এ রকম বৃষ্টি দেখতে হলে হয় বৃষ্টিতে ভিজতে হয় কিংবা নিজের ঘরের বিছানায় কাথামুড়ি দিয়ে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। মাঝামাঝি কোন পথ নেই। আতাহার তার বাসার খুব কাছাকাছি আছে! হেঁটে যেতে পাঁচ মিনিট লাগবে। বৃষ্টিতে হেটে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। তাকে যেতে হবে দৌড়ে–দুমিনিটের বেশি লাগবে না। কেন জানি যেতে ইচ্ছা করছে না। সে মমতা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বসে আছে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে একগাদা মানুষ। এরা বৃষ্টি দেখে দোকানে আশ্ৰয় নিয়েছে। তারা বৃষ্টি দেখছে ভয়াবহ বিতৃষ্ণা নিয়ে।
আতাহার, মমতা জেনারেল স্টোরের মালিকের ভাগ্নেকে বলল (সে এই স্টোরের ক্যাশিয়ার। আতাহারের সঙ্গে তার ভাল খাতির আছে। শুধু যখন আতাহার টেলিফোন করতে চায় তখন তার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে যায়), মোবারক, একটা টেলিফোন করব।
মোবারক বিরক্ত মুখে টেলিফোন সেট বের করল। টেলিফোনের তালা খোলার চাবি বের করল।
আতাহার ঢাকা শহরে মাত্র একজনের টেলিফোন নাম্বারই জানে, সাজ্জাদের নাম্বার। এই নাম্পবারে আতাহার পারতপক্ষে টেলিফোন করে না। কারণ টেলিফোনটা হোসেন সাহেবের ঘরে। রিং বাজামাত্রই তিনি টেলিফোন ধরেন এবং অতি মধুর গলায় বলেন, হ্যালো। কে কথা বলছেন? কথা যিনিই বলুন তিনি পীয়তাল্লিশ মিনিটের আগে টেলিফোন ছাড়েন না। আতাহার এখন আর রিস্ক নেয় না। হোসেন সাহেবের গলা শোনামাত্র খািট করে রিসিভার নামিয়ে রাখে। আজও সে ধরেই নিয়েছিল হোসেন সাহেব টেলিফোন ধরবেন। তাকে বিস্মিত করে দিয়ে টেলিফোন ধরল। নীত্। আতাহার খুশি খুশি গলায় বলল, তোদের ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে নাকি রে নীতু?
নীতু বলল, হচ্ছে।
এ রকম শুকনো গলায় হচ্ছে বললি কেন? তোর গলা শুনে মনে হচ্ছে বৃষ্টি হওয়াটা খুব খারাপ। গলায় আনন্দ নেই কেন?
আমি তো আর ব্যাঙ না যে বৃষ্টি হলেই আনন্দে লাফাব।
গলার স্বরটা তো ব্যাঙের মতই লাগছে! সর্দি বাঁধিয়েছিস?
নীতু কঠিন গলায় বলল, আপনি কি ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলবেন?
হ্যাঁ।
ধরে থাকুন, ভাইয়াকে দিচ্ছি।
এ রকম বৃষ্টিতে সে ঘরে বসে আছে? বৃষ্টিতে ভিজছে না? আশ্চর্য তো। আপনি ধরে থাকুন।
তুই যা, খবর দে। আমি ধরে আছি। আমার কোন কাজকর্ম নেই। প্রয়োজনে আমি অনন্তকাল টেলিফোন ধরে বসে থাকতে পারি।
আতাহারকে বেশিক্ষণ বসে থাকতে হল না। সাজ্জাদ এসে টেলিফোন ধরে বিরক্ত গলায় বলল, তোকে কতবার বলেছি কখনো আমাকে টেলিফোন করবি না। টেলিফোনে কথা বলতে আমার ভাল লাগে না। চট করে বল কি ব্যাপার?
কণার ঠিকানা জোগাড় করেছি। এই শুক্রবারের পরের শুক্রবার তাকে চিড়িয়াখানা দেখাতে নিয়ে যাব।
আর কিছু বলবি?
সুবর্ণ বের হয়েছে।
তোর কবিতা ছাপা হয়নি?
না।
গু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। গু-চিকিৎসা ছাড়া কাজ হবে না। মেথরূপটিতে গিয়ে আমি ব্যবস্থা করব। তুই কি আর কিছু বলবি?
না।
কণা মেয়েটিকে কেমন দেখলি?
চমৎকার। বুঝতে পারছি না কি জন্যে চমৎকার লাগল। পান খেয়ে রাস্তায় পিক ফেলছিল–এই দৃশ্য দেখে হঠাৎ মনে হল মেয়েটা চমৎকার।
তুই ঠিকই ধরেছিস। মেয়েটার মধ্যে সহজ একটা ব্যাপার আছে। জলের মত সহজ। এ হল সহজিয়া নারীগোত্রের একজন। সচরাচর দেখা যায় না বলেই তোর ভাল লাগছে। যাই হোক, আমি এখন আর কথা বলব না। ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজব। নে, তুই বাবার সঙ্গে কথা বল। বাবা তোর সঙ্গে কথা বলার জন্যে পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
আতাহার টেলিফোন রিসিভার হাতে নিয়ে আতংকে প্রায় জমে গেল। মনে হচ্ছে এই মুহুতে তার ছোটখাট কোন স্ট্রোকের মত হচ্ছে।
কে, আতাহার?
জ্বি, চাচা?
তুমি কেমন আছ?
জ্বি, ভাল আছি।
অনেক দিন তোমাকে দেখি না।
পরশু দিনই আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছে। দুই ঘণ্টার মত কথা হল। খুনের মামলা নিয়ে কথা বলছিলেন।
ও হ্যাঁ, জামশেদ ভার্সাস স্টেট। অসাধারণ একটা মামলা। আইনের ইতিহাসে স্বণাক্ষরে লেখা থাকবে।
জ্বি জ্বি।
আতাহার, তুমি কি আগামীকাল কিংবা পরশু একটু আসতে পারবে?
কেন বলুন তো চাচা?
সজ্জিাদ এত বড় একটা চাকরি পেয়েছে সেলিব্রেট করবো বলে ভাবছি। কোন একটা ভাল হোটেলে গিয়ে সামান্য খাওয়া-দাওয়া
সজিদ চাকরি পেয়েছে নাকি?
তুমি জান না?
জ্বি না।
তুমি হচ্ছে তার বেস্ট ফ্রেন্ড, আর তুমি জান না? আশ্চর্য! আবশ্যি আশ্চর্য হবার কিছু নেই। ওর স্বভাবটি এই রকম। আমিই কিছু জানতাম না। বিদ্যুৎ এবং জ্বালানীমন্ত্রী টেলিফোন করায় জানলাম। সাজ্জাদ অবশ্যি একমাস আগেই এপিয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছে। চাকরিতে জয়েনও করেনি, আমাকেও কিছু জানায়নি।
এখন কি চাকরিতে জয়েন করবে?
করবে তো বটেই। না করে পথ কি? কিছু একটা করে তো খেতে হবে। বৃষ্টিতে ভিজা আর জোছনা গায়ে মেখে বেড়ালে তো হবে না–তাই না?
জ্বি, তা তো বটেই।
সাজ্জাদ-নীতু দুজনের ব্যবস্থা করে ফেলতে পারলে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি। শরীরের অবস্থা তো ভাল না। হাটের উপর দিয়ে একটা ঝড় গিয়েছে। দ্বিতীয়বার সামলাতে পারব বলে মনে হয় না। ঠিক বলছি না?
জ্বি।
সাজ্জাদের তো একটা গতি হল। বাকি আছে নীতু। ওর বিয়ের কথাবার্তা চালাচ্ছি।
বাচ্চা মেয়ে, এখনি কিসের বিয়ে?
বাচ্চা কোথায়? এই ডিসেম্বরে কুড়ি হবে। নীতুর মাকে আমি যখন বিয়ে করি তখন নীতুর মার বয়স ছিল বিলো সেভেনটিন।
দিন বদলাচ্ছে।
এই তো আতাহার তুমি ভুল বললে। দিন ঠিকই আছে, মানুষ বদলাচ্ছে। সেই বদলানোটা কি ঠিক তা বিচারের সময় এসে গেছে। নীতু কিছুতেই বিয়েতে রাজি না–এইসব যুক্তি দিয়ে তাকে বুঝিয়েছি।
