জোছনা একা দেখা যায় না। সঙ্গি লাগে।
সঙ্গিনী পাশে নিয়ে জোছনা দেখতে কেমন লাগে কে জানে। খুব ভাল লাগবে বলে মনে হয় না। মেয়েদের নিজের দিকে নজর খুব বেশি থাকে। প্রকৃতি দেখতে হলে নিজেকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে দেখতে হয়।
ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় সাথী নামের একটা মেয়ের সঙ্গে তার মোটামুটি পরিচয় হয়েছিল। তাকে নিয়ে সে কাশফুল দেখতে গিয়েছিল। সাভারে নদীর পাড় ঘেঁসে লক্ষ লক্ষ কাশফুল ফুটেছিল। সাথী কাশফুল দেখে যত না মুগ্ধ তার চেয়েও বেশি বিরক্ত তার শাড়িতে চোরকাঁটা ফুটছে দেখে। সে ঠোঁট সরু করে ক্রমাগত বলতে লাগলো, এ কোথায় নিয়ে এলে বল তো? চোরকাটা সূঁচের মত পায়ে লাগছে।
আতাহার বলল, চল কাশবনের ভেতর দিয়ে দৌড়াই।
সাথী বলল, কাশীবনের ভেতর দিয়ে শুধু শুধু দৌড়াব কেন?
আতাহার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলল। সাথী অবশ্যি তারপরেও কিছুদিন উৎসাহ বজায় রেখেছিল, তারপর কোন শুভক্ষণে লাল শাড়ি পরে এক ইঞ্জিনীয়ার সাহেবকে বিয়ে করে ফেলল। একদিন বিকেলে বিজয় সরণি ধরে সে সেকেন্ড ক্যাপিটেলের দিকে যাচ্ছে, হঠাৎ শুনে–আতাহার আতাহার! বলে বিবৰ্ণ গলায় কে যেন ডাকছে। আতাহার তাকিয়ে দেখে–সাথী। সাথীর পাশে হাওয়াই শাট গায়ে এক ভদ্রলোক। সাথীর স্বামী। গাড়ি থামিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ফুচকা খাচ্ছেন। নতুন বিবাহিত স্বামীদের বেশ কিছুদিন স্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্যে ফুচকা চটপটি এইসব খেতে হয়। ভদ্রলোকের সেই স্টেজ চলছে।
আতাহার তাদের দিকে হাসিমুখে এগিয়ে গেল। সাথী বলল, এই, তুমি আমার বিয়েতে আসনি কেন? আমি নিজে তোমাকে কার্ড দিয়ে এসেছি, তারপরেও এলে না। এর মানে কি?
মিথ্যুক। আসলে তুমি আসনি হিংসায়।
সাথী স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল, এই শোন, বিয়ের আগে আতাহার আমার প্রেমে হাবুড়ুবু খাচ্ছিল।
ভদ্রলোক উৎসাহিত হবার মত ভঙ্গি করে বললেন, তাই নাকি?
সাথী বলল, হ্যাঁ। তারপর একদিন আমাকে ভজিয়ে ভাজিয়ে সাভারে নিয়ে গেছে কাশফুল দেখাতে।
তারপর?
কাশফুল দেখলাম। তখন সে বলে, এসো দুজনে মিলে কাশীবনের ভেতর দিয়ে দৌড়াই। আমি বললাম, পাগল হয়েছ? আমি কাশীবনের ভেতর দিয়ে শুধু শুধু দীেড়াব কেন? সে বলে কি, সৌন্দর্য দেখার জন্যে।
সাথীর স্বামী হাসতে হাসতে বললেন, সৌন্দৰ্য্য—টোন্দর্য কিছু না। ভদ্রলোকের অন্য পরিকল্পনা ছিল। সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে। ঠিক না আতাহার সাহেব?
আতাহার কিছু বলতে পারল না, সাথী হেসে প্রায় ভেঙে পড়ল। ভদ্রলোক মানিব্যাগ থেকে কার্ড বের করে বললেন–কার্ডটা রাখুন। একদিন এসে আপনার প্রাক্তন বান্ধবীর সংসার দেখে যাবেন।
আতাহার কার্ড রাখল। হাফপ্লেট ফুচকা এবং হাফপ্লেট চটপটি খেল।
ইঞ্জিনীয়ার ঐ ভদ্রলোক কি সাথীকে কখনো জোছনা বা কাশফুল দেখাতে নিয়ে গেছেন? সাথীদের ঠিকানা লেখা কার্ডটা আতাহারের মানিব্যাগের সাইড পকেটে এখনো আছে। তার বাসায় গিয়ে উপস্থিত হলে কেমন হয়? সাথীর স্বামীকে সে বলবে, ভাই, আপনার স্ত্রীকে কি ধার দেবেন? তাকে নিয়ে জোছনা দেখব।
ইলেকট্রিসিটি এখনো আসেনি। শহর এখনো অন্ধকারে ড়ুবে আছে–তবে কিছু ফাজিল দোকানদার নিজস্ব জেনারেটার চালু করে দিয়েছে। চার্জার নামের এক বস্তু চালু হয়েছে–ইলেকট্রিসিটি না থাকলে আপনা আপনি জ্বলে ওঠে।
জেনারেটার এবং চার্জারের আলো সত্বেও দোকানটা মারাত্মক লাগছে। সিদ্ধার্থ ভাল সময়েই গৃহত্যাগ করেছেন। আতাহারের ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে, কবিতার লাইন মাথায় আসছে আসছে করেও আসছে না–
প্রতি পূর্ণিমার মধ্যরাতে একবার আকাশের দিকে তাকাই
গৃহত্যাগি হবার মত জোছনা কি উঠেছে?
বালিকা ভুলানো জোছনা নয়।
যে জোছনায় বালিকার ছাদের রেলিং ধরে ছুটাছুটি করতে করতে বলবে–
ও মাগো, কি সুন্দর চাঁদ।
নব দম্পতির জোছনাও নয়।
যে জোছনা দেখে স্বামী গাঢ় স্বরে স্ত্রীকে বলবেন–
দেখো দেখো নীতু চাদটা তোমার মুখের মতই সুন্দর।
কাজলা দিদির স্যাঁতস্যাতে জোছনা নয়।
যে জোছনা বাসি স্মৃতিপূর্ণ ডাস্টবিন উল্টে দেয় আকাশে।
কবির জোছনা নয়। যে জোছনা দেখে কবি বলবেন–
কি আশ্চর্য রূপার থালার মত চাঁদ।
আমি সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী জোছনার জন্যে বসে আছি।
যে জোছনা দেখা মাত্র গৃহের সমস্ত দরজা খুলে যাবে–
ঘরের ভেতর ঢুকে পড়বে বিস্তৃত প্রান্তর।
প্রান্তরে হাঁটব, হাঁটব আর হাঁটব–
পূর্ণিমার চাঁদ স্থির হয়ে থাকবে মধ্য আকাশে।
চারদিক থেকে বিবিধ কণ্ঠ ডাকবে–আয় আয় আয়।
অল্প কিছুদূর এগুতেই ঝুমঝুষ্টি নেমে গেল। বর্ষাকালে হঠাৎ করে ঝুমঝুষ্টি নামে না। বৃষ্টির বেগ আস্তে আস্তে বাড়ে। হঠাৎ কুমবৃষ্টি নামে ভদ্র মাসে। হুড়মুড় করে খানিকক্ষণ বৃষ্টি হয়–আবার থেমে যায়। আবহাওয়া উল্টে-পাল্টে যাচ্ছে। গ্ৰীন হাউজ এফেক্ট। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্যে লোকজন দৌড়াচ্ছে–আতাহারও দৌড়াচ্ছে। কোন একটা দোকানে ঢুকে পড়তে হবে।
আতাহার দৌড়ে যে দোকানে ঢুকাল তার নাম লৌহবিতান। জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ জুলজুলি চোখে আতাহারকে দেখছে। তার চোখ কঠিন। ভুরু কুঁচকে আছে। আতাহার বলল, কেমন আছেন বুড়ো মিয়া?
বুড়ো জবাব দিল না। আতাহারের মনে পড়ল। এই বুড়োর হাত থেকে সে একটা ছাতা নিয়ে গিয়েছিল। ফেরত দেয়া হয়নি। কোথায় আছে সে ছাতা কে জানে। বর্ষাকালে লোকজন ঘর থেকে ছাতা বের করে মাথা শুকনা রাখার জন্যে নয়, হারানোর জন্যে। মিলির বাহারি ছাতাটা আজ যেমন সে রেখে এসেছে গনি সাহেবের বাড়িতে। এই ছাতা আর ফেরত পাওয়া যাবে না। জরাগ্রস্ত এই বৃদ্ধের ছাতাও ফেরত পাওয়া যাবে না।
