বাবা, আমি রাখি।
নীতু বলছিল গুলশানে নতুন একটা জাপানি রেস্টুরেন্ট খুলেছে। ওর কাছে টেলিফোন নাম্বার আছে। বুকিং দিয়ে রাখি?
রাখ।
কাচা মাছ-ফাছ খাওয়ায় কিনা কে জানে। জাপানিবা তো আবার কাচা মাছ খাওয়ার ব্যাপারে ওস্তাদ।
বাবা, এখন রেখে দেই।
আচ্ছা। তুই কিন্তু আতাহারকে একটা খবর দিস। তুই চাকরি শুরু করছিস। আনন্দের একটা ব্যাপার। এই আনন্দ বন্ধু-বান্ধব সবাইকে নিয়ে শেয়ার করা দরকার। সে অবশ্যি মনে কষ্ট পাবে। তোর এত ভাল চাকরি হল তার কিছু হল না। মনে কষ্ট পাবারই কথা। দেখি তার জন্যে কিছু করা যায় কিনা।
বাবা, আমি রাখলাম।
সাজ্জাদ টেলিফোন নামিয়ে রাখল। চুপচাপ বসে থাকতেও ভাল লাগছে না। জানালা খোলা থাকলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা যেত। জানালা বন্ধ। জানালায় ভারি পদা টান। কবিতা লেখার চেষ্টা কি করবে? না, নতুন কিছু লেখা যাবে না। প্রিয় ইংরেজ্বি কবিতার অনুবাদের চেষ্টা করা যেতে পারে। রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। কোন কবিতাই পুরোটা মনে নেই। চার লাইন, ছলাইন।
অফিসের একটা ব্ল্যাক ইংরেজ কবিদের বইয়ে ভর্তি করে ফেলতে হবে। বাংলা কবিতার বই একটাও রাখা যাবে না। মালিন্টন্যাশনাল কোম্পানীর লোকজন অফিস ঘরে বাংলা কবিতার বই দেখলে সন্দেহজনক চোখে তাকবেন। ইংরেজ্বি কবিতার বই দেখলে কিছু মনে করবেন না। বরং রুচি, মেধা ও মননের প্রশংসা করবেন।
These pools that, though in forests still reflect
The total sky almost without defect,
And like the flowers beside them, chill and shiwer,
Will like the flowers beside then soon be gone,
And yel not out by any brook or river,
But up by Tools to bring dark foliage om
‘বনের মাঝে মাঝে কাকচক্ষু জলের আভাস
সেই জলে বাস করে পরিপূর্ণ সমগ্র আকাশ।’
আভাসের সঙ্গে আকাশের মিল ঠিক আছে। তবে জলে প্রতিফলন হয়ের জায়গায় বাস করে বলাটা কি ঠিক হচ্ছে? প্রতিফলন এবং বাস করা কি এক অর্থে নেয়া যায়?
সাজ্জাদ ভুরু কুঁচকে বসে রইল। একটা বেজে গেল। ইউনুস সাহেব দরজা খুলে উকি দিলেন। স্যার, লাঞ্চের সময় হয়েছে। এখন খাবেন?
সাজ্জাদ কঠিন গলায় বলল, খবৰ্দার, বিরক্ত করবেন না। ইউনুস সাহেব চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। তিনি ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছেন না।
প্ৰচণ্ড মাথা ধরেছে। কাউকে টেলিফোন করতে ইচ্ছা করছে। কাকে টেলিফোন করবে? এমন কাউকে যার সঙ্গে কথা বললে মাথা ব্যথা কমে যায়। লীলাবতীকে করা যায়। লীলাবতীর নাম্বারটা যেন কি?
সাজ্জাদ কিছুতেই নাম্বারা মনে করতে পারল না।
সন্ধ্যা থেকে হোসেন সাহেব সেজেগুজে বসে আছেন। জাপানি রেস্টুরেন্টে চারজনের বুকিং নেয়া হয়েছে। তিনি, নীতু, সাজ্জাদ এবং আতাহার। রেস্টুরেন্টে খেতে বসে কি কি গল্প করবেন মনে তার একটা তালিকাও তিনি তৈরি করেছেন। খেতে বসে হালকা গলাপ করতে ভাল লাগে। মজার মজার রসিকতা, এনেকডোটস। আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি করা। তার হাতে এক হাজার পৃষ্ঠার বিশাল এক বই। বইটির নাম পার্টি জোকস। অনেকগুলি রসিকতা এর মধ্যেই তিনি পড়ে ফেলেছেন। কোনটিতেই তেমন হাসি আসছে না।
নীতু এসে চা দিয়ে গেল। হোসেন সাহেব বললেন, কি রে, তুই সাজগোজ করলি না? নীতু বলল, ভাইয়া আগে আসুক তারপর সাজব। আমার সাজতে সময় লাগে না। সুন্দর মেয়েরা অনেক সময় নিয়ে সাজে। অসুন্দররা সাজে ঝটপট।
তুই অসুন্দর কে বলল? তোর গায়ের রঙটা একটু চাপা। সৌন্দর্য মানুষের গায়ের রঙে না। সৌন্দর্য যদি গায়ের রঙে হত তাহলে শ্বেত কুণ্ঠ যারা শরীরে নিয়ে ঘুরছে তারা হত সবচে সুন্দর মানুষ।
নীতু বিরক্ত গলায় বলল, সৌন্দর্য নিয়ে তোমার সঙ্গে আলাপ করতে ইচ্ছা করছে না বাবা।
যা, রেডি হয়ে নে।
বাবা, আমার মনে হচ্ছে ভাইয়া আসবে না। আটটা বেজে গেছে এখনো যখন আসেনি। আজ বাইরে খেতে যাবার কথা বোধহয় ভুলে গেছে।
ভুলবে কেন? দুপুরেই তার সঙ্গে কথা বললাম।
তারপরেও ভুলে গেছে। আমার ধারণা সে পথে পথে ঘুরছে। কিম্বা কোন পাকে বসে কবিতা নিয়ে ভাবছে।
তুই কাপড় পর তো মা, ও চলে আসবে।
নীতু কাপড় বদলাতে গেল। রাত নটার সময় হোসেন সাহেব মোটামুটি নিশ্চিত হলেন–সাজ্জাদ। আসবে না। তিনি তারপরেও বারান্দায় বসে রইলেন।
একা একা অন্ধকারে বসে থাকা বিরক্তিকর ব্যাপার। মশা কামড়াতে থাকে। ইদানীং মশাদের চরিত্রে পরিবর্তন ঘটেছে–তাদের কামড় আগের মত ভদ্র না। কামড়বার সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা ফুলে ওঠে–এবং অনেকক্ষণ ধরে চুলকাতে থাকে। আগে দিনের বেলায় মশা কামড়াতো না, এখন দিনেও কামড়ায়। মশা নিয়ে পৃথিবীর কোথাও কি রিসার্চ হচ্ছে? রিসার্চ হলে এই ব্যাপারটা নিশ্চয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হত।
হোসেন সাহেব বারান্দায় পা গুটিয়ে বসে আছেন। তাঁর সামনে ছোট্ট একটা টেবিল। এই টেবিলে তার পা রাখার কথা। সেখানে মশা তারানোর স্তেপ্রা। তিনি তার চারদিকে স্প্ৰে করে মশার অযুধ দিয়েছেন। অষুধে সম্ভবত কোন ভেজাল আছে। মশা আরো বেশি বেশি আসছে। শুধু মশা না— মশার মত দেখতে অন্যান্য পোকারাও আসছে।
পৃথিবীতে হাজারো রকমের ইনসেকটিসাইড। তার পরেও পোকার সংখ্যা এত বাড়ছে কেন? পোকাগুলির বুদ্ধিও মনে হয় বাড়ছে। এক সময় পৃথিবীটা কি পোকাদের দখলে চলে যাবে? পোকারা মানুষ মারার স্ত্ৰে বের করে সমানে মানুষ মারতে থাকবে। এই যে তিনি বারান্দায় বসে আছেন–পোকারা তাকে দেখতে পেয়ে এক বোতিল স্পেপ্ৰ নিয়ে এসে ফুস করে তার নাকে ছেড়ে দিল।
