যোগ দিতে পারবে না। ব্যাপারটা তার নিজের জন্যেও অস্বস্তিকর, আপেপাশে যারা থাকবে তাদের জন্যেও অস্বস্তিকর।
সালমা বানুকে যখন বাসায় নিয়ে আসা হয়েছিল তখন তাঁর জ্ঞান পুরোপুরি ছিল। কিন্তু তিনি স্বাভাবিক আচরণ করেননি। শান্ত গলায় বলেছেন, মনিকাকে কি খবর দেয়া হয়েছে? ওকে খবরটা দেয়া দরকার। আত্মীয়স্বজন সবাইকে কি বলা হয়েছে? কেউ যেন বাদ না থাকে। গ্রামের বাড়িতে খবর দেয়া দরকার। হিরনপুর পোস্টাপিসের হেড মাস্টারকে খবর দিলেই খবর পৌঁছে যাবে। এইসব কথা খুবই যুক্তির কথা। প্রবল শোকে মানুষের যুক্তির ব্যাপারটা নষ্ট হয়ে যায়। সালমা বানুর নষ্ট হয়নি–তার অর্থ প্রবল শোক তিনি অনুভব করছেন না। তিনি আছেন ঘোরের মধ্যে। মস্তিষ্কের যে অংশ শোক অনুভব করে সেই অংশ অকেজো হয়ে আছে।
মৃতদেহ ধোয়ানোর ব্যাপার যখন এল তখন সালমা বানু হঠাৎ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, এ কি, ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল দেয়া হচ্ছে? সবার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? তোর বাবা সারাজীবন গরম পানি দিয়ে গোসল করেছে। ভাদ্র মাসের গরমেও তার জন্যে পানি গরম করতে হয়। তোরা বেআক্কেলের মত ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল দিচ্ছিস? মানুষটা মরে গেছে বলে যা-ইচ্ছা-তাই করবি?
বলেই তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। সেই কান্না প্রিয়জনের মৃত্যুর শোকের কান্না না–প্রিয় মানুষটিকে কেন ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করানো হল সেই দুঃখের কান্না। কাঁদতে কাঁদতেই তিনি ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন। চারদিকে তাকান, কাউকে চিনতে পারেন না। আতাহার বলল, মাকে হাসপাতালে দিয়ে আসি?
মিলি বলল, আজ দিনটা মা থাকুক। কাল দিয়ে এলেই হবে।
এমন প্রবল শোকের বাড়িতে মানুষের যেতে ইচ্ছে করে না। তবু আতাহারকে যেতে হচ্ছে। ভিজতে ভিজতে যে সে যাবে সে উপায় নেই। অচেনা একজন মানুষ তার মাথার উপর ছাত ধরে আছে। মানুষটার গা থেকে বিকট ঘামের গন্ধ আসছে। আতাহারের বলার ইচ্ছা করছে–ভাইজান, আপনি লাইফবয় সাবান দিয়ে গোসল করবেন। টিভির বিজ্ঞাপনে দেখেছি–লাইফবয় সাবান দিয়ে গোসল করলে ঘামের গন্ধ চলে যায়। দয়া করে বগলে সাবান বেশি করে মাখবেন। একশ হর্স পাওয়ারের গন্ধ আপনার বগল থেকে আসছে। ছাতা উঁচু করে ধরায় আপনার বর্গল ফ্রি হয়েছে–ভুর ভূর করে গন্ধ আসছে। ভুর ভর করে গন্ধ আসছে বলাটা ঠিক হবে না। ভুর ভূর করে আসে মিষ্টি গন্ধু। বাদ ঘুণ অন্য কোনভাবে আসার কথা। বাংলা সাহিত্যে বন্দ ঘ্রাণ আসার কোন শব্দ কি আছে? রবীন্দ্রনাথ কোন শব্দ তৈরি করে যাননি?
ভুর ভূর করে ফুলের ঘ্রাণ আছের মত কীর কীর করে দুর্গন্ধ আসছে।
বাসার সামনে এসে আতাহার। থমকে দাঁড়াল। সাজ্জাদের লাল ঢয়োটা দাঁড়িয়ে আছে। সাজ্জাদ বসে আছে গাড়ির ভিতর। গাড়ির সব কাচ ওঠানো। মনে হয় সাজ্জাদ ক্রমাগত সিগারেট খাচ্ছে। গাড়ির ভেতরটা ধোয়ায় ভর্তি হয়ে আছে। সাজ্জাদ গাড়ির কাচ নামিয়ে বলল, আতাহার, উঠে আয়। আতাহার গাড়িতে উঠে পড়ল। সাজ্জাদ বলল, আতাহার, তোকে আমি কি ভাবে সান্তনা দেব আমি জানি না। তোর বাবার সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিল। অনার্স পরীক্ষায় ফার্স্ট হবার পর তোকে খবর দেবার জন্যে তোর বাসায় গেলাম। দেখি তুই নেই। তোর বাবা গম্ভীর মুখে বের হয়ে এলেন। কঠিন মুখে বললেন, কি চাই?
আমি বললাম, আতাহারের সঙ্গে একটু দরকার ছিল।
উনি আবার বললেন, দরকারটা কি?
আমি মহা বিরক্ত হয়ে বললাম, আমার অনার্স পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে সেই খবরটা ওকে দিতে এসেছিলাম।
রেজাল্ট কি?
ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি।
তোর বাবা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। কিছুতেই ছাড়েন না। যখন ছাড়লেন তখন দেখি তার চোখে পানি। বুঝলি আতাহার, আমার যখন খুব মন খারাপ থাকে তখন সুন্দর সুন্দর দৃশ্য কল্পনা করি। তাঁর চোখের পানির দৃশ্য তার মধ্যে একটা।
আতাহার বলল, আমার বাবার সারাজীবনের শখ ছিল তার ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় ফার্স্ট-সেকেন্ড হবে। আমরা কেউ সেকেন্ড ডিভিশনের উপর কিছু করতে পারিনি।
