মা ফরিদা,
আমার বড় মেয়েটির বিয়ের ব্যবস্থা তুমি করে দিয়েছিলে। আমার দ্বিতীয় মেয়েটির জন্যে একজন ছেলে দেখে দাও মা। জীবনযুদ্ধে আমি পরাজিত হয়েছি। নিজের উপর বিশ্বাস এবং আস্থাও হারিয়ে ফেলেছি। এখন কেবলই মনে হয়, আমি নিজে কিছুই করতে পারব না। আমার স্ত্রী খুবই অসুস্থ। সব মানুষই তার অসুস্থ স্ত্রীর আরোগ্যের জন্যে প্রার্থনা করে। আমি একমাত্র ব্যতিক্রম। আমি সালমার আরোগ্যের জন্যে কখনো আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি নাই। আমি চাই আমার আগে তার মৃত্যু হোক। যদি তার আগে আমার মৃত্যু হয় তাহলে সে বড়ই কষ্টে পড়বে। তার জন্যে এই কষ্ট আমার কাম্য নয়।
মা, তুমি গত ঈদে আমার স্ত্রীকে যে কম্বলটি উপহার দিয়েছ, সেই কম্বল সে সব সময় ব্যবহার করে। হাসপাতালে যাবার সময়ও সে সেই কম্বললটি সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।
মা, অনেক অপ্রিয় কথা লিখে ফেললাম। বৃদ্ধ শিক্ষকের ভাবালুত ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখো।
ভাল থেকে।
তোমার স্বামী এবং পুত্র-কন্যাদের নিত্য মঙ্গল কামনা করি।
তোমার স্যার
রশীদ আলি
সকাল হচ্ছে। মসজিদে আজান হল। আকাশ মেঘলা বলে এখনো চারপাশ অন্ধকার। আতাহার বের হয়েছে। প্রথমে যাবে হাসপাতালে। দিনের শুরুতে কাউকে মৃত্যু সংবাদের মত ভয়াবহ সংবাদ কি দিতে আছে?
না, দিতে নেই।
রাস্তায় রিকশা আছে। তবু আতাহার হেঁটে রওনা হল। রিকশায় দ্রুত যাবার দরকার নেই। যত দেরিতে পৌঁছানো যায় ততই ভাল।
হাসপাতালের গেটের কাছে এসে আতাহার চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ভিতরে ঢুকতে ইচ্ছা করছে না। সে রওনা হল নীতুদের বাড়ির দিকে। হেঁটে হেঁটে রওনা হল। আজ তার ইচ্ছা করছে। সারাদিন শুধু হাঁটতে। ঢাকা শহরের প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি অলি-গলি হাঁটতে কতক্ষণ লাগবে? আতাহার মনে মনে বলল, আমি নাগরিক এক কবি। নাগরিক কবি হিসেবে এই শহরের প্রতিটি রাস্তায় আমার পদচিহ্ন থাকা উচিত।
নীতু দরজা খুলেই বলল, এত সকালে?
আতাহার কিছু বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
নীতু বলল, নাশতা খাবেন?
আতাহার বলল, হুঁ।
আপনার কি শরীর-টরীর খারাপ নাকি? আপনাকে কেমন যেন অদ্ভূত দেখাচ্ছে।
দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন।
না, বসব না।
কি অদ্ভুত কথা! বসবেন না, মানে নাশতা খাবেন কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?
নাশতা খাব না রে নীতু। চলে যাব।
আপনার কি হয়েছে আতাহার ভাই, বলুন তো? আপনি এই চেয়ারটায় বসুন। তারপর বলুন। আপনাকে ভয়ংকর ক্লান্ত লাগছে।
অনেকটা রাস্তা হেঁটে এসেছি।
হেঁটে এসেছেন কেন? রিকশাভাড়া ছিল না?
হেঁটে আসতে আসতে মনে মনে একটা দীর্ঘ কবিতা লিখেছি। কবিতার পুরোটা মাথার ভেতর লেখা হয়েছে।
কাগজ-কলম। এনে দেব? লিখবেন?
না। বাবাকে নিয়ে এই প্রথম একটা কবিতা লিখলাম।
আপনার মা কি সুস্থ আছেন আতাহার ভাই?
হ্যাঁ, মা ভাল আছেন। বাবাকে নিয়ে যে কবিতাটি লিখেছি তার পেছনে একটা মজার ইতিহাস আছে। শুনবি?
আপনার জন্যে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসি–তারপর শুনি।
না, চা খাব না। ইতিহাসটা শোন। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। স্কাউট জাম্বাবুরিতে যাব। খুব ভোরে ট্রেন। আমি জেগে বসে আছি–আমার ভয়–একবার ঘুমিয়ে পড়লে আর সকালে উঠতে পারব না। বাবা বললেন–বটু শোন, তুই আরাম করে ঘুমা। আমি বরাদ্দায় জেগে বসে থাকব। বাবা সারারাত জেগে বসেছিলেন। আমি নিশ্চিন্তু মনে ঘুমিয়েছি। কবিতাটা শুনিবি?
বলুন।
আমার ভোরের ট্রেন, বাবা বলিলেন,
ঘুমো তুই ডেকে দেব ফজরের আগে।
নীতু অবাক হয়ে দেখল আতাহারের চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। গলা ধরে যাওয়ার্য কবিতার বাকি লাইনগুলি সে বলতে পারছে না। সে আতাহারের হাত ধরে বলল, কি হয়েছে আতাহার ভাই?
বাবা গত রাতে মারা গেছেন।
নীতু সঙ্গে সঙ্গেই আতাহারকে জড়িয়ে ধরল। চিরন্তন মমতাময়ী নারী তার সুবিশাল বাহু প্রসারিত করল। আতাহার কাঁপছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নীতু তার পিঠে গভীর মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
চৌদ্দ ঘণ্টা আগেও একটা মানুষ জীবিত ছিল। তার হৃদপিন্দ ধ্বক করে স্পাদিত হচ্ছিল। গভীর আনন্দে তার শরীরের লোহিত কণিকারা অক্সিজেন নিয়ে ছোটাছুটি করছিল। তাদের ব্যস্ততার সীমা ছিল না, এই অক্সিজেন নিয়ে ছুটে যাওয়া, আবার কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেয়ার জন্যে দৌড়ানো। আজ তাদের কোন ব্যস্ততা নেই। তারাও নিশ্চয়ই গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবছে–ব্যাপারটা কি?
মৌলানা সাহেব আতাহারের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি কাব্বরে নামবেন?
কব্বর শব্দটা আতাহারের কানে খট করে বাজল। মৌলানা সাহেব কবর কে কব্বর বলছেন কেন? কবরের আরবী কি কব্বর?
আতাহারের ভুরু কুঁচকে গেল। কত তুচ্ছতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তার মস্তিষ্ক এখন ব্যস্ত। কবরের আরবী কবর হলেই বা কি না হলেই বা কি? তবু মস্তিষ্কের নিউরোন ব্যস্ত হয়ে ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিয়ে ভাবছে। সে হয়ত অতি যত্নে মস্তিকের মেমরি সেলে এই তথ্য জমা করে রাখবে–কোন এক সময় আতাহার তার কোন কবিতায় ব্যবহার করবে–কব্বর।
তিনি শায়িত ছিলেন গাঢ় কব্বরে
যার দৈর্ঘ-প্রস্থ বেঁধে দেয়া,
গভীরতা নয়।
কব্বরে শুয়ে তার হাত কাঁপে পা কাঁপে
গভীর বিস্ময়বোধ হয়।
মনে জাগে নানা সংশয়।
মৃত্যু তো এসে গেছে, শুয়ে আছে পাশে
তবু কেন কাটে না এ বেহুদা সংশয়?
ভাইজান নামেন, কব্বরে নামেন।
আতাহার বলল, কেন, কবরে নামব কেন?
