এখন কি সে রাজি?
তাই তো মনে হয়। একটা ছেলে পাওয়া গেছে। আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। ছেলে ভাল, সারাজীবন ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়েছে। দরিদ্র ফ্যামিলির ছেলে, টাকা পয়সার লোভে রাজি হয়েছে বলে আমার ধরাণ–নীতু দেখতে তো আবার তেমন ইয়ে না। আমার মত হয়েছে। ওর মার মত হলে কোন চিন্তা ছিল না। নীতুর মার চেহারা পেয়েছে সাজ্জাদ।
রিসিভার ধরে রাখতে রাখতে আতাহারের হাত ব্যথা করছে। এ কি যন্ত্রণার মধ্যে পড়া গেল–টেলিফোনের এই দীর্ঘ কথাবার্তা মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে চলবে। শেষ বিচারের আগে ইস্রাফিল যখন শিঙ্গা ফুকবে তখনই শুধু হোসেন সাহেব বলবেন, আতাহার, একটু ধর তো কে যেন বিকট শব্দে বাঁশি বাজাচ্ছে–ব্যাপারটা কি দেখে আসি।
মানুষের নানা রকম পরিচয়
একজন মানুষের নানা রকম পরিচয় থাকে।
রশীদ আলি সাহেবের ব্যাপারে এটা খুবই সত্যি। ঘরে তিনি এক মানুষ, বাইরে সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। অতি ভদ্র, অতি বিনয়ী। কেউ তাকে উঁচু গলায় একটা কথা বলতেও শুনেনি। একবার ফার্মগেটের সামনে এক রিকশাওয়ালা তার পয়ে রিকশার চাকা তুলে দিল। তিনি প্রচণ্ড ব্যথায় রাস্তার উপরই বসে পড়লেন। রিকশাওয়ালকে কিছু বললেন না, শুধু আহত চোখে একবার তাকালেন। চাচামিয়া কি হয়েছে, কি হয়েছে বলে তার চারপাশে লোক জমে গেল। তিনি বহু কষ্টে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন,
সেই রশীদ আলিকে আজ তার বাড়িওয়ালা কাটা কাটা কিছু কথা শুনিয়ে দিল। তিনি মাথা নিচু করে শুনে গেলেন। তিনি রাগ করছেন বা মনে কষ্ট পাচ্ছেন এটা তার চেহারা দেখে কিছু বোঝা গেল না। আলাপ-আলোচনার শেষ পর্যায়ে রশীদ আলি হাসিমুখে বললেন, ভাই সাহেব, আজ তাহলে উঠি।
রশীদ আলির বাড়িওয়ালা মুসলেম উদ্দিনের নানান রকম ব্যবসা। তার মধ্যে প্রধান ব্যবসা ঘুপসি ধরনের ফ্ল্যাট বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দেয়া। ভাড়া তুলনামূলকভাবে সস্তা। তবে মাসের পাঁচ তারিখের ভিতর ভাড়া দিতে হয়। দুই তারিখে একবার ভাড়াটেদের কাছে ম্যানেজার যায়— আরেকবার যায় পাঁচ তারিখে। যারা ভাড়া দিতে পারে না তাদের অতি অবশ্যই উঠে যেতে হয় তার পরের মাসে। ভাড়াতে ওঠানো মুসলেম উদ্দিনের কাছে কোন ব্যাপারই না। তাঁর পোষা কিছু পাড়ার ছেলে আছে। প্রতি মাসে তিনি এদের সামান্য খরচ দেন। কাজ থাকুক না থাকুক, এই খরচ তারা দীর্ঘদন ধরেই পাচ্ছে। ভবিষ্যতেও পাবে।
রশীদ আলি সাহেবের বিলিডংয়েই বাড়িওয়ালা থাকেন। তিনতলার দুটা ফ্ল্যাটে তার সংসার ছড়ানো। সকাল বেলা তিনি ম্যানেজার পাঠিয়ে রশীদ আলিকে ডেকে পাঠালেন। প্রাথমিক কথাবার্তা লোকে ভদ্রভাবে বলে থাকে। তিনি ভদ্রতার ধরা দিয়েও গেলেন না। হুংকার দিয়ে বললেন,–আপনার ব্যাপারটা কি বলুন তো?
রশীদ আলি বললেন, আপনার কথা বুঝতে পারছি না।
বাড়ির ভেতর স্কুল খুলে বসেছেন। দফায় দফায় মেয়েরা আসছে, যাচ্ছে। যা বলে কটেজ ইন্ডস্ট্রি।
কয়েকটা মেয়েকে প্রাইভেট পড়াই–এ তো নতুন না। অনেক দিন থেকেই পড়াচ্ছি।
অনেকদিন ধরে সহ্য করেছি। আপনাকে কিছু বলিনি। আজ বললাম। এইসব চলবে না।
রশীদ আলি বললেন, অসুবিধাটা কি?
অনেক অসুবিধা। এটা রেসিডেনশিয়াল এলাকা, এটা মেয়েদের স্কুল না। শিক্ষা নিয়ে আপনি ব্যবসা শুরু করেছেন–খুব ভাল কথা, ব্যবসা করবেন। সবাই করছে, আপনি করবেন না কেন? তবে আমার এখানে না। আমি নিবিরোধী লোক, আমি নিরিবিলি পছন্দ করি। মেয়েদের চা-চুম্ব আমার পছন্দ না।
রশীদ আলি বললেন, জ্বি আচ্ছা।
এই মাসটা আপনি থাকেন, সামনের মাসে আপনি আমার বাড়ি ছেড়ে দেবেন। আমি ঠিক করেছি। এখানকার এই ফ্ল্যাট আমি ভাড়া দেব না। নিজে থাকব।
রশীদ আলি বললেন, জ্বি আচ্ছা। ভাই সাহেব, আজ তাহলে উঠি?
রশীদ আলি শান্ত মুখে নিজের ফ্ল্যাটে এলেন। ততক্ষণে পত্রিকা এসে গেছে। তিনি পত্রিকা নিয়ে বাথরুমে ঢুকলেন। আজ শুক্রবার, মেয়েরা কেউ পড়তে আসবে না। ঢ়িলাঢ়ালাভাবে দিন শুরু করা যায়। কিন্তু তিনি আজ তা পারবেন না। আজই বরং তাঁর কাজের চাপ অনেক বেশি। স্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে যেতে হবে, বাজার করতে হবে, ভাড়ার জন্যে নতুন বাড়ি দেখতে হবে। মোসলেম উদ্দিন সাহেবের এই ফ্ল্যাট বাড়িটা তাঁর পছন্দ ছিল। একতলায় থাকেন বলে বাড়তি অনেকখানি জায়গা পেয়েছেন। সমস্যা একটাই–প্রবল বর্ষণের সময় পানি উঠে। তিনি ঠিক করে রেখেছিলেন এবারের বর্ষা শুরুর আগে আগে বাড়ি বদল করবেন। ভেতর থেকে তেমন তাগিদ বোধ করছিলেন না। বাড়িওয়ালার কথার পর সেই তাগিদটা বোধ করছেন। বাড়ি খোজার জন্যে ছুটির দিন খুবই ভাল।
স্ত্রীকে দেখার জন্যে আজ হাসপাতালে না গেলেও হয়, তবে আজ তিনি যাবেন। মনিকার চিঠি এসেছে। সেই চিঠি তিনি সামনে থেকে তার স্ত্রীকে পড়াবেন এবং কিছু কঠিন কথা শোনাবেন। কঠিন কথাগুলি মনিকাকে শোনাতে পারলে আরাম হত। সেটা সম্ভব না বলেই মেয়ের মাকে শোনানো! মেয়েদের অপরাধের দায়ভাগ অনেকাংশে মেয়ের মাদের বহন করতে হয়। ছেলেদের অপরাধের দায়-দায়িত্ব বাবারা কিছুটা বহন করেন। মেয়েদেরটা না।
মনিকা তার মাকে লিখেছে–
মা,
আমার সশ্রদ্ধ সালাম নিবেন। আশা করি সবাইকে নিয়ে ভাল আছেন। গত সোমবার বাবার একটা চিঠি পেয়েছি। বাবা চিঠিতে লিখেছেন তিনি আমাদের ফ্ল্যাট বিক্রি করে সেই টাকা আপনাদের জামাইয়ের একাউন্টে গুরুমা করেছেন। সতেরো লক্ষ টাকা জমা হয়েছে। এই মর্মে ব্যাংকের জমার রশিদ বইয়ের ফটোকপিও পাঠিয়েছেন। যাই হোক, মা এখন একটা কথা–রিয়েল এস্টেটের দাম ঢাকায় হু হু করে বাড়ছে। আমাদের বেলায় কমে গেল কেন? আপনার জামাইয়ের এক বন্ধু কুড়ি লাখ টাকায় এপার্টমেন্ট কিনে এক বছর পর ২ত লাখ টাকায় বিক্রি করেছে। আমরা আঠারো লাখ টাকায়ায় কিনো সতেরো লাখে বিক্রি করলাম। মা, এর মানে কি? আপনার জামাই সন্দেহপ্রবণ মানুষ। সে নানান কথা বলাবলি করছে। আমি তার সব কথা উড়িয়েও দিতে পারছি না। আমি খুবই মনোকষ্টে আছি। মা, তুমি বাবাকে বলবে, কেন কম দামে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে হল তা যেন বাবা চিঠি লিখে বিস্তারিত জানান। যার কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি হল তার ঠিকানা এবং টেলিফোন নাম্বার আপনার জামাই গোপনে জোগাড় করার চেষ্টা করছে। তার এক চাচাতো ভাই থাকে নারায়ণগঞ্জে। তাকে সে বলেছে যেন সে গোপনে খোঁজ নিয়ে বের করে আসলে ভদ্রলোক বাবাকে ঠিক কত টাকা দিয়েছে। মা, চিন্তা কর কি লজ্জার কথা। আমি খুবই শংকিত, যদি শেষ পর্যন্ত জানা যায় যে ভদ্রলোক আসলে ১৭ লাখের বেশি টাকা দিয়েছেন। যদি এ রকম কিছু হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। যেন আপনাদের জামাই আসল খবর না জানে। এইসব খবর লিখতেও আমার লজ্জা লাগছে। না লিখেও পারছি না।
