প্রস্তাবই বা দিবে কেন? প্রস্তাব দিতে হলে–মোহনগঞ্জ যাবে–তারপর প্রস্তাব দিবে। বদমায়েশের দল।
সালমা হাসতে হাসতে বলল–কথায় কথায় তুমি বদমায়েশ বলছ কেন? এত রাগ করছি কেন?
রাগ করব না। শেষ রাতে বলতে গেলে ঘাড় ধরে ঘুম থেকে তুলে দেয়। ফজরের নামাজ পড়তে হবে। নামাজ পড়ি না পড়ি সেটা আমার ব্যাপার। তুমি জোর করার কে? তাও ঘরে নামাজ পড়লে হবে না–পাক, কাদা, পানি পার হয়ে তিন মাইল দূরের মসজিদে যেতে হবে। আমি মরে গেলেও এই বাড়িতে তোর বিয়ে দেব না। এইখানে বিয়ে দিলে এরা তোর জীবন শেষ করে দেবে। সকালটা হোক–বিদায় হয়ে যাব। নৌকা না পাওয়া যায় সাতরে চলে যাব।
সকালবেলা হোসেন আলি সাহেবের বড় ছেলে, সুটকেস হাতে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে উপস্থিত। সালমা টেকি ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকে প্রথম দেখল। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার চোখ নামিয়ে নিতে পারল না। মুহুর্তের মধ্যে বুক ব্যথা শুরু হল। কোথেকে একটা কান্নার দলা গলার কাছে এসে মাছের কাঁটার মত আটকে গেল। সুখের মত ব্যথা বোধ হতে লাগল। তার মনে হল–না থাক, কি মনে হল তা তিনি এখন আর ভাবতে চান না। তার বড়ই অস্বস্তি লাগে। মাত্র ষোল বছর বয়সে তিনি যে কাণ্ডকারখানা করেছেন তা ভাবলে তাঁর লজ্জায় গায়ে কীটা দেয়। এ যুগে মেয়েদের নানান সাহসিকতার গল্প তিনি শোনেন। শুনতে শুনতে মনে হয়–তাঁর নিজের সাহসও তো এদের তুলনায় কম ছিল না। বরং অনেক বেশীই ছিল।
মামা তখন সুটকেস গুছিয়ে ফেলেছেন। চলে যাবেন। দুর্গাপুর-ধিরাই লঞ্চ সার্ভিস শুরু হয়েছে। দুপুর বেলাতেই লঞ্চ ছাড়বে। হোসেন সাহেবকে বলেছেন–বিয়ের আলাপ তো এভাবে হুট করে হয় না। দিন তারিখ ঠিক করে মোহনগঞ্জ আসেন। কথাবার্তা হবে। কপালে থাকলে বিয়ে হবে। মানুষের ইচ্ছায় তো বিয়ে শাদী হয় না। আল্লাহর ইচ্ছায় হয়।
সালমার মামা যখন চলে যাবার জন্যে প্রস্তুত তখন একটা কাণ্ড হল। তিনি ভাগ্নিকে বললেন, যাও বাড়ির মেয়ে ছেলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসা। সালমা ইতঃস্তত করে বলল, মামা একটা কথা।
সালমার মামা ভ্ৰ কুঁচকে বললেন, কি কথা?
ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয়েছে?
কি বললি?
সালমা কোন রকম লজ্জা বা সংকোচ না করে আবার বলল–ছেলেটাকে তার পছন্দ হয়েছে।
সালমার মামা হতভম্বর গলায় বললেন, আমার তো মনে হয় এরা তোকে তাবিজ করেছে। অবশ্যই তাবিজ করেছে। না হলে নিজের মুখে কোন মেয়ে এ কথা বলতে পারে। পছন্দ হলে পরে দেখা যাবে। যা, অন্দরের মহিলাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আয়।
সালমা অন্দরে গেল। হোসেন আলি সাহেবকে কদমবুসি করল।
হোসেন আলি সাহেব বললেন, তোমাকে মা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এত পছন্দ এই জীবনে কাউকে হয় নাই। যাই হোক, আমি যাতে তোমাকে এই বাড়িতে রেখে দিতে পারি। সেই চেষ্টা করব। প্ৰস্তাব নিয়ে যাব–বাকি আল্লাহর ইচ্ছা
সালমা তখন বলল, বেশ স্পষ্ট করে বলল–আমি মামার সঙ্গে যাব না। আমি এই বাড়িতে থাকব।
সেই রাতেই কাজি ডাকিয়ে বিয়ে পড়ানো হল। বাসর রাতে সালমা স্বামীর সঙ্গে যে সব কাণ্ডকারখানা করল এই যুগের অতি আধুনিক অতি সাহসী মেয়েরাও তা করতে লজ্জা পাবে।
বিয়ের পর মামার বাড়ির সঙ্গে তার সব রকম সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। মামাদের ধারণা সালমা পরিবারের মাথা হেট করেছে। পরিবারের সম্পমান ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছে। তার মামারা জানিয়ে দিলেন, সালমা যেন আর কোনদিন মোহনগঞ্জ ফিরে না আসে।
সালমা ফিরে যায়নি। সে তার শ্বশুরের মৃত্যু পর্যন্ত দুর্গাপুরেই ছিল। এখন জীবনের শেষ অংশ কাটাচ্ছে হাসপাতালে। হাসপাতালটাকে ঘরবাড়ি মনে হচ্ছে। এই ঘর বাড়ি ছেড়ে তিনি তাঁর আগের বাড়িতে ফিরে যাবেন তা মনে হয় না।
সুবর্ণের বর্ষা সংখ্যা
সুবর্ণের বর্ষা সংখ্যা বের হয়েছে। প্রচ্ছদে কদম গাছের ছবি। ফটোগ্রাফকে কি কায়দা করেছে, দেখে মনে হয় জলরঙে আঁকা ছবি। আতাহারের মনে হল, লোকজন প্রচ্ছদ দেখেই পত্রিকা কিনে ফেলবে। হু হু করে সুবর্ণ বিক্রি হয়ে যাবে। আতাহার সূচিপত্রে চোখ বুলাল—
আবু কায়সার : রবীন্দ্রনাথের বর্ষা।
বুকের ভেতর আতাহার নিঃশ্বাস চাপিল। আবার রবীন্দ্রনাথ? এই বুড়োর হাত থেকে কি নিস্তার নেই?
মনিরুল হাসান। জীবনানন্দের বর্ষাবিদ্বেষ।
জীবনানন্দের বর্ষাবিদ্বেষ ছিল না-কি? হেমন্ত, শীত, এইসব নিয়ে ভদ্রলোকের তামাতি আছে–তার মানে এই না যে তার বর্ষা বিদ্বেষ ছিল। বাঙালী ছেলের বর্ষাবিদ্বেষ থাকলে বুঝতে হবে সে অসুস্থ। তার ভাল চিকিৎসা হওয়া দরকার।
বর্ষায় নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ :
বেশ কটি কবিতা আছে। আতাহারের বুক ধ্বক ধ্বক করছে। কখন তার নিজের নামটা পাওয়া যাবে। নাম নেই। আশ্চর্য কাণ্ড তো—নাম থাকবে না কেন? তরুণদের কবিতা কি আলাদা কোন শিরোনামে যাচ্ছে? আতাহার দ্রুত পুরো সূচিপত্রে চোখ বুলাল। তারপর পড়ল আস্তে আস্তে–দ্রুত চোখ বুলালে অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। আতাহার বা সাজ্জাদ দুজনের কারো নামই নেই।
এমন অবশ্যি হতে পারে যে, ভুলে সূচিপত্রে নাম আসেনি। তরুণ কবি, তরুণ গল্পকারদের ক্ষেত্রে এ জাতীয় ভুল হয়। তাদের ক্ষেত্রেও হয়েছে। ভেতরে কবিতা ঠিকই ছাপা হয়েছে, শুধুসূচিপত্রে নাম নেই।
আতাহার একটা একটা করে পাতা উল্টাল। না, কবিতা ছাপা হয়নি। গনি সাহেব তাদের ডিজ দিয়েছেন। নিউজ স্ট্যান্ডের ছেলেটা বলল, কিনবেন স্যার? আতাহার বলল, টাকা থাকলে কিনতাম। টাকা নেই। পত্রিকা ঘাটাঘাটি করেছি। এই বাবদ তুই বরং একটা ঢাকা রেখে দে। ছেলেটা রাগী চোখে তাকাল। তবে আতাহারের সঙ্গে অন্য যে ভদ্রলোক গভীর মনযোগে একটার পর একটা খবরের কাগজ পড়ে যাচ্ছেন, তিনি মজা পেয়ে হো হো করে হাসতে লাগলেন। আতাহারের মনে হল বর্ষার এই সকালটা একজনকে গভীর আনন্দ দানের মাধ্যমে শুরু হল। কবিতা ছাপা না হবার পরেও হয়ত আজকের দিনটা ভাল যাবে। যদিও তার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সকালে বাড়ি থেকে বেরুবার সময় একটা কাক বসে থাকতে দেখা গেছে। কাকযাত্রা অসম্ভব অশুভ।
