কাক বলে কা কা
চার পাশ খা খা।
শিয়ালযাত্রা শুভ। ঢাকা শহরে শিয়াল কোথায় পাওয়া যাবে? গ্রামেই শিয়াল নেই আর ঢাকা শহরে শিয়াল।
শিয়াল বলে হুক্কাহুয়া
তার কাছে জগৎ ভুয়া।
আজ হচ্ছেটা কি? ব্যর্থ কবি ছড়াকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। মাথার ভেতর একের পর এক ছড়া তৈরি হচ্ছে। আতাহার রিকশা নিয়ে নিল। সে যাবে মূগদাপাড়া। কণার ঠিকানা শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। সে থাকে মুগদাপাড়ায় আটার কলের পশ্চিম পাশে। ইউনানী দাওয়াখানার দোতলায়। নম্বর-টম্বর কিছু নেই। খুঁজে বের করতে জীবন বের হয় যাবে। জীবন বের হলে বের হবে। ব্যর্থ কবির জীবন এমন কিছু মূল্যবান নয়।
কণাকে চিড়িয়াখানা দেখানোর জন্যে সময়টা ভাল না। প্যাঁচপ্যাঁচে বর্ষ। এখন বৃষ্টি হচ্ছে না, তবে যে কোন সময় বৃষ্টি নামবে। আকাশ ঘন কালো হয়ে আছে। বর্ষায় পশুপাখি দেখতে ভাল লাগার নয়। বর্ষায় দেখতে হয় গাছপালা–। বৃষ্টি নামলে এদের যাবার উপায় নেই–এদের নিজ নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে ভিজতে হবে। পশুপাখি চেষ্টা করবে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচবার। সম্পূর্ণ দুরকম ব্যাপার।
অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর যে মেয়েটি দরজা খুলে দিল, মনে হচ্ছে সেই কণা। কালো রোগা একটা মেয়ে, চোখ দুটি বিষন্ন। চোখ বিষন্ন নাও হতে পারে। ব্যাপারটা হয়ত তার কল্পনা। মেয়েটি এলোমেলো ভঙ্গিতে হালকা নীল একটা শাড়ি পরেছে। নীল শাড়ি পরা মেয়েদের চোখ বিষন্ন দেখায়। শাড়ির ছায়া পড়ে চোখে। মেয়েটি বলল, কে?
আতাহার বলল, আমাকে চিনবেন না। আমার নাম আতাহার। সাজ্জাদ আমাকে পাঠিয়েছে। ওর সঙ্গে একদিন মাত্র আপনার দেখা হয়েছে। জানি না। ওর কথা আপনার মনে আছে কিনা।
কণা উৎফুল্ল গলায় বলল, আরে, সাজ্জাদ ভাইজানের কথা মনে থাকব না? আপনে যে কি বলেন।
উনি বলেছিলেন, আপনাকে আর আপনার স্বামীকে চিড়িয়াখানা দেখবেন।
হ্যাঁ, বলেছিলেন।
আমাকে পাঠিয়েছেন। বললে আমি একটা গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে আসি।
এখন?
আপনাদের অসুবিধা না থাকলে আমি এখনি নিয়ে যাব। চিড়িয়াখানা সকাল নটা থেকে খুলে। এখন বাজছে এগারোটা।
আতাহার লক্ষ্য করল, মেয়েটার চোখে চাপা আনন্দ ঝলমল করছে। আনন্দের চেয়ে কৌতূহল এবং বিস্ময় থাকাটা উচিত ছিল না? কথা নেই বার্তা নেই, একটা লোক চিড়িয়াখানা দেখানোর ব্যবস্থা করছে এতে বিস্মিত হবার কথা, মেয়েটা বিস্মিত হচ্ছে না।
কণা বলল, আমার স্বামীরে একটু জিজ্ঞেস করা লাগবে ও এখন যাবে কিনা।
জিজ্ঞেস করুন।
সে তো ফামেসিতে কাজে আছে।
আমি শুনেছিলাম ফর্মেসির চাকরি চলে গেছে।
একটা গেছে। আরেকটা পেয়েছে। ফার্মেসির কাজ যারা জানে তাদের কাজের অসাবধা হয় না।
উনার ফর্মেসিটা কোথায়?
কাছেই রাস্তার মাথায়।
আতাহার বলল, আপনি কি জিজ্ঞেস করে আসবেন, না। আমিই গিয়ে জিজ্ঞেস করব?
চলেন দুইজনে মিলে যাই।
আতাহার মেয়েটির বিশেষত্বগুলি ধরার চেষ্টা করছে। চোখে পড়ার মত বিশেষত্ব থাকতেই হবে। সাজ্জাদের মত ছেলে কোন কারণ ছাড়া হুট করে মেয়েটাকে চিড়িয়াখানা দেখানোর জন্যে ব্যস্ত হয়ে যাবে, তা হয় না। অনেক উদ্ভট উদ্ভট কাণ্ড সে করে, তবে তার প্রতিটি উদ্ভট কাণ্ডের পেছনে ভাল লজিক থাকে। এই মেয়েটির ক্ষেত্রেও আছে, তবে তা আতাহারের চোখে ধরা পড়ছে না। কণাকে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতই লাগছে। তবে কথাবার্তা বলছে সহজ ভঙ্গিতে। অচেনা পুরুষের সঙ্গে কথা বলার আড়ষ্টতা তার মধ্যে নেই। না থাকারই কথা। যে শিল্পীর সামনে মডেল হয়ে পোজ দেয় সে অচেনা পুরুষের সামনে লজ্জায় জড়সড় হবে না, এটাই স্বাভাবিক।
কণার স্বামী থলথলে ধরনের বেঁটে একজন মানুষ। কয়েক রাত ঘুম না হলে চোখে যে ঘোর ঘোর ভাব চলে আসে তার চোখেও তাই চলে এসেছে। মনে হচ্ছে সুযোগ-সুবিধা মত অযুদ্ধ বিক্রি করতে করতে সে খানিকটা ঘুমিয়ে নেবে। চিড়িয়াখানায় যাবার প্রস্তাবে সে বিস্মিত হল না। হাই তুলতে তুলতে বলল, কাজকর্ম ফেলে চিড়িয়াখানা কি? ছুটির দিনে আসেন। শুক্রবার দোকান একবেল ছুটি থাকে। শুক্রবার সকালে আসেন।
আতাহার অত্যন্ত আনন্দিত হবার ভঙ্গিতে হেসে বলল, জ্বি আচ্ছা।
এই শুক্রবার না, তার পরের শুক্রবারে আসেন। এই শুক্রবারে কাজ আছে।
জ্বি আচ্ছা। কণা-সমস্যার সমাধান হবার পর আতাহার স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলল। মানুষ
খোঁজার ঝামেলা থেকে আপাতত মুক্তি পাওয়া গেছে। সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করলে সে এখন বলতে পারবে–কণাকে পাওয়া গেছে। এতে সাজ্জাদের আগ্রহও খানিকটা কমে যাবার কথা। পাওয়া না গেলেই আগ্রহ বাড়তে থাকে–একবার পাওয়া গেলে আগ্রহ কমে যায়।
মডার্ন ফার্মেসি থেকে বের হয়েই আতাহার কণার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তাহলে যাই।
কণা হাসিমুখে বলল, জ্বি আচ্ছা।
এই শুক্রবারের পরের শুক্রবার গাড়ি নিয়ে চলে আসব।
ইনশাল্লাহ বলেন। ইনশাল্লাহ না বললে একটা বেড়াছেড়া হয়।
ইনশাল্লাহ।
কণা বলল, আমি একটা পান খাব। মিষ্টি পান। রাস্তার মোড়ে পান সিগারেটের দোকান।
আতাহার কণাকে মিষ্টি পান। কিনে দিল। এবং মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হল মেয়েটি স্মাটা। আতাহার বলল, আমি আমার বাড়ির ঠিকানা তোমাকে লিখে দিয়ে যাচ্ছি। যদি তোমরা অন্য কোথাও চলে যাও আমাকে জানিও।
কণা হাসিমুখে বলল, জ্বি আচ্ছা। বলেই সে ঠোঁট গোল করে ফুটপাতে লাল পানের পিক ফেলল। আগের চেয়ে অনেক বেশি হাসিখুশি গলায় সে বলল, ভাইজান, প্রথম আপনি আমারে আপনে কইরা বলতেছিলেন। এখন তুমি বলতেছেন। কারণটা কি?
