চুপচাপ বসে থাকলে অদ্ভুত অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা তার মাথায় আসে। এইসব চিন্তাভাবনা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে তার আলোচনা করতে ইচ্ছা করে। আলোচনার মানুষ পান না। সবাই মনে হয় ব্যস্ত। মাঝে মাঝে নীতুকে পাওয়া যায়, তবে সে মনে হয় গম্প। গুজব শোনার ব্যাপারে আগ্রহী না। সাজ্জাদকে তো পাওয়াই যায় না। তিনি যখনই খোঁজ নেন তখনি শোনেন বাসায় নেই। ছেলেটাকে ঘরমুখো করার ব্যবস্থা করা দরকার। বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। তার পছন্দের কেউ থাকলে ব্যাপারটা সহজ হত। মনে হচ্ছে পছন্দের কেউ নেই। কণার কথা শুনেছেন। মেয়েটা কে? আতাহারকে জিজ্ঞেস করে জানতে হবে। আতাহারের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়–আসল ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করতে মনে থাকে না। সে যদি আজ রেস্টুরেন্টে খেতে যেত তাকে জিজ্ঞেস করা যেত। পার্টিতে হাসি হাসি মুখে অনেক জটিল প্রশ্ন করা যায়।
সাজ্জাদের পছন্দের কেউ যদি না থাকে তাহলে মেয়ে খোজার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। তাকেই যেতে হবে। তবে এ ব্যাপারে সাজ্জাদের মার একটা মতামত নেয়া যেতে পারে। সেটা দোষের কিছু না। দীর্ঘদিন আগে কি হয়েছিল না হয়েছিল সেসব মনে রেখে লাভ নেই।
হোসেন সাহেবের স্ত্রীর নাম সাবেরা। স্ত্রীর নামের সঙ্গে নাম মিলিয়ে ছেলের নাম রেখেছিলেন সাজ্জাদ। মেয়ের নাম রেখেছিলেন। সারা। মেয়ের নাম সারা থেকে কি করে নীতু হয়ে গেল। তিনি ঠিক জানেন না। এটা ঠিক হয়নি। মায়ের নামের সঙ্গে মিলিয়েই ছেলে মেয়ের নাম হওয়া উচিত। ডে অব জাজমেন্টের দিন মায়ের নাম ধরেই ছেলেমেয়েকে পুনরোথিত করা হবে। বাবার নামে না।
সাবেরার উপর হোসেন সাহেব অসম্ভব খুশি ছিলেন। তার ধারণা এ রকম বুদ্ধিমতী মেয়ে পৃথিবীতে কম জন্মেছে। শুধু বুদ্ধিমতী না, বুদ্ধিমতী এবং ভাল মেয়ে। সাধারণত এই দুয়ের কম্পিবনেশন হয় না। বুদ্ধিমতী মেয়েগুলির ভেতর নানান রকম জটিল প্যাঁচ থাকে। সাবেরার ভেতর এইসব ছিল না। স্বভাব্যচরিত্র অবশ্যি খানিকটা অদ্ভুত ছিল। যেমন মাঝ রাতে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, তিনি চাদর গায়ে দিয়ে আরাম করে ঘুমুচ্ছেন–সাবেরা তাকে ডেকে তুলে বলবে–এই শোন, ওঠতো, বৃষ্টি হচ্ছে। আমার সঙ্গে একটু ছাদে চল, বৃষ্টিতে ভিজব।
রাত তিনটায় বৃষ্টিতে ভিজা পাগলামী ছাড়া আর কি? তিনি স্ত্রীর সঙ্গে ছাদে যেতেন ঠিকই। চিলেকোঠায় বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেন। সাবেরার বৃষ্টিতে ভেজা শেষ হতই না। ঘুমে তাঁর চোখ জড়িয়ে আসত–আর এদিকে সাবেরা ছাদের এ মাথা থেকে ও মাথায় যাচ্ছে। ছাদে জমে থাকা পানি পা দিয়ে ছিটাচ্ছে। এবং মাঝে মাঝে চিৎ হয়ে ছাদে শুয়ে পড়ছে। গোসল শেষে হিহি করে শীতে কাঁপিতে কাপতে নেমে আসছে। ঠাণ্ডায় ঠোঁট নীল হয়ে আছে। এ জাতীয় পাগলামীকে প্রশ্ৰয় দেয়া উচিত না–তিনি প্রশ্ৰয় দিয়েছেন, কারণ স্ত্রীর মনে কষ্ট দেয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। প্রতিদিন কোট থেকে একবার হলেও বাড়িতে টেলিফোন করতেন–তার কারণ একটাই, স্ত্রীর গলা শোনা। টেলিফোনে সাবেরার গলার স্বর শুনতে তাঁর এত ভাল লাগতো যে বলার না।
একবার সাবেরা বলল–সংসার টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সাত দিনের জন্যে আমি আমার বড় ভাইয়ের কাছে বেড়াতে যাব। এক যাব। এই সাতদিন তুমি সজিদকে রাখতে পারবে না?
তাঁর মনটা খারাপ হয়ে গেলো। তবু তিনি বললেন, পারব। অবশ্যই পারব। না। পারার কি আছে?
তাহলে তুমি সাজ্জাদকে নিয়ে থাকে। তোমার সমস্যা হলে তুমি তোমার মার কাছে রেখে এসো। সেখানে সে খুব ভালই থাকবে। আমি এক এক কয়েকটা দিন থাকব।
তিনি শুকনো গলায় বললেন, আচ্ছা। স্ত্রীকে চিটাগাং মেলে তুলে দিলেন। ট্রেন ছাড়ার সময় তার চোখ ভিজো গেলো। তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন।
সাবেরা চলে যাবার পর তিন রাত তিনি এক ফোঁটা ঘূমুতে পারলেন না। চতুর্থ দিনে সাজ্জাদকে তার দাদীর কাছে রেখে চিটাগাং চলে গেলেন।
সাবেরা তাঁকে দেখে খুবই বিরক্ত হয়ে বলল, কি ব্যাপার?
তিনি হড়বড় করে বললেন, চিটাগাং-এ খুব জরুরি একটা কাজ পড়েছে। কোম্পানি আইনের একটা মামলা, পার্টি এমন করে ধরেছে–না এসে পারলাম না। ওরা আগ্রাবাদ হোটেলে আমার থাকার ব্যবস্থা করেছে। ভাবলাম তুমি যখন এখানে আছ শুধু শুধু হোটেলে থাকব কেন?
নীতুর দুবছর বয়সে সাবেরার কিছু একটা হল যা তিনি ঠিক ধরতে পারলেন না। রাতে মাঝে মাঝে বাথরুমে যাবার জন্যে তাঁর ঘুম ভাঙ্গে। তিনি দেখেন তঁরা পাশে সাবেরা নেই। সে বারান্দায় মেঝেতে পা ছড়িয়ে রেলিং-এ হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছে। তাকিয়ে আছে অন্ধকারের দিকে। তার চোখে-মুখেরাজ্যের ক্লান্তি তিনি বিস্মিত হয়ে বলেছেন, কি ব্যাপার সাবেরা?
কিছু না। ঘুম আসছে না। তাই চুপচাপ বসে আছি। তুমি শুয়ে পড় আমি আসছি।
ঘুম আসছে না কেন?
ঘুম আসছে না কেন সেটা আমি কি করে বলব?
মাথায় পানি ঢেলে–এক কাপ গারম, দুধ-খেলে। …
তুমি ঘুমুতে যাও তো। তোমার ঘুমের ডাক্তার হবার দরকার নেই। ঘরের ভেতর গরম। বাইরে বসে থাকতে আমার ভালই লাগছে।
আমি বসব তোমার সঙ্গে?
তুমি বসবে কেন? তোমার তো ঘুমের সমস্যা না। বিছানায় যাওয়া মাত্ৰ তুমি ভুসভুস করে নাক ডাকাবে। বললাম তো আমি আসছি। তুমি শুয়ে পড়।
তিনি শুয়ে পড়লেন। ঘণ্টাখানিক অপেক্ষা করে নিজে ঘুমিয়ে পড়লেন। শেষ রাতে জেগে দেখেন–সাবেরা পাশে শুয়ে ঘুমুচ্ছে। কখন সে বিছানায় এসেছে কে জানে।
