চাকরি করতে যাওয়া কোন শুভ কাজ না বাবা।
সজিদ বাবাকে সালাম করল–সঙ্গে সঙ্গে হোসেন সাহেবের চোখে পানি এসে গেল। মাত্র সেদিনের কথা–কত ছোট্ট ছিল সাজ্জাদ! রোগা-ভোগা চেহারা। সামান্য কিছুতেই ভয়ে অস্থির হয়ে উঠত। প্রথম দিন স্কুলে নিয়ে গেলেন, সাজ্জাদ বাঁদরের বাচ্চার মত গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলতে লাগল। কিছুতেই গলা ছাড়বে না। কান্না না, চিৎকার না, হৈ চৈ না। শুধু গলা জঁড়িয়ে ধরে থাকা। কাঠি কাঠি হাত। কিন্তু কি প্রচণ্ড শক্তি সেই হাতের! অনেক কষ্টে ছেলের হাত ছাড়িয়ে তাকে স্কুলে দিয়ে তিনি স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন। সেদিনও তার চোখে পানি এসেছিল।
ক্লাস ফোরে। যখন পড়ে তখনকার কথা। ভূতের কি একটা বই পড়েছে। প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। একা ঘুমাবে না–বাবার সঙ্গে ঘুমাবে। বাবার পাশে বালিশে শোবে না। বাবার বুকের উপর শুয়ে থাকবে। হোসেন সাহেব বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, শুয়ে থোক।
সেই ছেলে আজ চাকরি করতে যাচ্ছে। বিরাট বড় পোস্ট। চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে তিনি অনেক ধরাধরি করেছেন এটা ঠিক। তবে তার ছেলে মাকাল ফল নয়, এটাও ঠিক। এই ছেলে রেকর্ড মার্কস নিয়ে ছেলেমেয়ে সবার মধ্যে ফার্স্ট হয়েছিল। দেশের সব কটা খবরের কাগজে তার ছবি ছাপা হয়েছে। সাজ্জাদের সঙ্গে তার ছবিও ছাপা হয়েছে।
ইন্টারমিডিয়েটে সাজ্জাদ কোন রকমে ফার্স্ট ডিভিশন পেল। লেটার, স্টার কিছু নেই। তিনি হতভম্ব হয়ে বললেন, সাজ্জাদ বাবা, কি হয়েছে রে? সাজ্জাদ হাসিমুখে বলল, গাড্ডু খেয়েছে।
গাড্ডু খেলি কেন?
সাজ্জাদ আবারো হাসল। আনন্দের হাসি। যেন গাড্ডু খাওয়ার মত আনন্দ আর কিছু নেই। হোসেন সাহেব ভয়ংকর মন খারাপ করলেন।
সেই মন খারাপ ভাব দূর হল যেদিন ফিজিক্স অনার্সের ফল বেরুল। সাজ্জাদ আবার মেট্রিকের মত রেজাল্ট করেছে। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। তবে পত্রিকাওয়ালাদের কাছে এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ না। এই পরীক্ষার ফার্স্ট হওয়া ছেলেমেয়ের ছবি ছাপা হয় না। হোসেন সাহেব বিজ্ঞাপন হিসেবে তিনটা পত্রিকায় ছবি ছাপার ব্যবস্থা করলেন। সাজ্জাদ এম. এসসি. পরীক্ষ দিল না। তার নাকি পরীক্ষা দিতে আর ইচ্ছা করছে না। বড় অদ্ভুত ছেলে! উঠার ঘরে এরকম ছেলে কি করে হল কে জানে?
সাজ্জাদের পরনে সাদা প্যান্ট। গায়ে কমলা রঙের স্বল্টাইপ দেয়া হাফ হাওয়াই শািট সে অফিসে ঢুকেছে হাসিমুখে। অফিসটা তার পছন্দ হয়েছে। সবকিছু ঝকঝকি করছে। মেঝেতে নিশ্চয় ফ্লোর পালিশ দেয়া। মেঝে আয়নার মত চকচক করছে। মনে হয় পুরো বাড়ি সেন্টালি এয়ারকন্দ্রিশান্ড। কোথাও কোন ফ্যান দেখা যাচ্ছে না–অথচ শীত শীত লাগছে।
অফিসের চরিত্র বোধহয় এখন পাল্টে গেছে। আগে যে কোন অফিসে ঢুকলে কানে আসত টাইপ রাইটারের খট খট শব্দ, নাকে আসত। সস্তা সিগারেটের উৎকট গন্ধ।
সাজ্জাদের কানে টাইপ রাইটারের খট খট শব্দ আসছে না। সিগারেটের গন্ধও নেই। সম্ভবত পুরো বাড়ি ধূমপান মুক্ত। কোথাও অবশ্যি এ জাতীয় কোন সাইনবোর্ড নেই। হোটেলের রিসিপশনের মত একটা কাউন্টারে জনৈক তরুণীকে দেখা যাচ্ছে। তার সামনে–INQUIRY
সাজ্জাদ মেয়েটির দিকে এগোল। সে কম্পিউটার নিয়ে এতই ব্যস্ত যে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে অস্বস্তি লাগছে। সাজাদ র্দাড়িয়ে রইল। একসময় না একসময় মেয়েটির ব্যস্ততা কমবে, তখন তার সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
আপনার প্রয়োজন কি জানতে পারি?
সাজ্জাদ হাসিমুখে বলল— এই অফিসের প্রধান ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছি।
প্রধান ব্যক্তি বলতে আপনি কি বুঝাচ্ছেন?
যাকে বলে বাস।
আপনি কি রকিব সাহেবের কথা বলছেন?
হ্যাঁ, রকিব সাহেব হতে পারেন।
উনার সঙ্গে কি আপনার কোন এপয়েন্টমেন্ট আছে?
জ্বি-না।
এপয়েন্টমেন্ট ছাড়া উনার সঙ্গে দেখা হবে না।
তাহলে নেক্সট যিনি আছেন তার সঙ্গে কি দেখা করা যাবে?
কি জন্যে দেখা করতে চান সেটা কি আমাকে বলা যাবে? Maybe I can help.
আমার নাম সাজ্জাদ। এরনাস ইন্টারন্যাশনালে আমার একটা চাকরি হয়েছে। জয়েনিং রিপোর্ট দিতে চাই। কি ভাবে কি করব বুঝতে পারছি না।
স্যার, আপনার নাম কি সাজ্জাদ হোসেন?
জ্বি।
কি আশ্চর্য স্যার, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। আসুন, আপনাকে রকিব স্যারের কাছে নিয়ে যাই। উনি আজ সকালেও আপনার প্রসঙ্গে জানতে চাচ্ছিলেন। আপনি জয়েন করছেন না কেন তা নিয়ে উনি চিন্তা করছিলেন। স্যার ভেবেছেন, আপনি বোধহয় এপয়েন্টমেন্ট লেটার পাননি। আমাকে মেইল লিস্ট চেক করতে বললেন।
ও, আচ্ছা।
আপনাকে আসতে হবে না।
আমাকে ঘরটা দেখিয়ে দিলেই হবে।
জ্বি না। স্যার, আসুন।
অফিসের বাস সম্পর্কে যেসব ধারণা থাকে–রকিব সাহেবকে তার কোনটির সঙ্গেই সাজ্জাদ মিলাতে পারল না। একজন বয়স্ক হাসি-খুশি মানুষ। সাজ্জাদের পরিচয় শুনে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন–আরো ইয়াং ম্যান এসো, এসো। আজ সকালেই তোমার কথা হচ্ছিল। লীলাকে বললাম–লীলা, দেখ তো আমাদের নিউ রিক্রটের কি হল। আমার তো মনে হচ্ছে সে চিঠি পায়নি।
সাজ্জাদ বলল, চিঠি আগেই পেয়েছি। জয়েন করতে দেরি করে ফেলেছি। দেরি করলে কেন বল তো? এইসব চাকরির জন্যে সবাই হা করে বসে থাকে। তুমি পেয়েও আসছে না। আশ্চর্য! চা খাও— নাকি কফি খাবে?
একটা হলেই হবে।
বেশ, তাহলে কফি খাওয়া যাক। খুব ভাল কফি আছে। দাঁড়াও, দিতে বলছি। তুমি করে বলায় রাগ করছ না তো?
