সালমা বললেন, খেয়ে ফেল কিছু হবে না।
রশীদ সাহেব পকেটে হাত দিলেন। আবার হাত সরিয়ে নিলেন। তার গভীৰ্য আরো বাড়ল। হাসপাতাল তিনি সহাই করতে পারেন না। ফিনাইলের গন্ধ, তার কাছে মৃত্যুর গন্ধের মত লাগে। মৃত্যুর গন্ধ মনের উপর চাপ ফেলে। এমিতেই তিনি নানান ধরণের চাপের মধ্যে থাকেন। বাড়তি চাপ নেয়ার মত অবস্থা এখন তাঁর না।
সালমা বানু ক্ষীণ স্বরে বললেন, চা খাবে?
রশীদ সাহেব বিরক্ত মুখে তাকালেন। সালমা বললেন, চা খেলে বারান্দায় একটা ছেলে আছে তাকে বল, সে চা এনে দেবে।
হাসপাতালের জীবাণু মাখা চা খাব কেন?
হরলিক্স খাবে? ফ্লাস্কে গরম পানি আছে। হরলিক্স বানিয়ে খাও।
রশীদ সাহেব কঠিন কিছু কথা বলতে গিয়েও বললেন না। তিনি কি হরলিক্স খাওয়ার জন্যে হাসপাতালে এসেছেন? আর এত মেহমানদারিাইবা কি আছে? চা খাও–হারলিক্স খাও। তার বসে থাকতে অসহ্য লাগছে। এতদিন পর এসেছেন। এসেই চলে যেতেও মায়া লাগছে। আরো কিছুক্ষণ থাকা দরকার।
সালমা বললেন, বাসার খবরাখবর কি?
রশীদ সাহেব জবাব দিলেন না। চুপচাপ বসে থাকতে খারাপ লাগছে বলে সালমা খবরাখবর জানতে চাচ্ছে। জানার কিছু নেই, মিলি রোজ আসছে। খবরাখবর যা আছে মিলি বলে যাচ্ছে। মেয়েদের কাজই হল। খবর চালাচালি করা। সালমা বললেন, ফরহাদকে তুমি বকা ঝকা করনিতো?
করেছি। জুতা-পেটা যে করিনি এটা তার ভাগ্য। জুতা পেটা করা দরকার ছিল। বাটা কোম্পানীর জুতা দিয়ে শক্ত পেটা।
তারতো দোষ কিছু না। ফন্ট করে মাথা ঘুরে গেছে।
সহজ প্রশ্ন দেখে যার মাথা ঘুরে যায়, প্রশ্ন কঠিন হলে মাথা কি করত বুঝতে পারছ? মিল্লাত পাখার মত ভন ভন করে ঘুরত।
সালমা হেসে ফেললেন। রশীদ সাহেব কঠিন গলায় বললেন, হাসবে না। হাসার কথা আমি বলি না! তোমার সব কটা ছেলেমেয়ে চতুষ্পদ মাকা। একজন সহজ প্রশ্ন দেখে মাথা ঘুরে পড়ে যায়, একজন তিন বছরেও একটা দারোয়নের চাকরি জোগার করতে পারে না। মেয়ে একই রকম। মেয়েদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি একটু ইতঃস্তত করলেন। দুটা মেয়েই তার অতি প্রিয়। এদের সম্পর্কে খারাপ কিছু বলতে অস্বস্তি লাগে। যদিও অস্বস্তি লাগার কিছু নেই, মেয়ে দুটিও হাঁদারাম–কিংবা স্ত্রী লিঙ্গে হাঁদিরাম। বড়টা–বিরাট বড় হাদি। ছোটটাকে বুদ্ধিমতী মনে হলেও সে আসলে হাদি। প্রথম বার বি এ পরীক্ষায় থার্ড ক্লাস পেয়ে কেঁদে বুক ভাসাল। পরের বছর ইমপ্রক ভমেন্ট দিয়ে–ফেল। তখন আর চোখে পানি নেই। সে হ্যাদিরাম না হলে কে হবে। রিটায়ারমেন্টের পর লোকজন আরাম করে। ইজিচেয়ারে শুয়ে ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়ে। ছেলের বউ এসে জিজ্ঞেস করে–বাবা, চা খাবেন না কফি খাবেন। আর তার সংসারে সব কটা হীদারাম আর হ্যাদিরাম জোটায় বিশ্রাম মাথায় উঠেছে। তিনি এখন চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। নানান অফিস-টফিসে যাচ্ছেন। পার্টটাইম চাকরি কিছু পাওয়া যায় কি-না।
সালমা বললেন, হাসপাতালে বসে থাকতে তোমার বোধ হয়। ভাল লাগছে না। চলে যাও।
রশীদ সাহেব একটু নড়েচড়ে উঠলেন–সালমা তাঁর মনের কথা বলছে। রোগীর পাশে খাটে বসে থাকতে তার অসহ্য লাগছে। সালমা বললেন–
না।
তুমিও তো কোন চেষ্টাচরিত্র করছ না।
আমি কি চেষ্টা করব? মাইক নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে যাব?
তোমার কাছে মেয়েরা পড়তে আসে, ওদের বললে–ওরা খোঁজ খবর করবে।
ওদের তো কোন কাজকর্ম নেই বাজে কথা বন্ধ করা তো। আমি উঠি। মাথা ধরে গেছে।
রশীদ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। সালমা বললেন, ফরহাদকে আমার কাছে পাঠিও। আতাহারকেও আসতে বলে। দুজনের কেউই তো আসে না।
না আসাই ভাল। এদের মুখ যত কম দেখবে ততই শূভ। The less you see their faces the better.
তোমার চুল এত লম্বা হয়েছে, চুল কাটনা কেন?
রশীদ সাহেব তিক্ত গলায় বললে, আর চুল কাটাকাটি, মাথাই কেটে ফেলে দিব। যাই সাল্মা।
আচ্ছা।
তোমার শরীর তো আগের চেয়ে অনেক ভাল, তাই না?
সালমার শরীর আগের চেয়ে মোটেই ভাল না–তবু তিনি বললেন, হ্যাঁ। রশীদ সাহেব বললেন, খামাখা হাসপাতালে থেকে লাভ কি? ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে বাসায় চলে আস। দেখি কাল সকলে আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলব।
সালমা বললেন, আচ্ছা।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেললেন, কাল থেকে কেবিনে চায়ের ব্যবস্থা রাখবেন। আয়াকে বলে রাখবেন–সে যেন চট করে চা বানিয়ে দেয়। চা, মিষ্টি পান। কাচা সুপারি দিয়ে মিষ্টি পান। রশীদ সাহেবের দীতে সমস্যা হয়েছে। শক্ত সুপারি চিবুতে পারেন না। নরম কাঁচা সুপারি ছরতা দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে দিতে হয়। মিলিকে বার বার বলে দিয়েছেন। মিলি এইসব দেখছে কি-না কে জানে। সংসারের শতেক ঝামেলা মেয়েটার উপর পড়েছে। এরমধ্যে ছোটখাট সমস্যা কি মনে থাকবে। বড় সমস্যার দিকে সবার চোখ থাকে। সেইসব সমস্যার সমাধান হয়। ছোট সমস্যা চোখ এড়িয়ে যায়। অথচ সংসারে ছোট সমস্যাগুলিই আসল সমস্যা। যেমন ফরহাদ বেগুন খেতে পারে না। বেগুন খেলেই তার সারা গা চাকা চাকা হয়ে ফুলে ওঠে। শুধু বেগুন না, বেগুনের তরকারীর ঝোল খেলেও এ রকম হবে। রশীদ সাহেবের অতি পছন্দের তরকারী কচুর লতি। সেই কচুর লতি যদি গরম পানি দিয়ে কয়েকবার ধোয়া না হয় তাহলে রশীদ সাহেবের গলা চুলকায়। কাশি হয়। বারান্দায় ফুলের টবগুলিতে পানি দেবার ব্যাপার আছে। একটা ক্যাকটাসের টব আছে, সেখানে সপ্তাহে একদিন পানি দেয়ার নিয়ম। তিনি শুক্রবার সকালে দিতেন। মিলি কি এইসব মনে করে রেখেছে? বাচ্চা মেয়ে, এত কিছু তার মনে থাকার কথা না। তিনি বাসায় ফিরে যেতে পারলে সব ঠিকঠাক করে ফেলতে পারবেন। ফিরে যেতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না।
