জ্বি না।
তুমি করে বলার আমার রাইট আছে। আমাকে তত বুড়ো না দেখালেও আমি কিন্তু যথেষ্টই বুড়ো। আমার বড় মেয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়–ডঃ ইয়াসমিন। কাজেই আমার বয়স আন্দাজ করে নাও। সিক্সটি থ্রি।
সাজ্জাদ কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলল, আমি কিন্তু কোন কাজকর্ম জানি না। এরনস ইন্টারন্যাশনাল ব্যাপারটা কি তাও জানি না।
সবই জানবে। অতি দ্রুত জানবে। এটা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী। এদের অনেক রকম ব্যবসা–আলপিন তৈরি করা থেকে জাহাজ বানানো সবই করে। ইনসেকটিসাইডের ব্যবসা আছে, ফার্মাসিউটিক্যালস আছে। এরা বাংলাদেশে এসেছে। ফার্মাসিউটিক্যালস নিয়ে। অসুখ-বিসুখের দেশ তো, কাজেই অষুধ বিক্রি করতে চায়। দশকোটি মানুষের কাছে অষুধ বিক্রি তো সহজ কথা না। লালে। লাল হবার কথা। তুমি কি সিগারেট খাও সাজ্জাদ?
জ্বি, খাই।
এই অফিসটা টোবাকো ফ্রী। তবে তুমি খেতে পার। আমার ঘরে অনুমতি আছে। আমি চুরুট খাই।
সাজ্জাদ সিগারেট ধরালো। রকিব সাহেব চুরুট ধরলেন। গলার স্বর নিচু করে বলতে লাগলেন–মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানীতে কর্পোরেট পজিশনে চাকরি করা খুব আরাম। প্রচুর টাকা। প্রচুর সুযোগ-সুবিধা। বৎসরে একবার কোম্পানীর খরচে ফ্যামিলি নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা যেখানে যেতে চাও যাবে। হলিডে কাটিয়ে আসবে। এরা টাকা চুষে নেয়। সেই চোষা টাকার খানিকটা দিয়ে যায় যারা টাকা চুষতে সাহায্য করে তাদের। বুঝতে পারছ?
পারছি।
প্রচুর খাটনি। তবে এরা খাটনি পুষিয়ে দেয়। চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে গাড়ি পাবে। ফার্নিসড় ফ্ল্যাট পাবে। একজন কুক, একজন মালি পাবে। অসুখ-বিসুখে আমেরিকান হসপিটালে চিকিৎসার সুবিধা পাবে। কাশি হয়েছে, সারছে না। চলে যাও সিঙ্গাপুর। সেখানে আমেরিকান হাসপাতাল আছে। এসো আমার সঙ্গে, তোমার ঘর দেখিয়ে দি।
সাহেবকে দায়িত্ব দিয়ে দিচ্ছি, ইনি তোমাকে হাতে-কলমে সব বুঝবেন। খুব এফিসিয়েন্ট লোক।
সাজ্জাদ দুপুর বারোটার মধ্যে নিজের ঘরে স্থায়ী হল। সুন্দর ঘর। ইউনুস সাহেব প্রবল আগ্রহে সব বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
স্যার, এই টে। একটা ডিরেক্ট লাইন, আরেকটা পিবিএক্স। ফ্যাক্স এইখানে। আইবিএম কম্পিউটার আছে। অফিসের সব কম্পিউটারের সঙ্গে এটা যুক্ত। তবে আপনার ঘরে কোন প্রিন্টার নেই। ফটোকপিয়ার আছে।
সাজ্জাদ হাই তুলতে তুলতে বলল, অনেক কিছুই দেখি আছে। কি নেই সেটা বলুন।
ইউনুস সাহেব দাঁত বের করে হাসলেন। ফেন অফিসে সব কিছু থাকার পুরো কৃতিত্ব তার।
ইউনুস সাহেব!
জ্বি স্যার।
দুপুরে খাবার ব্যবস্থা কি?
আমাদের ক্যান্টিন আছে। সাবসিডাইজ ফুড সার্ভিস। খুবই ভাল। রান্নাও ভাল। চাইনীজ, ইংলিশ, বেঙ্গলী সব ধরনের খাবার পাওয়া যায়।
ভাল। ভেরী গুড।
আজ প্রথমদিন আপনি স্যার রিল্যাক্স করুন। অফিস ঘুরে দেখুন। কাল থেকে ইনশাল্লাহ আমরা কাজ শুরু করব। ইচ্ছা করলে আজ স্যার আপনি বাসায়ও চলে যেতে পারেন।
আপনাদের অফিস ছুটি হয় কখন?
চারটার সময়। সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা। মাঝখানে একটা থেকে দুটা পর্যন্ত লাঞ্চ ব্রেক। শুক্র, শনি এই দুদিন ছুটি।
সপ্তাহে দুদিন ছুটি? ভালই তো।
ইউনুস সাহেব। আবার দাঁত বের করে হাসলেন। যেন সাপ্তাহিক দুদিন ছুটির ব্যবস্থা তিনিই করেছেন।
ইউনুস সাহেব!
জ্বি স্যার।
আপনি যান, আপনার কাজ করুন। লাঞ্চের সময় এসে আমাকে নিয়ে যাবেন। দুজন একসঙ্গে লাঞ্চ করব।
জ্বি আচ্ছা স্যার। আপনার পার্সোনাল একজন পিওন আছে। মতি নাম। বেল টিপলেই সে আসবে। চা-টা কিছু লাগলে এনে দেবে।
আচ্ছা, ঠিক আছে।
ইউনুস সাহেব বিদেয় নিলেন। সাজ্জাদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। অফিসের এই চাকরি সে করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। জানালা বন্ধ বলেই কি দমবন্ধ লাগছে? জানালা খোলা যাবে না। সেন্ট্রালি এয়ারকন্ডিশন্ড বাড়ির জানালা খোলা যায় না।
পিঁ-পিঁ করে টেলিফোন বাজছে। সাজ্জাদের কাছে কেউ টেলিফোন করবে না। এই অফিসের নাম্বার কারোর জানার কথা নয়। সে নিজেই জানে না। সাজ্জাদ রিসিভার হাতে নিল।
হ্যালো।
স্যার, আমি রিসিপশান থেকে বলছি–লীলা।
ও আচ্ছা, কি ব্যাপার?
আপনার একটা টেলিফোন এসেছে। দেব?
সাজ্জাদ টেলিফোন কানে নিয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণ বাজনা বাজল, তারপর হঠাৎ মনে হল। লাইন কেটে গেছে। সাজ্জাদ যখন রিসিভার নামিয়ে রাখতে যাচ্ছে তখন হোসেন সাহেবের গলা শোনা গেল—
সাজ্জাদ।
জি।
জয়েন করেছিস?
হ্যাঁ।
কেমন দেখছিস?
ভাল।
সবার সঙ্গে পরিচয়-টরিচয় হয়েছে?
আস্তে আস্তে হচ্ছে।
তারা তোকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করছে তো?
সেটা তো বুঝতে পারছি না। তুমি আমার নাম্বার পেলে কোথায়?
সে এক বিরাট ইতিহাস। হয়েছে কি…
আচ্ছা বাবা, তোমার ইতিহাস বাসায় এসে শুনব।
ব্যস্ত আছিস?
হ্যাঁ, ব্যস্তই আছি।
গুড। ভেরী গুড। জীবনে উন্নতি করতে হলে ব্যস্ত থাকতে হবে। যে যত ব্যস্ত তার জীবন তত উন্নত। ভাল কথা–আতাহারের টেলিফোন নাম্বার জানিস?
ওর কোন টেলিফোন নেই।
বাসার ঠিকনা?
বাসা কোথায় জানি। ঠিকানা জানি না। ওকে দরকার কেন?
ভাবছি, তোর চাকরিতে যোগ দেয়া উপলক্ষে কোন ভাল রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাব। আইডিয়া কেমন?
ভাল।
তুই কি অফিস থেকে ফেরার পথে ওকে একটা খবর দিয়ে আসতে পারবি?
পারব।
নীতু অবশ্যি বলছিল ওকে বাদ দিতে। সে চাচ্ছে শুধু নিজেরা নিজেরা যেতে। আমি চাচ্ছি। ওকে সঙ্গে নিতে। ছেলেটাকে আমার খুবই পছন্দ। এ ভেরি গুড বয়।
