মজিদকে সে দীর্ঘ একটা চিঠি লিখেছিল। মজিদ তার উত্তরে একটা আর্জেন্ট টেলিগ্রাম করেছে–টেলিগ্রামে লেখা–
I am well.
আমি ভাল আছি।
সেই ভাল থাকাটা কি রকম ভাল থাকা একবার গিয়ে স্বচক্ষে দেখে আসা দরকার। সাজ্জাদকে রাজি করিয়ে কোন এক গভির রাতে মজিদের নেত্রকোনার বাসায় উপস্থিত হতে হবে। মজিদের জন্যে অবশ্যই উপহার হিসেবে গাঁজা নিয়ে যেতে হবে। গাজা— বিষয়ে মজিদের সর্বশ্রেষ্ঠ উক্তি হচ্ছে–সমস্ত জগৎটাই যে ধোঁয়া তা গাজার ধোঁয়া মাথায় না গেলে বোঝা যায় না। জগতের অনিত্যতার ব্যাপারটি পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে জানানোর জন্যে সবাইকে খুব ভালমত একবার গাঁজা খাওয়ানো দরকার।
আতাহার হাঁটছে। বৃষ্টিতে সে পুরোপুরি নেয়ে উঠেছে। সে হাঁটছে নিবিকীর ভঙ্গিতে। তাঁর হাঁটার ভেতর কি কোন অস্বাভাবিকতা আছে? লোকজন কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে। মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ ব্যাপার না। তার জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। সে শুধুমাত্র বৃষ্টিতে ভিজেই এই কাজটি করতে পারছে। জানি দুশমন ছবির পরিচালককে বলতে হবে–ভাই, নায়িকারা বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য নিশ্চয়ই দু-তিনটা থাকবে–নায়কদের বৃষ্টিতে ভিজে হেঁটে যাবার দৃশ্য একটা রেখে দেবেন। তো? দেখবেন আমি কেটে বের হয়ে যাব।
বৃষ্টিতে ভেজা নিয়ে মজিদের একটা অসাধারণ কছিাড়া আছে। কছিাড়া হচ্ছে কবিতা + ছড়া? মজিদের ভাষায় কছিড়া হচ্ছে অর্ধেক কবিতা এবং অর্ধেক ছড়া।
আমার বন্ধুর বিয়ে
উপহার বগলে নিয়ে
আমি আর আতাহার
মৌচাক মোড়ে এসে বাস থেকে নামালাম
দু’ সেকেন্ড থামলাম।
টিপটিপ ঝিপঝিপ
বৃষ্টি কি পড়ছে?
আকাশের অশ্রু ফোটা ফোটা ঝরছে?
আমি আর আতাহার
বলুন কি করি আর?
উপহার বগলে নিয়ে আকাশের অশ্রু
সারা গায়ে মাখলাম।।
হি হি করে হাসলাম।।
রশীদ আলী সাহেব
রশীদ আলী সাহেব অসীম ধৈর্যে বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সকালে নাশতা খেয়ে বের হন, ফিরেন দুপুর দুটা-আড়াইটায়। গোসল করে ভাত খান। ভাত খেয়েই ঘুমুতে যান। তার প্রথম ব্যাচ ছাত্রীরা এসে পড়লে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা হয়। তিন ব্যাচ পড়ানোর ঝামেলা শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে আবার ঘুমুতে যান। ক্লান্তিতে তাঁর শরীর ভেঙে আসে। বিছানায় যাওয়ামাত্রই তাঁর ঘুমিয়ে পড়ার কথা–আশ্চর্যের ব্যাপার, তার ঘুম আসে না। তিনি বিছানায় এপাশ ওপাশ করেন। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে মনে হয়, ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসবে। আবার বিছানায় যাওয়ামাত্র ঘুম চলে যায়। প্রতি রাতেই মনে হয়, কোন একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ঘুমের অষুধ-টষুধ খাবেন। সারাদিনের ব্যস্ততায় মনে থাকে না। ঘুমের অযুধের কথা যখন মনে হয় তখন ডিসপেনসারি বন্ধ।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি সারাদিন কি করলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন তা মনে করার চেষ্টা করেন। এইসব স্মৃতি সুখকর না। অন্য কিছু ভাবলে হয়ত ঘুম আসতো। কোন সুখস্মৃতি নিয়ে চিন্তা করতে পারলে হত। রশীদ আলি সাহেব অনেক চেষ্টা করেও কোন সুখস্মৃতি মাথায় আনতে পারেন না। বার বার মনে হয়, বৃদ্ধ বয়সে তিনি অর্থই পানিতে পড়েছেন। যখন বয়স ছিল–তখন অর্থই পানিতে সাঁতরে ভেসে থাকতেন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জরা তাকে গ্ৰাস করতে শুরু করেছে। অর্থই পানিতে সাতরাবার মত শক্তি তিনি পাচ্ছেন না।
বাড়ি ভাড়া করতে গিয়ে তাকে নানান ধরনের অপমানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই বয়সে মিথ্যা কথাও বলতে হচ্ছে। বাড়িওয়ালা যেই শুনে বাড়ি ভাড়ার জন্যে একজন এসেছে তখনই ভুরু কুঁচকে ফেলে এবং চোখ সরু করে ফেলে। পা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত কয়েকবার তাকায়। যাচাই করতে চেষ্টা করে ভাড়াটে কেমন। প্রাথমিক যাচাইয়ের পর শুরু হয় প্রশ্নপর্ব–
কি করেন। আপনি?
রশীদ আলি বিনীতভাবে বলেন, মাস্টারি করতাম। সম্প্রতি রিটায়ার করেছি। অবসর জীবনযাপন করছি।
বাড়ি ভাড়া কে নেবে?
জ্বি, আমি নেব।
বাড়িওয়ালার মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। তাকে দেখেই বোঝা যায় সে এই মূহূর্তে ভাবছে–রিটায়ার্ড স্কুল-টিচার মাসে চার হাজার টাকা ভাড়া দেবে কি ভাবে? চক্ষুলজ্জার জন্যে প্রশ্নটা করতে পারে না। অনেকে চক্ষুলজ্জার ধার ধারে না। সরাসরি জিজ্ঞেস করে–
রিটায়ার করেছেন, আপনার সোর্স অব ইনকাম কি? বাড়ি ভাড়া দেবেন। কি ভাবে?
আমি এখনো কিছু কাজকর্ম করি। ছাত্র-ছাত্রী পড়াই।
প্রাইভেট টিউশ্যনি।
জ্বি।
ফ্যামিলি মেম্বার কত?
আমার দুই ছেলে, দুই মেয়ে এবং স্ত্রী।
ছেলেমেয়েরা সব আপনার সঙ্গে থাকে?
বড়মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে–বাকি তিনজন আমার সঙ্গে থাকে।
ছেলে দুজন কত বড়?
এইখানে তাঁকে আবার কিছু মিথ্যা বলতে হয়–বড় ছেলে এম. এ. পাশ করে চাকরি খুঁজছে। এটা বলামাত্রই বাড়িওয়ালা না করে দেয়। কাজেই এইখানে এখন তিনি বলেন–ছেলে ব্যবসা করছে।
কি ধরনের ব্যবসা?
আমি ঠিক জানি না।
ছেলেকে একদিন নিয়ে আসুন। তার সঙ্গে কথা বলি।
ছেলেকে আনতে হবে?
জ্বি, নিয়ে আসুন। আপনি বুড়ো মানুষ। আপনার সঙ্গে কি কথা বলব? আপনার ছেলের সঙ্গেই কথা বলি। কাল বিকেলে তাকে নিয়ে আসুন।
রশীদ সাহেব ছেলেকে নিয়ে আসেন না। সামান্য একটা বাড়ি ভাড়ার জন্যে ছেলেমেয়ে সবাইকে এনে কুমীরের বাচ্চার মত দেখাতে হবে? সব বাড়িওয়ালা তাঁকে সন্দেহের চোখে কেন দেখছে তাও তিনি বুঝতে পারেন না। তিনি বুড়ো হয়ে পড়েছেন এই জন্যেই? অক্ষম। অপদাৰ্থ হয়ে গেছেন? বুড়োদের সম্পমান এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখাই নিয়ম। সেই নিয়ম কি পাল্টে গেছে? আজকাল নাপিতের দোকান দেখলেই তার ইচ্ছা করে চুলে কলপ দিতে। সাদা চুলগুলিকে কুচকুচে কালো করে ফেলে সমাজে ফিরে আসার একটা চেষ্টা কি করা যায় না? তাঁর কাল চুল দেখে বাসার সবাই অদ্ভূত চোখে তাকাবে। সালমা বিস্মিত হয়ে বলবে, কি হয়েছে? তোমাকে অন্য রকম লাগছে কেন?
