তারপর ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটল। নভেম্বর মাসের এগারো তারিখ ঠিক এগারোটার সময় হোসেন সাহেব সাবেরার টেলিফোন পেলেন। সে কখনোই তার চেম্ববারে টেলিফোন করে না। হোসেন সাহেব অসম্ভব খুশি এবং অসম্ভব অবাক হয়ে বললেন, কি ব্যাপার সাবেরা?
সাবেরা বলল, তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা বলব। তোমার কি এখন সময় হবে?
আরে কি বল, সময় হবে না কেন? আমি বাসায় চলে আসছি।
বাসায় আসতে হবে না। কথাগুলি টেলিফোনে বলাই ভাল। তোমার আশে পাশে কি কেউ আছে?
না।
শোন–তোমার সংসারে আমার মন টিকছে না।
হোসেন সাহেব হতভম্বর গলায় বললেন, কি বললে?
তোমার সংসারে আমার মন টিকছে না। অনেকদিন ছিলাম, খুব কষ্ট করে ছিলাম।
সাবেরা বললেন, আমি এখন চলে যাচ্ছি–তুমি সাজ্জাদ এবং সারাকে দেখবে। ওদের খানিকটা কষ্ট হবে–কি আর করা।
কি বলছো সাবেরা?
ডিভোর্সের কাগজপত্র তোমার কাছে চলে আসবে। তুমি সই করে দিও। আমি চাইনা ডিভোর্সের মামলা কোর্টে উঠুক।
ডিভোর্সের কথা কি বললে?
আমার লইয়ারের কাছ থেকে তুমি চিঠি পাবে। সেই চিঠিতে অনেক আজে বাজে কথা তোমার সম্পর্কে লেখা। এইসব ছাড়া না-কি ডিভোর্স মামলা টেকে না। কাজেই বাধ্য হয়ে লিখতে হয়েছে। তুমি কিছু মনে করো না। যে সব অভিযোগ তোমার সম্পর্কে করা হয়েছে তা সবই মিথ্যা। সেটা তুমি যেমন জান, আমিও জানি।
হোসেন সাহেব আবারো বললেন, সাবেরা তুমি কি বলছো?
সাবেরা বলল, রাখি, কেমন?
হোসেন সাহেব দুঘণ্টার মত চেয়ারে বসে রইলেন। তারপর উঠে দাঁড়াতে গিয়ে টেবিলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেন। বাসায় ফিরে সাবেরাকে আর দেখলেন না।
উকিলের চিঠি পেলেন তার পরদিন। সাবেরা তার বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে। চরিত্রহীনতার অভিযোগ এনেছে। কাজের মেয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের কথা বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। এবং এই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে বাদী স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের আবেদন করেছে।
এতবড় একটা ঘটনা নিয়ে চিন্তা করার মত সময় হোসেন সাহেব পেলেন না–বাসায় ফিরে শোনেন সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে সাজ্জাদ গড়িয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে আছে। তার নাক দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। বাসায় সাবেরা নেই। কাজের লোক, মালি, এরা ছোটাছুটি করছে–কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না। পরবর্তী সাতদিন হোসেন সাহেব প্রচণ্ড ঘোরের মধ্যে কাটালেন। ছেলে অচেতন–ডাক্তার সন্দেহ করছে ব্রেইন হেমারেজ। অপারেশন করার মত সাহসও পাচ্ছে না। ছেলের স্বাস্থ্য খুব খারাপ। অথচ অপারেশন করে মস্তিকে জমে যাওয়া রক্ত পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয় দিনের দিন অপারেশন হল। সাধারণত যে কোন অপারেশনের পর সার্জন বলেন, অপারেশন সাকসেসফুল। সাজ্জাদের বেলায় বললেন, কিছু বুঝতে পারছি না! আমার যা করার করেছি, কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না। পঞ্চম দিনের দিন সে চোখ মেলে তাকালো। তারপরের দিন বলল–আন্মু কোথায়?
সাবেরা ছিল না। ছেলের এমন ভয়াবহ সমস্যার কথা তার না জানার কথা না। জেনেও সে আসেনি বা যোগাযোগের চেষ্টা করেনি। হোসেন সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সাবেরার উকিল। মোটাসোটা একজন মানুষ। ভালমানুষ টাইপ চেহারা। হাসিখুশি স্বভাব। উকিল সাহেবের বক্তব্য হচ্ছে–মামলা কোটে উঠলে নানান সমস্যা হবে। মান সম্মানের প্রশ্ন। মান সম্মান অনেক বড় ব্যাপার।
হোসেন সাহেব বললেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সবই মিথ্যা–কাজেই মানসম্পমানের প্রশ্ন আসছে না।
অভিযোগ মিথ্যা সেটা আপনি জানেন, আপনার স্ত্রী জানেন। কোিট তো জানে না। কোট বিচার করবে। সাক্ষ্য-প্রমাণ।
কি সাক্ষ্য-প্রমাণ?
যে কাজের মেয়েটির সঙ্গে আপনার অবৈধ সম্পর্ক ছিল এবং যে সম্পর্কের কারণে সে গৰ্ভবতী হয়ে পড়ে সেই মেয়ে সাক্ষ্য দিবে। যে ক্লিনিকে গর্ভপাত করানো হয়েছে–সেই ক্লনিকের ডাক্তার সাক্ষ্য দেবে। টাকা পয়সা খরচ করলেই আজকাল সাক্ষী পাওয়া যায়। কি করবেন বলুন–সময় বদলে গেছে। এই জন্যেই বলছি মিউঁচুয়েল এগ্রিমেন্টে চলে আসুন। দুজন এক সঙ্গে গিয়ে কাগজপত্রে সই করে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলুন।
আমি সাবেরার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
উনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান না। উনি কিছুই চান না, চাইলন্ড কাস্টডিও চান না। উনার নামে যে বাড়িটা আছে তাও চান না। উনি শুধু চান সম্পমানজনক নিষ্পত্তি।
হোসেন সাহেব দীর্ঘ সময় ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন–আচ্ছা, ঠিক আছে।
উকিল সাহেব পকেট থেকে কাগজের তাড়া বের করে বললেন–স্যার, আপনাকে কোথাও যেতেও হবে না। এইখানে সই করলেও হবে।
হোসেন সাহেব সই করলেন। উকিল সাহেব বললেন, পড়ে দেখবেন না? পড়ে দেখুন–টার্মস এন্ড কন্ডিশনস।
না, পড়তে হবে না।
সাবেরার সঙ্গে তার কোন যোগাযোগ নেই। তিনি জানেন সে ঢাকা শহরেই আছে। কোথায় আছে সেই ঠিকানাও তিনি জানেন। টেলিফোন নাম্বার জানেন। মাঝে মাঝে খুব গোপনে সেই নামারে টেলিফোন করেন। বেশির ভাগ সময় শ্লেষ্মা মিশানো বয়স্ক এক ভদ্রলোকের গলা শোনা যায়–হ্যালো, কে?
তিনি খট করে টেলিফোন নামিয়ে দেন। হঠাৎ হঠাৎ এক-আধাদিন সাবেরা টেলিফোন করে। অতি চেনা গলায় বলে, হ্যালো।
তাঁর খুব বলতে ইচ্ছে করে–কেমন আছ সাবেরা? বলা হয় না। মানুষ তার সবচে জরুরী কথাগুলিই আসলে কখনো বলতে পারে না।
বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে
বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে।
