বলুক না। কি যায় আসে?
বাড়ি দেখতে দেখতে হঠাৎ হঠাৎ কোন একটা বাড়ির সামনে এসে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে যান। চোখের সামনে স্বপ্নের মত একটা বাড়ি। মনে হয় কেউ একজন তার জন্যেই এই বাড়ি বানিয়ে রেখেছে। গত বৃহস্পতিবার এরকম একটা বাড়ি দেখলেন। টিনের একটা একতলা বাড়ি। সামনে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। চারদিকে ঝোপঝাড়ের মত গাছপালা। বেশ কয়েকটা সুপারিগাছ। বাড়ির উত্তর দিকে একটা চালতা গাছ। কতদিন পরে চালতা গাছ দেখলেন। থোকা থোকা হলুদ ফুল ফুটে আছে। বাড়ির নামটা এই বাড়ির ছাদে ঝমঝম শব্দ হবে। এই শব্দের কি কোন তুলনা হয়? বাড়িটার সামনে থেকে যেতে ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু বাড়ির ভেতর থেকে এক ভদ্রলোক বের হয়ে কর্কশ গলায় বললেন, কি চাই? তিনি লজ্জিত গলায় বললেন, জ্বি না, কিছু চাই না।
কিছু চান না, তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আধাঘণ্টা ধরে বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করছেন–আর বলেন কিছু চাই না। ব্যাপারটা কি?
কিছু না। কিছু না।
ভদ্রলোক আগুনচোখে তাকিয়ে রইলেন আর তিনি প্রায় মাথা নিচু করে চলে এলেন। হঠাৎ তাঁর শরীরটা ক্লান্ত লাগল। মনে হল পা চলছে না। পথেই মুখ থুবড়ে পড়ে।
তাঁর ধারণা তাঁকে ডায়াবেটিসেও ধরেছে। রাতে খুব ঘন ঘন পানির পিপাসা হয়। তিনি শুনেছেন, ডায়াবেটিস রোগের প্রথম লক্ষণ তৃষ্ণায় বুক শুকিয়ে যাওয়া, যা তার বেলায় হচ্ছে। একজন ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার। টেস্ট-ফেস্ট করানো দরকার। টেস্ট করানো মানেই একগাদা টাকা খরচ। টাকা খরচ করতে তাঁর মায়া লাগে। খুব কষ্ট করে উপাৰ্জন করা টাকা। লটারিতে জিতে পাওয়া টাকা না। ইংরেজ্বি গ্রামার, রচনা, কোশ্চেন-আনসার প্রায় নিবোধ একদল ছাত্রীকে পাখি পড়ার মত শিখাতে হয়। শিক্ষাদানের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে তিনি শিক্ষা দিচ্ছেন। মাসের শেষে টাকা নিচ্ছেন। যেন মুদি দোকান দিয়েছেন। জিনিশ বিক্রি করে টাকা নিয়ে নেয়া।
কোন কোন ছাত্রী মাস শেষ হবার পরেও টাকা দেয় না। এক ফাঁকে বলে, সামনের মাসে দেব স্যার। এই মাসে বাবার হাত খালি। তিনি মাথা নাড়েন। সেই মাথা নাড়া অর্থহীন মাথা নাড়া। তার কাছে মনে হয় এই মেয়েটি যেন বাকিতে জিনিশ নিচ্ছে।
এ রকম জীবনযাপনের কোন মানে হয়? প্রায় রাতেই তার ইচ্ছা করে পায়জামাপাঞ্জাবি এবং স্যান্ডেল পায়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়তে। হাঁটতে থাকবেন। হাঁটতেই থাকবেন। মাঝে মাঝে শুধু দিক ঠিক করে নেয়া–দক্ষিণ। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় না। এক সময় সমুদ্রের পাড়ে এসে থেমে যাবেন। তাঁর সাতষট্টি বৎসর বয়স হয়েছে। তিনি সমূদ্র দেখেননি। কেউ বললে বিশ্বাস করবে? করবে না। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। যে কোন একদিন বাথরুমে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবেন। আর ওঠা হবে না। হাঁটতে হাটতে সমুদ্রের পারে এসে মরতে পারলে মন্দ হয় না।
রাত তিনটা বাজে। রশীদ আলি তৃতীয়বারের মত বিছানা ছেড়ে উঠেছেন। কবার তাঁর প্রায় ঘুম এসে গিয়েছিল, গুনগুন শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে। শব্দটা আসছে ফরহাদের ঘর থেকে। গানের মত শব্দ। রাত তিনটায় সে গান গাইবে কেন? এটা কি গান গাওয়ার সময়?
রশীদ আলির মাথার রাগ দপ দপ করছে। বমি-বমি ভাবও হচ্ছে। তিনি স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে বারান্দায় এলেন। বারান্দা থেকে ফরহাদের গুনগুন শব্দ আরো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে গান গাইছে না, পড়ছে।
তিনি ছেলের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিলেন। ফরহাদ দরজা খুলে দিল। রশীদ আলি বললেন, কি করছিস?
ফরহাদ বলল, পড়ছি।
রাত তিনটার সময় কিসের পড়া?
ফরহাদ মাথা চুলকালো। সে বুঝতে পারছে না। তার বাবা এত রেগে যাচ্ছেন কেন? ছেলেমেয়েকে গভীর রাতে পড়তে দেখলে যে কোন বাবা খুশি হন। তার বাবা হচ্ছেন না কেন?
রশীদ আলি থমথমে গলায় বললেন, ফাজলামির একটা সীমা থাকা দরকার। রাত তিনটার সময় বিদ্যাসাগর সেজেছো? জুতাপেটা করে বিদ্যার ভূত নামিয়ে দেবী। যা, ঘুমুতে যা। বাতি নেভা।
ফরহাদ তৎক্ষণাৎ বাতি নিভিয়ে দিল।
একটা টু-শব্দ যেন না শুনি। কোন রকম গুনগুনানি শুনতে চাই না। দরজা বন্ধ করা। ছিটিকিনি লাগা।
ফরহাদ ছিটিকিনি লগোল। তিনি ছিটিকিনির খটখট শব্দ শুনে নিজের ঘরে ফিরে এলেন। তার আবারো পানির তৃষ্ণ হলা। তিনি জগ থেকে ঢেলে পানি খেলেন। তখন বাথরুম পেয়ে গেল। বাথরুম সেরে চোখে-মুখে পানি দিয়ে তিনি আবার ঘুমুতে গেলেন। ঘন ঘন হাই উঠছে। ঘুম হয়ত এসে যাবে। তিনি ঘড়ি দেখলেন। তিনটা এগারো। মাত্র এগারো মিনিট পার হয়েছে অথচ তার কাছে মনে হচ্ছিল এক ঘণ্টার মত পার হয়েছে।
বালিশে মাথা লাগবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঝিমুনির মত এসে গেল। তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন–ব্যাগ গোছাচ্ছেন–ট্রেন ধরতে হবে। ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। অথচ ব্যাগ গোছানো হচ্ছে না। সারা বিছানায় অসংখ্য জিনিস। এবং অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস। পিতলের কলসি আছে, কয়েকটা খালি হরলিক্সের কৌটা একটা ফুটবল পাম্প করার পাম্পার। এইসব হাবিজাবি জিনিস তিনি কেন ব্যাগে ভরছেন বুঝতে পারছেন না। জায়গা হচ্ছে না। ঠাসাঠাসি করে ভরতে হচ্ছে। এর মধ্যে আবারো ট্রেনের হুইসেলের শব্দ। ট্রেনের হুইসেলের শব্দ ছাপিয়ে অন্য রকম শব্দ আসছে। মশার পিন পিন শব্দের মত শব্দ। শব্দটা বাড়ছে। এটা কিসের শব্দ? মশা? না, মশা না। গানের গুনগুনানির মত শব্দ। কে যেন গান গাইছে। তা হলে কি ফরহাদ আবার বই নিয়ে বসেছে? তাকে না। বলে আসা হল সে যেন বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ে? স্বপ্নের মধ্যেই তিনি তাঁর স্ত্রীকে প্রচণ্ড ধমক দিলেন–তুমি ওকে বল ও যেন গুনগুন না করে।
