এখন হাসপাতালে এই কেবিনটাকেই তার ঘর বাড়ি বলে মনে হয়। আয়াকে দিয়ে একটা মানিপ্লেন্টের চারা এনে পানির বোতলে রেখেছেন। বোতলটা জানালার কাছে লোহার শিকের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাধা। চারা থেকে শিকড় ছেড়েছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি নতুন শিকড় দেখতে পান। তার ভাল লাগে। বিকেলে জানোলা দিয়ে আলো এসে তেড়ছা করে দেয়ালে পড়ে। সেই আলোও দেখতে ভাল লাগে। গভীর রাতে বারান্দা নিয়ে টুলি টেনে নেবার শব্দ, নাস এবং ইন্টানি ডাক্তারদের ব্যস্ত চলাফেরা কানে আসে। এই সব শব্দ তার শুনতে ভাল লাগে। আধো ঘুম আধো জাগরণে মনে হয়–আহা করি আবার কি হল? সকালবেলা আয়ার কাছ থেকে বিস্তাবিত শোনেন। হাসপাতালটাকেই এখন তাঁর নিজের ঘর সংসার মনে হয়। এটা বড় ধরনের অলক্ষণ। কোন জায়গাকে ঘর সংসার মনে হলে সেই জায়গায় সংসার হয়ে যায়। এই সত্য পরীক্ষিত সত্য। তিনি ছোটবেলায় তার মামার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কংশ নদীর তীরে মোহনগঞ্জে তার মামার বাড়ি। দুই মামা, নানা-নানী থাকেন। চার পাঁচদিন মহানন্দে কেটে গেল। একদিন দুপুরে পড়ার ছোটছোট মেয়েদের সঙ্গে ফুলগুটি খেলছেন। পাঁচটা গুটি দিয়ে খেলা। সুর করে ছড়া পড়তে হয়। তার দান যখন এল তিনি গুটি হাতে নিয়ে ছড়া পড়লেন–
ফুলনা ফুলনা ফুলনা
এক হাতে দুলনা—তেলনা
সুষম সুষম সুষম
আঁটি আঁটি আঁটি
লঙ্গনা লঙ্গনা লঙ্গনা
ছড়া পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হল–এটাই তার ঘর সংসার। গ্রামের এই বাড়ি, কংশ নদী, বাড়ির পেছনের তেতুল গাছ, সকালবেলা হাসের ঝাকের পুকুরের দিকে যাত্রা এই সব নিয়েই তার সংসার। হয়েও গেল তাই।
তারা ঢাকা চলে আসবে, রাতের ট্রেন। সন্ধ্যা থেকে গোছগাছ হচ্ছে। তখন তাঁর নানাজান তাঁর মাকে বললেন—সালমা ছিল বাড়িটা আলো হয়ে ছিল—মেয়েটা আরো কয়েকদিন থাকুক। চিন্তা করিস না, আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসব। তার মা নিতান্ত অনিচ্ছায় বললেন, আচ্ছা। বেশি দেরি করবেন না বাবা।
আমি এক সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে আসব রে বেটি।
তিনি থেকে গেলেন। তিন দিনের দিন মার মৃত্যু সংবাদ নিয়ে টেলিগ্রাম এল। তাঁর আর ঢাকা যাওয়া হল না। নানার বাড়ি থেকে মেট্রিক পাশ করলেন।
তারপর একবার ছোট মামার সঙ্গে বেড়াতে গেলেন–দুর্গাপুর। দিনে দিনে গিয়ে ফিরে আসার কথা। পৌঁছার পর এমন ঝড় বৃষ্টি শুরু হল। রাস্তাঘাটে পানি জমে গৈল। বাস বন্ধ। তারা আটকা পড়ে গেলেন। তিনদিন তিন রাত অপরিচিতি এক ভদ্রলোকের বাড়িতে থাকতে হল। ভদ্রলোক বুড়ো, সাবরেজিস্টার। ঘোরতর ধরনের নামজ্বি মানুষ। বাড়িতে কঠিন পর্দা প্রথা। মেয়েদের উঁচু গলায় কথা বলার পর্যন্ত নিয়ম নেই। উঁচু গলায় কথা বললে পুরুষ মানুষ শুনে ফেলবে। তার অস্বস্তির সীমা রইল না। বেড়াতে এসে একি বিপদে পড়া গেল। দ্বিতীয় দিনে হঠাৎ করে অস্বস্তি কেটে গেল। সংসারটাকে খুব আপন মনে হতে লাগল। সন্ধ্যাবেলা বাড়ির বারান্দায় জলচৌকি পেতে তিনি বসে আছেন। তখনো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। উঠানে কল কল করছে পানি। ছেলেরা কলাগাছ কেটে–কলাগাছের ভোড়া বানিয়ে উঠোনে নিয়ে এসেছে–তিনি দেখে খুব মজা পাচ্ছেন–এই বাড়ি, বাড়ির মানুষজন, কলাগাছের ভোড়া সবই খুব আপন মনে হচ্ছে, নিজের মনে হচ্ছে। তখন সাবরেজিস্টার নিয়ামত হোসেন মসজিদে নামাজ পড়ার জন্যে ঘর থেকে বের হলেন, তাকে দেখে বিরক্ত মুখে বললেন–মা, শোন। সন্ধ্যাবেলা মাথায় কাপড় না দিয়ে বসে আছ। এটা ভাল না। মাথায় কাপড় দাও।
তিনি লজ্জিত হয়ে দ্রুত মাথায় কাপড় দিলেন। সেই রাতেই নিয়ামত হোসেন তার মামাকে ডেকে বললেন–আল্লার ইশারা ছাড়া গাছের পাতা নড়ে না। এই যে আপনি অচেনা অজানা একজন মানুষ মেয়েটাকে নিয়ে মহাবিপদে পড়ে আমার কাছে আশ্রয় নিয়েছেন এটাও আল্লাহর ইশারা।
তাঁর মামা লজ্জিত মুখে বললেন, জ্বি জ্বি।
নিয়ামত হোসেন বললেন, আপনার ভাগ্নিকে আমাদের সবার খুবই পছন্দ হয়েছে। অতি সুলক্ষণা মেয়ে। আমি লোক মারফত আপনাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছি। খবর যা পেয়েছি তাতেও অতি আনন্দিত হয়েছি। আপনাদের শরাফত ভাল।
তাঁর মামা, কিছু না বুঝেই আবারো বললেন, জ্বি জ্বি।
নিয়ামত হোসেন বললেন–এখন আপনার ভাগ্নির বিষয়ে আমার একটা আব্দার আছে : রাখা না রাখা আপনার ব্যাপার। আমার বড় ছেলের নাম রশীদ। ভাল ছেলে বলে আমার বিশ্বাস। এ বছর বি এ পাশ করেছে। চাকরি বাকরি কিছু পায় নাই। তবে ইনশাল্লাহ পেয়ে যাবে। ছেলে থাকে ময়মনসিংহ। তাকে আসতে খবর পাঠিয়েছি। ছেলেটাকে দেখেন। যদি পছন্দ হয় তাহলে ভাগ্নিকে আমার ছেলের সঙ্গে বিবাহ দেন। আমাদের কোন দাবি নাই। এক হাজার একটাকা কাবিনে বিবাহ হবে। কন্যার নামে আমি দশ একর ধানী জমি রেজিস্ট্রি করে দিব। এখন আপনাদের বিবেচনা।
মামার চোখ মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি ক্ষীণ গলায় বললেন, জ্বি জ্বি। রাতে মামা ভাগ্ন এক ঘরে শুয়েছে। মামা থমথমে এবং চাপা গলায় বললেন, ফাজলামার জায়গা পায় না। জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবে। সালমা তুই কোন চিন্তা করিস না। বাস চালু না হলেও–নৌকা চলাচল শুরু হয়েছে। আমি খোঁজ নিয়েছি। কাল সকালে নৌকা করে চলে যাব। জোর করে মেয়ে রেখে দেয়া—বদমায়েশের বদমায়েশ। মোহনগঞ্জের বাজারে পেলে জুতাপিটা করুম। শালা ধান্ধবাজ।
সালমা বলল, জোর করে তো বিয়ে করিয়ে ফেলতে চাচ্ছে না। তোমাকে প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অপছন্দ হলে তুমি বলবে–না।
