এদিকে সমস্যার উপর সমস্যা–তোমার নাতনী ফারজানা আলাদা এক রুমের একটা বাসা ভাড়া নিয়ে ঐ দৈত্যটার সঙ্গে বাস করছে। রাতে আমার ঘুম হয় না মা। গাদা গাদা ঘুমের ট্যাবলেট খাই, তারপরেও সারারাত জেগে বসে থাকি।
তোমার অসুখের কি অবস্থা কিছুই জানি না। শুনেছি, দেশে চিকিৎসার অবস্থা খুব খারাপ। বাবা কেন তোমাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংকক যাচ্ছে না? আমি বাবাকে এই ব্যাপারে খুব কড়া করে একটা চিঠি লিখব।
ইতি
তোমার মনিকা
যে মেয়ে এ জাতীয় চিঠি লিখতে পারে তার মাকে কঠিন কঠিন কথা শোনানো যায়। অসুস্থ হলেও শোনানো যায়।
রশীদ আলি তার স্ত্রীকে কিছু শোনাতে পারলেন না। হাসপাতালে গিয়ে শুনলেন তাকে ডায়ালাইসিসের জন্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দু থেকে তিন ঘণ্টা লাগবে ডায়ালাইসিস শেষ হতো। এতক্ষণ অপেক্ষা করার মত সময় তার হাতে নেই। তিনি মতির মার হাতে মনিকার চিঠি দিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হলেন।
নটা বাজে। কাচা বাজার এখনো জমেনি। তিনি নাপিতের দোকানে চুল কাটাতে ঢুকলেন। সালমা অভিযোগ করছিল চুল বড় হয়েছে।
আসলেই চুল লম্বা হয়েছে। ঘাড়ের কাছে কুটকুট করছে। সালমা মনে না করিয়ে দিলে আরো কিছুদিন এই লম্বা চুল নিয়েই ঘুরতেন। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর মনে করিয়ে দেবার জন্যে একজনকে লাগে।
চুল কাটতে গিয়ে নাপিতের সঙ্গে তার কিছু সমস্যা হল। দোষ নাপিতের না, তার। নাপিত জানতে চাইল–চুলে কলপ দেয়া হবে কি-না। তিনি রাগী গলায় বললেন, কলপ দেয়ার প্রশ্ন উঠছে কেন? আমি বুড়ো হয়েছি–হয়েছি। চুলে কলপ দিয়ে জোয়ান হব কেন?
নাপিত বলল, অনেকেই দেয় এই জন্যে জিজ্ঞাস করলাম।
অনেকেই দেয় বলে আমিও দেব?
না দিলে না দিবেন। চেতেন ক্যান?
শুটকা নাপিতটাকে একটা চড় দিয়ে শুইয়ে ফেলার জন্যে তাঁর হাত নিশপিশ করতে লাগল। এটাও খারাপ লক্ষণ। নাপিত এমন কোন ভয়ংকর কথা বলেনি যে তাকে চড় দিয়ে শুইয়ে ফেলতে হবে। সে সাধারণ একটা কথা জিজ্ঞেস করেছে। সাধারণ কথাতেই রাগে শরীর কাঁপছে কেন?
নাপিতের দোকান থেকে তিনি নিউমার্কেটের কাচাবাজারে গেলেন। সাপ্তাহিক বাজার সারবেন। মাছ গোশত বেশি করে কিনে রাখলে ঝামেলা কমত। কিনতে পারছেন না। ফ্রীজের গ্যাস চলে গেছে। দোকানে পাঠিয়ে দেন গ্যাস ভরে দিতে। তিনদিনের ভেতর দেয়ার কথা–আজ আঠারো দিন হল দিচ্ছে না। আঠারো দিনেও যদি দিতে না পরে তাহলে কেন বলল, তিনদিনে দেবে। ফ্রীজের দোকানের ছেলেটাকে লাথি মেরে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিতে পারলে মনটা শান্ত হত। আজ আর ফ্রীজের দোকানে যাওয়া যাবে না–কাল সকালে একবার যাবেন। ঐ হারামজাদাকে সাপের পা দেখাবেন। হারামজাদা শুওরের বাচ্চা–তিনদিনে ফ্ৰীজ দেয়া তোর বের করছি।
রশীদ সাহেব নিজেই নিজের রাগ দেখে অবাক হলেন। এই বয়সে এতটা রাগ হওয়া ঠিক না। স্ট্রোক হয়ে যাবে। এই বয়সটা শান্ত থাকার বয়স।
নিউমার্কেটে নেমে রিকশা ভাড়া দেয়ার সময় তিনি লক্ষ্য করলেন তার মানিব্যাগ নেই। পথে কোথাও পড়ে গেছে। কিংবা পিক পকেট হয়েছে। মানিক্যাগে টাকা ভালই ছিল। বাজার করবেন বলে তিনটা পাঁচশ টাকার নোট নিয়ে বের হয়েছেন। সঙ্গে আরো কিছু ভাংতি টাকা ছিল। বেশি না–কুড়ি পঁচিশ টাকা হবে। তিনি রিকশাওয়ালাকে শান্ত গলায় ম্যানিব্যাগ চুরির কথা বললেন। রিকশাওয়ালা বিরক্ত মুখে তাকিয়ে রইল।
তুমি আমার সঙ্গে বাসায় চল। ঐখানে টাকা দিয়ে দিব।
বাসা কই?
মগবাজার ওয়ারল্যাস অফিসের পেছনে।
মগবাজারে যমুনা।
না গেলে ভাড়া দিব কি ভাবে?
হেইডা আপনের বিষয়।
যা ভাড়া হয় তার থেকে দুটা টাকা বেশি দিব।
ঐ হানে রাস্তাত গ্যাঞ্জাম, যমুনা।
আমি তো তাহলে ভাড়াটা দিতে পারছি না।
যান, ভাড়া লাগব না।
রিকশাওয়ালা আবার হাই তুলল। তার গা ঘামে ভেজা। প্রায় দুমাইল রাস্তা সে রশীদ সাহেবকে টেনে এনেছে। ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়েছে বলেই বোধ হয় ঘন ঘন হাই তুলছে। রশীদ সাহেবের মনে হল সে যে গ্যাঞ্জামের কারণে মগবাজার যেতে চাচ্ছে না–তা না, তার আসলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম দরকার। সে রিকশার সিটে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করবে, তারপর যাবে।
রশীদ সাহেব দেখলেন। তিনি যা ভেবেছেন তাই হয়েছে। রিকশাওয়ালা সীটে উঠে বসেছে। রিকশাওয়ালারা রিকশার সীটে যাত্রীদের মত বসে না। এবং বসেই দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে।
রশীদ সাহেব বললেন, তোমার ঠিকানা কি, থাক কোথায়?
শংকর।
শংকরে কোন জায়গায় থাক? আমি তোমার ভাড়া পাঠিয়ে দেব।
তুলা পট্টির পিছে।
তুলা পট্টিটা কোথায়?
জানি না।
নাম কি তোমার?
বছির।
বছির, আমি তোমাকে ভাড়া পাঠিয়ে দেব। আজকালের মধ্যেই পাঠাব।
বছির জবাব না দিয়ে বিড়ি ধরাল। তাকে বিড়ি টানতে দেখে রশীদ সাহেবেরও সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করল। সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। মানিব্যাগের সঙ্গে সিগারেটের প্যাকেট এবং দেয়াশলাই পিক পকেট হয়েছে। রশীদ সাহেব নিউমার্কেট থেকে হেঁটে মগবাজারের দিকে রওনা হলেন। একটা রিকশা নিয়ে নিতে পারতেন। তার ইচ্ছা করছে না। সারা পথ তিনি মনে করতে করতে হাঁটলেন–
বছির
তুলাপট্টি
শংকর
বছির
তুলাপট্টি
শংকর।।
দরজা খুলে দিল কাজের মেয়ে। এই মেয়েটাকে নতুন রাখা হয়েছে। সে কোন কাজই করতে পারে না। দরজা খুলে সে দরজা ধরেই দাঁড়িয়ে আছে। দরজা থেকে না সরলে মানুষ ঢুকবে কি ভাবে? তিনি নীতিগতভাবে কাজের লোকদের সঙ্গে হৈ চৈ চিৎকার করেন না। নিজের মেধা বা বুদ্ধি খাটিয়ে এরা কিছু করে না, কাজেই এদের উপর রাগ করা অর্থহীন। তবু তিনি রাগ সামলাতে পারছেন না। তাঁর ইচ্ছা করছে কঠিন একটা ধমক দিয়ে মেয়েটার পিলে চমকে দেন। তিনি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ঘরে কে আছে?
