লৌহবিতানের মালিক আবদুল্লাহ ঠিক আগের ভঙ্গিতে বসে আছেন। হাতে বই। দূর থেকে মনে হচ্ছে লোকনাথ ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা। হোলসেল ব্যবসা যারা করে তারা পঞ্জিকা খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে। আতাহার হাসিমুখে এগিয়ে গেল। আন্তরিক ভঙ্গিতে বলল, চিনতে পেরেছেন?
আবদুল্লাহ হাতের বই নামিয়ে বলল, জ্বি।
আমার নাম কি বলুন তো?
আপনার নাম বলতে পারব না। ঐ দিন আপনি আপনার নাম বলেননি, তবে একজনকে টেলিফোন করছিলেন–তার নাম নীতু।
আপনার স্মৃতিশক্তি অসাধারণ।
আমার স্মৃতিশক্তি অসাধারণ না। আমার স্ত্রীর নাম নীতু, এজন্যেই নীতু নামটা আমার মনে আছে। আপনি বসুন–দাঁড়িয়ে আছেন কেন? চা খাবেন?
জ্বি খাব।
আবদুল্লাহ ঘাড় ঘুরিয়ে চায়ের কথা বলল। আতাহার তার পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। বাড়িয়ে ধরল। আবদুল্লাহ বলল, আমি সিগারেট খাই না।
আতাহার সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, আপনি বলেছিলেন, আবহাওয়ার ব্যাপারে। আপনার সিক্সথ সেন্স খুব প্রবল। আগেরবার যখন এসেছিলাম। আপনি বলেছিলেন রাত দশটায় বৃষ্টি থামবে–ঐ দিন বৃষ্টি হয়েছে রাত দুটা পর্যন্ত।
নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। সম্ভাবনার কথা বলা যায়।
ঐ দিন। কিন্তু আপনি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েই বলেছিলেন।
ভুল করেছিলাম।
আমি আপনার ছাতাটা হারিয়ে ফেলেছি।
পুরানো একটা ছাতা হারালেও কিছু না।
চা নিয়ে বুড়ো এসেছে। আজ বুড়োকে অন্যদিনের চেয়েও কাহিল মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে হাঁটতে পারছে না। চায়ের কাপ নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবে। আতাহার এবং আবদুল্লাহ দুজনই চা শেষ করল। নিঃশব্দে। আবদুল্লাহ বলল, বৃষ্টি থেমে গেছে, আপনি ইচ্ছা করলে চলে যেতে পারেন।
আতাহার বলল, আপনার অসুবিধা না হলে খানিকক্ষণ বসি। গল্প করি।
বসুন। গল্প করুন। কিছু মনে করবেন না–আপনি কি অভিনয় করেন? টিভিতে কখনো নাটক-টাটক করেছেন, কিংবা সিনেমায়?
আতাহার বিস্মিত হয়ে বলল, না তো। অভিনয় এখনো করিনি, তবে সামান্য সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক আমাকে এক ফিল্ম ডাইরেক্টরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডাইরেক্টর সাহেবের নাম মনসুর আলি। উনি একটা ছবি বানাচ্ছেন–ছবির নাম জানি দুশমন। আমার ঐ ছবিতে নায়কের রোল করার ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে।
ক্ষীণ বলছেন কেন?
ক্ষীণ, কারণ যিনি নায়িকার রোল করবেন। তিনি ফিল্ম লাইনের বিখ্যাত এক নায়িকা। তার নাম মৌ। তিনি যদি আমাকে পছন্দ করেন। তবেই আমার নায়ক হবার সুযোগ হবে। তাঁর কাছে আমাকে একটা ইন্টারভ্যু দিতে হবে।
ইন্টারভূটা কবে?
ম্যাডাম মৌ গেছেন নেপালে। ছবির শ্যুটিং হচ্ছে। নেপাল থেকে ফিরলেই উনার সামনে ডাইরেক্টর সাহেব আমাকে নিয়ে যাবেন। আমার প্রধান কাজ হচ্ছে ম্যাডামকে খুশি করা।
ম্যাডাম বলছেন কেন?
ম্যাডাম বলছি, কারণ নায়িকাদের ম্যাডাম ছাড়া অন্য কিছু বললে তঁরা খুব রাগ করেন। এই হল সিনেমা লাইনের নিয়ম।
আবদুল্লাহ হেসে ফেলল। আতাহার মুগ্ধ হয়ে এই হাসি দেখল। কোন পুরুষমানুষ এত সুন্দর করে হাসতে পারে তার জানা ছিল না। এই ক্ষমতা প্রকৃতি অকৃপণ হাতে মেয়েদের দিয়েছে। মেয়েরা কারণ্যে-অকারণে এই ক্ষমতা ব্যবহার করে। মেয়েরা জানে না যে হাসিমুখে পুরুষদের কাছে তারা যদি কিছু চায়–পুরুষদের তা দিতেই হবে। তারা জানে না বলেই–চাইবার সময় চোখের জলে চায়, বা রাগ করে চায়। হাসে না।
আবদুল্লাহ বললেন, আপনি কি দেখছেন?
আপনার হাসি দেখছি। আপনার হাসি যে কত সুন্দর তা কি কেউ আপনাকে কখনো বলেছে?
হ্যাঁ বলেছে। তবে আমি হাসি খুব কম। অনেক দিন পর আপনার কথা শুনে হাসলাম।
আপনার চেহারা কোন অভিনেতার মত কি-না জানি না–কারণ আমি টিভি— সিনেমা দেখি না। আমার স্ত্রী বলছিল।
উনি আমাকে দেখলেন কোথায়?
আমার এই দোকানোই দেখেছে। ও প্রায়ই দোতলা থেকে নিচে নেমে আসে। পার্টিশানের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকে। আপনি যখন প্রথমবার এসেছিলেন তখন সে আপনাকে দেখেছে। আপনি চলে যাবার পরে আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিল।
ও আচ্ছা। আজো কি তিনি দেখে গেছেন?
হ্যাঁ, আপনি যখন চা খাচ্ছিলেন তখন এসে দেখে গেলো। আমাদের বিয়ের গল্পটা খুবই সুন্দর। একদিন আপনাকে বলব।
আজ বলুন। আজ আমার কোন কাজকর্ম নেই।
আজ না। আজ আপনি বৃষ্টির হাত থেকে বীচার জন্যে আমার দোকানে এসেছেন। বৃষ্টি ছাড়া শুকনা খটখাটে কোন দিন। আপনি আসবেন–আমি গল্পটা আপনাকে বলব। মোটামুটি একটা ভৌতিক প্রেমের গল্প।
আতাহার উঠে দাঁড়াল। আবদুল্লাহ বলল, আগে যে কার্ডটা দিয়েছিলাম সেটা নিশ্চয় হারিয়ে ফেলেছেন। আরেকটা রাখুন। আমাকে সব সময় টেলিফোনে পাবেন। আমি কখনো এই দোকান এবং দোকানের উপরের আমার বাড়ির বাইরে যাই না। গত পাঁচ বছরে যাইনি।
পা-নেই মানুষরাও তো বাইরে ঘোরাফিরা করে।
আমি করি না।
আতাহার যখন বের হয়ে এসেছে তখন আবার টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। বৃষ্টিতে নেমেই তার মনে হল, আজো আবদুল্লাহকে সে তার নাম দিয়ে আসেনি। আবদুল্লাহ তার নাম জানে না। সে শুধুই নীতুর নাম জানে।
বৃষ্টি জোরেসোরে নেমেছে। আবার দৌড়ে কোন দোকানঘরে আশ্রয় নিতে ইচ্ছা করছে না। নতুন কারো সঙ্গে পরিচিত হতে ইচ্ছা করছে না। বরং ইচ্ছা করছে বৃষ্টিতে ভিজতে।
আতাহার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এগুচ্ছে—তার মজিদের কথা মনে পড়ছে। ভাল বৃষ্টি নামলেই সে একটা ছাতা জোগাড় করতো। সেই ছাতা বগলে রেখে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এগুত। পরিচিত—অপরিচিত অনেকেই জিজ্ঞেস করত, ছাতা বগলে রেখে বৃষ্টিতে ভিজছেন কেন? মজিদ তার উত্তরে খুবই আন্তরিক ভঙ্গিতে বলতো, এটা আমার রোদের ছাতা, বৃষ্টির ছাতা নয়। মজিদের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না।
