পুরীষটা কী?
পুরষ জান না? বাংলা ভাষায় তোমাদের দখল এত কম? আশ্চর্য! পুরীষ হল বিষ্টা। গ্রাম্য ভাষায় গু। মানুষের গু।
আতাহার হতভম্ব গলায় বলল, বারান্দা ভর্তি পু্রীষ?
হ্যাঁ, মনে হচ্ছে দুই-তিন টন পুরীষ রাতে এসে ঢেলে রেখে গেছে।
সে কি?’
শত্রুতা করে কেউ করিয়েছে।
আপনার সঙ্গে কার এমন শত্রুতা থাকবে?
সেটাই তো বুঝছি না। আমি নিবিরোধী মানুষ। লেখাপড়া নিয়ে থাকি। কেউ বলতে পারবে না। আমি কারো সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলেছি।
তা তো বটেই।
সারাদিন লাগল আমার এই নোংরা পরিস্কার করাতে। তিনজন মেথর লেগেছে। ডেটল দিয়ে ধুইয়েছি, ফিনাইল দিয়ে ধুইয়েছি। তারপরেও গন্ধ যায় না।
খুবই যন্ত্রণা হয়েছে তো।
যন্ত্রণা তো বটেই। যন্ত্রণার চেয়ে বেশি হল হিউমিলিয়েশন। প্রতিবেশীরা সবাই আমার দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকায়। শুকনা মুখে জিজ্ঞেস করে, ব্যাপারটা কি? কিন্তু তাদের ঠোঁটের কোণার কাছে হাসি।
এটা তো হাসির কোন ব্যাপার না।
হাসির ব্যাপার নয় তো বটেই। কিন্তু মানুষের হাসি তো তুমি বন্ধ করতে পারবে না। আমি থানায় জ্বি ডি এন্টি করাতে গোলাম, ঘটনা শুনে রমনা থানার ওসি দেখি ভ্যাক ভ্যাক করে হাসে। যাই হোক, ঘটনার এইখানে সমাপ্তি হলে একটা কথা ছিল–তা না, পরের বুধবারে আবার এই ঘটনা।
বলেন কি?
আমার স্ত্রী তো কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। তিনি এখানে থাকবেন না। ফ্ল্যাট ভাড়া করে সাত-আট তলার দিকে থাকবেন।
আমার তো মনে হচ্ছে সেটাই করতে হবে।
তুমি কি পাগল হলে? গুণ্ডমি-বদমায়েশীর কাছে নতি স্বীকার করব? ক্যান আই ড়ু দ্যাটা? আমি তো বদমায়েশীর মূল টান দিয়ে বের করব। চব্বিশ ঘণ্টার জন্য সিকিউরিটি গার্ড রেখেছি। জলের মত পয়সা খরচ হচ্ছে। হোক। আমি ছাড়ব না। আমি সিআইডি দিয়ে ইনভেস্টিগেট করাব।
করা তো উচিত।
ওরা ঘুঘু দেখেছে, ফাঁদ দেখেনি। আমি নিবিরোধী লোক–এটা ঠিক আছে। তাই বলে আমাকে নিবিষ, ঢোরাসাপ মনে করার কোন কারণ নেই।
ঘটনা শুনে আতাহারের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল। কি সর্বনাশের কথা! সাজ্জাদ যে সত্যি সত্যি গু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে তা তো বলেনি। এই সব ব্যাপার চাপা থাকে না। ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়বে। তার ফলাফল খুব শুভ হবার কথা না।
গনি ভাই, উঠি।
উঠবে? আচ্ছা যাও। মন খুলে যে সাহিত্য-টাহিত্য নিয়ে আলাপ করব সে উপায় নেই। মনটা ঐ ঘটনার পর থেকে বিক্ষিপ্ত। যাই হোক, সাজ্জাদকে একদিন নিয়ে এসো। ও যেনো তার রিসেন্ট কিছু কবিতা নিয়ে আসে।
কয়েকটা অনুবাদ অবশ্য সে আমার সঙ্গে দিয়ে দিয়েছে। রবার্ট ফ্রস্টের অনুবাদ।
ভেরী গুড। রেখে যাও। মেজর পয়েটদের কবিতা অনুবাদ করলে হাত খুলে। রবট ফ্রস্ট অবশ্যি মেজর পয়েটদের মধ্যে পড়ে না। তার কবিতায় কথকতার একটা ঢং আছে। পড়তে আরাম, এহছুকহ। টেলিফোনের উপর তাঁর একটা কবিতা আছে। তুমি জান?
জ্বি–না।
একজন প্রধান কবি টেলিফোন নামক যন্ত্র নিয়ে কবিতা লিখছেন, এটাকে তুমি কিভাবে দেখবো?
কি লিখেছেন সেটা না জানলে বলা মুশকিল।
গনি সাহেব তৎক্ষণাৎ পুরো কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন। এই প্রথমবারের মত আতাহারের মনে হল, এই লোকের পড়াশোনা আসলেই ব্যাপক।
When I was just as far as I could walk
From here to-day.
There was an hour
All still
When leaning with my head against a flower
I heard you talk.
Don’t say I didnt, for I heard you say–
Do you remember what it was you said?
First tell me what it was you thought you heard.
আতাহার বলল, গনি ভাই, কবিতাটা কেমন?
গনি সাহেব বললেন, অসাধারণ।
আপনি বলেছিলেন উনি একজন মাইনর কবি।
মাইনর কবি তো বটেই। মাইনর কবিরাও মাঝে মাঝে দু-একটা মেজর কবিতা লিখে ফেলে।
গনি সাহেব, আতাহারকে গোট পর্যন্ত আগিয়ে দিলেন। কেন দিলেন আতাহার জানে না। গোটে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটি গার্ড বুট প্রচণ্ড শব্দ করে স্যালুট দিল।
সালমা বানু
সালমা বানু লজ্জা লজ্জা চোখে স্বামীর দিকে তাকাচ্ছেন। কেন এমন লজ্জা লাগছে নিজেও বুঝতে পারছেন না। ত্রিশ বছর বিবাহিত জীবন যাপনের পর স্বামীকে দেখে তরুণী বয়সের লজ্জা পাবার কোন অর্থ হয় না। অসুখের পর অনেক অর্থহীন ব্যাপার তাঁর মধ্যে ঘটছে। গল্প করার মত কেউ থাকলে এইসব নিয়ে তার সঙ্গে গল্প করতেন। মিলি আসে খুব অল্প সময়ের জন্যে। এসেই কেবিন গোছানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আয়াদের অসুখের কথা জিজ্ঞেস করে, তারপর যায় ডাক্তারের খোঁজে। তার সঙ্গে গল্প করার মত সময় বের করা যায় না। মাঝে মাঝে মিলি গভীর হয়ে পা ঝুলিয়ে তাঁর পাশে বসে। তখন মেয়েটার গম্ভীর মুখ দেখেই সালমা বানু কোন কথা শুরু করতে পারেন না। মেয়েটার কি অন্য কোন ঝামেলা হয়েছে? সে এত গভীর কেন? মেয়েটার বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে–কোন সম্মন্ধ আসছে না। মিলিকে নিয়ে তাঁর ইদানীং খুবই দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে।
রশীদ সাহেব ও ঠিক মিলির ভঙ্গিতেই বসেছেন। পা বুলিয়ে বসেছেন, পা দুলাচ্ছেন। হাসপাতালের কেবিনের বেড়গুলি উঁচু উঁচু, বসলেই পা ঝুলে থাকে। রশীদ সাহেবের মুখ গভীর। এই গান্তীর্যের কারণ সালমা জানেন। ত্রিশ বছর পাশাপাশি ব্যাস করলে একটা মানুষের সব কিছু জানা হয়ে যায়। সালমা বানু জানেন তার স্বামী গভীর হয়ে আছে কারণ বেচারা অনেকক্ষণ সিগারেট খেতে পারছে না। রশীদ সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, সালমা, তোমাদের এইসব ঘরে সিগারেট খাওয়া যায় না?
