সালমা বানু বললেন, আহা পড়ুক। ভাল রেজাল্য করতে চায়।
গাধা আবার ভাল রেজাল্ট কি করবে?
আহা গাধা বলছি কেন?
গাধাকে কি বলব? মহিষ বলব?
ফরহাদ পড়ছে। তার গলার স্বর ক্রমেই উঠছে। কোমল সা থেকে মন্দ্র সপ্তকের সা। আরো বাসরে–গলা আরো চড়ছে।
তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি শুনলেন, ফরহাদ পড়ছে। গুনগুন শব্দে পড়ছে। তিনি বিছানা থেকে শান্ত ভাঙ্গতে নামলেন। দরজা খুলে বারান্দায় এলেন। ফরহাদের ঘরের বাতি নেভানো। তাকে জাগতে দেখে বাতি নিভিয়ে দিয়েছে। বদমায়েশির একটা সীমা থাকা দরকার। বার করছি তোমার গুনগুনানি। তিনি ফরহাদের দরজায় লাথি দিলেন।
ফরহাদ দরজা খুলে বের হয়ে এল। বাবাকে দেখে তার মুখ শুকিয়ে গেল।
এই বদমায়েশ! তোকে না বললাম ঘুমিয়ে পড়তে? আমার সাথে রংবাজ্বি করছিস? রঙিলা হয়েছিস?
বাবা, আমি ঘুমাচ্ছিলাম।
আবার মিথ্যা কথা?
রশীদ আলি তার শরীরের প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে ছেলের গালে চড় বসালেন। ফরহাদ হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। রশীদ আলির কাছে মনে হল ফরহাদের ঠোঁটের কোণে হাসি। তিনি হুংকার দিয়ে উঠলেন, হাসছিস কেন?
ফরহাদ কি যেন বলল। তিনি শুনতে পেলেন না। ছেলের গায়ে প্রচণ্ড এক লাথি বসালেন। ব্যথায় তার নিজের পা মনে হল খুলে পড়ে যাচ্ছে।
আতাহার তার ঘর থেকে বের হয়েছে। হৈ-চৈয়ের কারণ সে বুঝতে পারছে না। বাসায় কিছু একটা হচ্ছে। সেটা কি? মিলি বাসায় নেই, সে হাসপাতালে–মার সঙ্গে। ফরহাদের কিছু হয়েছে কি? রাত-বিরেতে হঠাৎ হঠাৎ সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আতাহার ফরহাদের ঘরের দরজার সামনে এসে এক ভয়ংকর দৃশ্য দেখল। বাবা ফরহাদের গায়েমাথায় লাথির পর লাথি মেরে যাচ্ছেন। ফরহাদ রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে বাবাকে দেখছে।
আতাহার বলল, বাবা, কি হয়েছে?
রশীদ আলি দরজার দিকে তাকালেন।
আতাহার বলল, বাবা, আপনার কি শরীর খারাপ?
রশীদ আলি জড়ানো গলায় বললেন, হ্যাঁ আমার শরীরটা খারাপ। ঘুম হচ্ছে না–বলেই দেয়াল ধরার চেষ্টা করলেন। তিনি পড়েই যেতেন, তার আগেই আতাহার তাকে ধরে ফেলল এবং তার ঠিক দশ মিনিটের মাথায় তিনি মারা গেলেন।
মৃত্যুর আগে আগে তার মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছিল এবং তিনি খুব ঘামছিলেন। হাঁপরের মত শ্বাস টানতে টানতে তিনি ফরহাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, বাবা রে, আমি খুবই লজ্জিত। খুবই দুঃখিত। আমি তোর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
ফজরের আজান হওয়া পর্যন্ত দুই ভাই মূর্তির মত মুখোমুখি বসে রইল। ফরহাদ মাঝে মাঝে ফোপানির মত শব্দ করছে। তবে কাঁদছে বলে মনে হচ্ছে না। আতাহার একবার শুধু বলল, কাঁদস না। তাতে ফরহাদের ফোপানি থামল না। তবে সে মনে হয় কাঁদছে না। এ রকম শব্দ করে মানুষ কাঁদে না। বড় ধরনের শারীরিক কষ্টের সময় মানুষ এরকম শব্দ করে। স্বজনের মৃত্যুর কষ্ট শারীরিক কষ্ট নয়, এই কষ্ট মাথার ভেতরে হয়।
আতাহারের মাথার ভেতরটা খালি হয়ে গেছে। খালি পেটে প্রচুর সিগারেট খেলে যে রকম লাগে। সে রকম লাগছে। বমিভাবও হচ্ছে। নাকে ঝাঁঝালো গন্ধ লাগছে। ঝাঝালো গন্ধ লাগার কোন কারণ নেই। কেন লাগছে কে জানে। রসূনের গন্ধের মত গন্ধ। মৃত মানুষের শরীর থেকে কি রসূনের গন্ধের মত কোন গন্ধ আসে?
সামনের দিনটা ভয়ংকর। সকাল ছটা থেকে সন্ধ্যা ছাঁটা পর্যন্ত অনেক কিছু করতে হবে। মাকে খবর দিতে হবে। তাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসতে হবে। আত্মীয়স্বজনদের খবর দিতে হবে। মনিকাকে একটা টেলিফোন করতে হবে। মৃতদেহ ধোয়ানোর একটা ব্যাপার আছে। অনেক জটিল নিয়ম কানুন। এইসব নিয়ম কানুন যারা জানে তাদের খবর দিয়ে আনতে হবে। কবর কোথায় দেয়া হবে? কবর দেয়ার নিয়মকানুন কি? কোথায় যেতে হবে? কার কাছে যেতে হবে? এইসব ব্যাপারে সবচে ভাল যে জানত তার নাম মজিদ। সে পড়ে আছে নেত্রকোনায়।
আতাহার ক্ষীণ স্বরে ডাকল, ফরহাদ!
ফরহাদ কিছু বলল না, তবে তার অদ্ভুত ফোপানি বন্ধ করল।
আতাহার বলল, ফজরের আজান হলেই আমি মাকে খবর দিতে যাব হাসপাতালে–তুই একা একা থাকতে পারবি না?
হুঁ।
বাড়িওয়ালাকে খবর দিস–চলে আসবে।
হুঁ।
কয়টা কাজে দেখ তো?
ফরহাদ নড়ল না–বসেই রইল। সময় দেখার তার কোন ইচ্ছে নেই। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার অন্ধকার লাগছে। ঘরে বাতি জ্বলছে, তারপরেও অন্ধকার। আতাহার এর কারণটা ধরতে পারছে না। তার প্রচণ্ড ইচ্ছা হচ্ছে সিগারেট খাবার। সিগারেট খাওয়াটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছে না। জীবিত বাবার সামনে সে কোনদিন সিগারেট খায়নি–আজ মৃত বাবাকে খাটে শুইয়ে রেখে সিগারেট ধরানোটা কি ঠিক হবে?
না, ঠিক হবে না। অন্যায় হবে এবং ভুল হবে। আতাহার বারান্দায় এসে সিগারেট ধরাল। বাবার কাছে সে বড় একটা অপরাধ এক সময় করেছিল। সেই অপরাধের জন্যে সে ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। মৃত মানুষের কাছে কি ক্ষমা প্রার্থনা করা যায়? করা না গেলেও সে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
তার বাবা তাকে দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন নাখালপাড়ায়। তার এক ছাত্রীর কাছে লেখা চিঠি। চিঠি দেবার সময় বিব্রত গলায় বলেছিলেন–ওর হাতেই দিবি। অন্য কারো হাতে না। ছাত্রীর নাম ফরিদা। আতাহার নাখালপাড়া গিয়েছিল–কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিঠিটি তার হাতে দেয়নি। হঠাৎ তার ইচ্ছা হয়েছিল–জানতে, কি এমন লেখা চিঠিতে যা অন্য কারো কাছে দেয়া যাবে না। এটা কি কোন গোপন প্ৰণয়ের ব্যাপার? মানুষের নানান দুর্বলতা থাকে। খাঁটি হীরাতেও ত্রুটি থাকে। চিঠি পড়ে আতাহার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল–চিঠিতে রশীদ সাহেব তার ছাত্রীকে লিখছিলেন–
