আতাহার হকচকিয়ে গেল। কারণ, কেন সে তুমি বলা শুরু করেছে সে নিজেও জানে না। কণা হাসছে। আতাহারের হকচকানোয় মনে হয় সে খুব মজা পাচ্ছে। কণা আবারো রাস্তায় পিচ করে পিক ফেলল। অতহারের মনে হল, মেয়েদের পান খেয়ে রাস্তায় পিক ফেলার দৃশ্যটাও তো সুন্দর। খুব সুন্দর। আমরা কখনো তুচ্ছ ব্যাপারগুলি লক্ষ্য করি না। বিভূতিভূষণ কিংবা মাণিকবাবু কি তাদের কোন গ্রন্থে লিখে গেছেন, জগতের সুন্দরতম দৃশ্যের একটি হচ্ছে রাস্তায় মেয়েদের পানের পিক ফেলা?
কণা, আমি যাই?
কই যাইবেন?
যাবার অনেক জায়গা আছে। কোন এক জায়গায় চলে যাব।
আতাহার বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগুচ্ছে। তার পেছনে পেছনে আসছে কণা। সে মনে হচ্ছে তাকে বাস পর্যন্ত এগিয়ে দেবে। বাস না, শেষ পর্যন্ত আতাহার একটা রিকশা নিল। দিনটা মেঘলা। মেঘলা দিনে ভালবাসার বাস বের হয়। কাজেই বাসের গাদাগাদি ভিড়ে এবং মানুষের গায়ের বিষাক্ত ঘামের গন্ধে দিনটা নষ্ট করা ঠিক না। রিকশাওয়ালা বলল, কই যাইবেন? আতাহার বলল, চল না দেখি। রিকশা চলছে–কণা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। মেঘলা দিনের রিকশাযাত্রায় কণার মত একটি মেয়ে পাশে থাকলে কেমন হত? দুজনে মিলে আকাশ দেখতে দেখতে যাওয়া যেত। এখন পর্যন্ত আতাহার কোন তরুণীকে পাশে বসিয়ে আকাশ দেখেনি।
ময়না ভাই আতাহারকে দেখে গম্ভীর গলায় বললেন, তোকে বলেছিলাম না। আঠারো তারিখ টকা নিয়ে আসতে? এসেছিলি?
না।
না কেন?
সামান্য দুই লাখ টাকা জোগাড় হল না?
দুই লাখ টাকা সামান্য না। আমার কাছে না।
টাকা জোগাড় করতে পারবি না। আগে বললি না কেন?
আগে ভেবেছিলাম পারব। বড় আপার ফ্ল্যাট বিক্রি হবে, সেখান থেকে ধার নেব। ফ্ল্যাট এখনো বিক্রি হয়নি।
তোর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এমন কেউ ছিল না যে টাকাটা ধার হিসেবে দিতে পারে?
কিন্তু কি?
সাজ্জাদ দিতে পারত…কিন্তু…
কিন্তু কি?
আতাহার হাসল। ময়না ভাই রাগী গলায় বললেন, হাসবি না। খবদার, হাসবি না। তোর হাসি দেখে আমার মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে। তোকে আমি স্নেহ করি। আমি তোর একটা উপকার করতে চেয়েছিলাম। টাকা জোগাড় হচ্ছিল না–আমাকে তো এসে বলবি। একটা কিছু ব্যবস্থা করতাম।
জাপানের ভিসা কি হয়েছে?
অবশ্যই হয়েছে। ময়না মিয়া কাচা কাজ করে না। সাতটা ছেলের গতি করে দিয়েছি, শুধু তোর কিছু করতে পারলাম না। আফসোস! বড়ই আফসোস! চা—নাশতা কিছু খাবি?
পানি খাব।
পানি তো খাবি। তুই কপাল করে এসেছিস পানি খাবার। আমি খুব কম মানুষকে স্নেহ করি। তুই সেই কম মানুষগুলির একজন। সিনসিয়ারলি তোর একটা উপকার করতে চেয়েছিলাম…।
ময়না ভাই বিরক্ত মুখে সিগারেট ধরলেন। আতাহার পানির জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। ময়না ভাই নিউ মুভিজ অফিসের ম্যানেজারের ঘরে বসে আছেন। বসার ভঙ্গি অ্যাগের মত। টেবিলের উপর পা তোলা। তার প্যায়ে লাল মোজা। মোজা এক জায়গায় ছেড়া। সেই ছেড়া দিয়ে তার পায়ের বুড়ো আঙুল বের হেয়ে আছে। ময়না ভাই সেই আঙুল আবার একটু পর পর নাড়াচ্ছেন।
আতাহার?
জ্বি।
ছবিতে অভিনয় করবি?
ছবিতে অভিনয়?
হ্যাঁ। করলে বল, ব্যবস্থা করে দেই। তোর চেহারা সুন্দর আছে। চোখের এক্সপ্রেশনও ভাল। শুধু দাড়ি-টারি চেছে ফেলতে হবে। ডাইরেক্টর মনসুর আলি আমার বন্ধু মানুষ। নতুন নায়ক খুঁজছে। তুই চাইলে তোকে ওর কাছে নিয়ে যেতে পারি। ফার্স্ট ছবি হিট করলে–ধাই ধাই করে উঠে যাবি। নায়িকাদের কোলে হাত রেখে এসি দেয়া ঠাণ্ডা গাড়িতে ঘুরতে পারবি।
ছবির নাম কি?
ছবির নাম দিয়ে তোর দরকার কি? কমাশিয়াল ছবির নাম-কাহিনীতে কিছুই যায় আসে না। তোর ইচ্ছা আছে কিনা বল। আমি মনসুর আলিকে বললে ও আমার কথা ফেলবে না। ওর লেজ আমার কাছে বাধা। ভেবে দেখা করবি কিনা।
করব।
গুড। জীবন সম্পর্কে তোর তাহলে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি আছে। অধিকাংশ সময় তোর বয়েসী যুবকরা হতাশায় ড়ুবে যায়। ফেনসিভিল খাওয়া শুরু করে। তোর এইসব অভ্যাস নেই তো?
না।
একসেলেন্ট। যে দেশের তরুণ সমাজ কফ, সিরাপ খেয়ে নেশা করে সেই দেশের ভবিষ্যৎ কি? ভবিষ্যৎ হচ্ছে–খ্যক খ্যক করে কাশা। বুঝলি, তোদের সোনার বাংলার ভবিষ্যৎ হচ্ছে খ্যক খ্যক করে কাশা।
পিওন পানি এনেছে। অফিসে মনে হচ্ছে পানি খাওয়ার গ্রাস নেই। চায়ের কাপে করে পানি এনেছে। এক কাপ পানি খেয়ে আতাহারের তৃষ্ণা বেড়ে গেল। দ্বিতীয় কাপ পানির জন্যে বলতে ইচ্ছা করছে না। পিওনের হাবভাব ভাল না। সে তাকাচ্ছে কঠিন দৃষ্টিতে।
ময়না ভাই চেয়ার থেকে পা নামিয়েছেন। পকেট থেকে নোটবই বের করেছেন। নোটবই ভর্তি দুনিয়ার মানুষের টেলিফোন। মনসুর আলির টেলিফোন নাম্বার বের করতে সময় লাগল। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, ম্যানেজার, দেখি মনসুরকে টেলিফোনে ধর। প্রথমে এই নাস্বারটা ট্রাই কর। এখানে না পেলে পোজার লাগাও। তিনি আতাহারের দিকে, তাকিয়ে বললেন, তোর কাজ নেই তো? বোস আরাম করে। যা করার আজকের মধ্যেই করতে হবে। কাল সারাদিন ব্যস্ত থাকব। পরশু যাচ্ছি জাপান।
আতাহার ধৈর্য ধরে বসে রইল। ময়না ভাই অনেক চেষ্টা করে ও মনসুর আলিকে ধরতে পারলেন না।
বর্ষা মনে হয় এ বছর আগে আগে চলে এসেছে। দুপুর থেকে ঝুম বৃষ্টি। এ রকম বৃষ্টিকেই ইংরেজিতে হয়ত বলে ক্যাটস এন্ড ডগস। তবে আজ বৃষ্টি যা নেমেছে তাকে ক্যাটস এন্ড ডগস বলা ঠিক হবে না। একে বলা উচিত হস এন্ড এলিফেন্ট।
