ছোট ভাইয়া আছে।
আর কেউ নাই?
মিলি আফা গেছে। হাসপাতালে।
বড় হাঁদারামটা কোথায়?
বড় ভাইজান আখনো ফিরে নাই।
দরজা থেকে সরে দাঁড়া। ফরহাদকে ডাক।
ফরহাদ ভয়ে ভয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। রশীদ সাহেব থমথমে গলায় বললেন, কি করছিলি?
পড়ছিলাম।
এত পড়িস না। বেশি পড়লে বিদ্যাসাগর হয়ে যাবি।
ফরহাদ অস্বস্তি নিয়ে একবার বাবার দিকে তাকাচ্ছে–আর একবার বসার ঘরের দরজার দিকে তাকাচ্ছে। যেন এক্ষুণি দরজা দিয়ে কেউ ঢুকে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে।
রশীদ সাহেব পুত্রের অস্বস্তি কিছুক্ষণ দেখলেন। তিনি আশা করেছিলেন, তার রাগটা পড়ে যাবে। পড়ল না। কেন পড়ল না। তাতেও তিনি বিস্মিত হলেন। এই বয়সে রাগ মনের উপর চেপে থাকা খুব খারাপ।
ফরহাদ!
জ্বি।
এক্ষুণি একটা রিকশা নিয়ে শংকর চলে যা।
জ্বি আচ্ছা।
সেখানে তুলাপট্টি বলে একটা জায়গা আছে। এক রিকশাওয়ালা সেখানে থাকে। তাকে খুঁজে বের করবি।
জ্বি আচ্ছা।
তাকে দশটা টাকা দিয়ে আসবি।
জ্বি আচ্ছা।
রশীদ সাহেব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন–তাঁর পুত্র (তার ভাষায়, কনিষ্ঠ হাঁদারাম) দরজা দিয়ে বের হয়ে যাবার উপক্রম করছে। যে রিকশাওয়ালাকে তার খুঁজে বের করার কথা তার নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করার সে প্রয়োজন বোধ করেনি। সে যে শংকর যাবে তার ভাড়াও বোধহয় তার কাছে নেই। তিনি একবার ভাবলেন–ছেলেকে ভেকে রিকশাওয়ালার নামটা বলে দেবেন–তারপর মনে হল যা ইচ্ছা করমিক। হাদারামের শিক্ষা হোক। যখন কাউকে না পেয়ে ফিরে আসবে তখন আবার পাঠানো হবে। তাঁতের মাকুর মত ক্রমাগত ঘোরাফিরা করতে থাকবে।
কাজের মেয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, চা খাইবেন চাচাজান? তিনি বললেন, যা সামনে থেকে।
রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। সন্ধ্যা থেকে ইলেকট্রিসিটি ছিল না। কিছুক্ষণ আগে এসেছে। ট্র্যান্সফরমার জুলে গিয়েছিল। ঠিকঠাক করতে এতক্ষণ লাগল। রশীদ সাহেব গোসল করে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছেন। এটি তার চতুর্থ কাপ চা। তিনি চিন্তায় অস্থির হয়েছেন। যদিও অস্থিরতা প্রকাশ করছেন না। ফরহাদ সেই যে গিয়েছে এখনো ফেরেনি। তাঁর মন বলছে ছেলেটা এখনো শুকনো মুখে তুলাপট্টিতে ঘোরাঘুরি করছে। রিকশাওয়ালাকে খুঁজে পাচ্ছে না–পাওয়ার কথাও না। বাসায় ফিরে আসার সাহসও পাচ্ছে না। তার উচিত ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আরো সহজ হওয়া। সবাই তাকে যমের মত ভয় করবে। এটা কোন কাজের কথা না।
এত রাত পর্যন্ত ছেলেটা বাইরে সেটাও একটা দুঃশ্চিন্তার কথা। শহর আগের মত নেই। মুড়ি মুড়কির মত এখন ড্রাগ পাওয়া যাচ্ছে। ডাষ্টবিনের এক অংশ ভর্তি থাকে ফেনসিডিল নামের কফ সিরাপের বোতলে। এককালের ভদ্র শান্ত ছেলেরা এখন ড্রাগের পয়সা জোটানোর জন্যে আধা পাগলের মত রাস্তায় নামে। যে ভাবেই হোক কিছু টাকা জোগাড় করতে হবে। পাকের কোন অন্ধকার কোণে গায়ের সার্ট খুলে গোল হয়ে বসতে হবে। ড্রাগ নেয়ার শুরুতে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসে। গায়ে কাপড় চোপড় থাকলে তখন হাসফাস লাগে।
ফরহাদ এদের খপ্পরে পড়েনিতো? অস্বাভাবিক কিছু না–বরং এদের খপ্পরে পড়াই স্বাভাবিক। বেকুব টাইপের ছেলে–এদের খপ্পরে পড়লে উপায় আছে? টাকা পয়সা না পেয়ে এরাতো মেরেই আধামরা করে ফেলবে।
কাজের মেয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, খালুজান ভাত দিব?
তিনি বললেন, দাও। নিজের অস্থিরতা তিনি বাইরে প্রকাশ করবেন না। স্বাভাবিক কাজ কম করে যাবেন। রাত বারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। বারটার পর যা করার করবেন।
রাত বারোটা বাজল, একটা বাজল, দুটা বাজল। ফরহাদ বা আতাহার দুজনের কেউই ফিরল না।
ফরহাদ শংকর যায়নি। ভয় পেয়ে সে ঘর থেকে টাকা ছাড়া বের হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত সে তার এক বন্ধুর বাড়িতে কাটাল। সন্ধার পর থেকে বাসার কাছেই বনফুল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে বসে আছে। বনফুল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিকের সঙ্গে তার মোটামুটি চেনাজােনা আছে। মেহমান এলে এখান থেকে মিষ্টি নিমকি কেনা হয়। ফরহাদ ক্ষিধেয় অস্থির হয়ে বাকিতে দুটা কালোজাম, এক প্লেট দই এবং দেড়খানা নিমকি খেয়েছে। মিষ্টি তার সহ্য হয়না বলেই এরপর থেকে তার শুধু টক ঢেকুর উঠছে। গা গুলাচ্ছে। বারটার সময় মিষ্টির দোকান বন্ধ হয়ে গেলো। সে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে থাকল। আতাহারের জন্যে অপেক্ষা–আতাহার এলেই এক সঙ্গে বাসায় ফিরবে। দুজন থাকলে একটা ভরসা। তাছাড়া আতাহার বন্ধ দরজা বাইরে থেকে খোলার একটা কৌশল জানে। পেনসিল কাটা ছুড়ি দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে বিশেষ কায়দায় কিছুক্ষণ নাড়াচারা করলেই ছিটকিনি নিচে নেমে আসে।
রাত একটার দিকে ফরহাদ খোঁজ নিয়ে গিয়েছে–সদর দরজা বন্ধ। ভেতরের বাতি নেভানো। অর্থাৎ সবাই ঘুমুচ্ছে।
দরজা ধাক্কাধাব্ধি করে বাবার ঘুম ভাঙ্গানোর দুঃসাহস তার নেই। তারা একমাত্র ভরসা। আতাহার। সে না ফেরা পর্যন্ত তাকে রাস্তায় এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত হাঁটাহাঁটি করতে হবে।
আতাহার রাত দুটার দিকেই বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিল–। কাওরান বাজার থেকে রিকশা বা শেয়ারের টেম্পো নেবে। এ রকম পরিকল্পনা। মোড়ে সব সময় টেম্পো পাওয়া যায়। ঢাকা শহরে টেম্পোগুলি আশীর্বাদের মত। এক টাকায় অনেক দূর যাওয়া যাচ্ছে, দ্রুত যাওয়া যাচ্ছে এবং সীটে বসে যাওয়া যাচ্ছে। কাওরান বাজার মোড় পর্যন্ত আসার আগেই একটা ঘটনা ঘটল। পুরো শহরের ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। শহর অবশ্যি অন্ধকার হল না। বরং চারদিক আচমকা ঝলমল করে উঠল–আকাশে প্রকাণ্ড রূপার থালার মত চাঁদ উঠেছে। আজ আষাঢ়ি পূর্ণিমা। এই আষাঢ় পূর্ণিমায় রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করেছিলেন। এই পূর্ণিমা বিশেষ একটা পূর্ণিমা। যে পূর্ণিমায় গৃহত্যাগ করতে হয়। এই পূর্ণিমায় ঘরে ফিরে যাওয়া যায় না। কাজেই সে রওনা হল মীরপুরের দিকে। বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঢুকে পড়তে হবে। রাত দশটার পর বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেট বন্ধ হয়ে যায়–কোন ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ার কৌশল বের করতে হবে। তাও যদি না করা যায় মুনশি নামের একজন দারোয়ান আছে–তাকে ধরতে পারলেও কাজ হবে।
