সন্ধ্যাবেলা দি গ্রেট গনির কাছে যাবার সময় আবদুল্লাহ সাহেবের লোহালক্কড়ের দোকান হয়ে যেতে হবে। ভদ্রলোককে দুটা খবর দেয়ার আছে–এক, ঐদিন বৃষ্টি রাত দশটায় থামেনি। রাত দেড়টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। দুই, তার ছাতাটা হারিয়ে গেছে। আবদুল্লাহ সাহেবের দোকানটার কি যেন নাম— কার্ড দিয়েছিলেন। কার্ডে লেখা ছিল–ও হ্যাঁ, লৌহ বিতান। নামটা ভাল হয়নি। লোহাঘর হলে ভাল ছিল। পিঠাঘরের মত লোহাঘর। আবদুল্লাহ সাহেবের বুড়ে কর্মচারিটার নাম যেন কি? ইন্টারেস্টিং বৃদ্ধ।
ইন্টারেস্টিং ধরনের মানুষদের আশেপাশে যারা থাকে তারাও ইন্টারেস্টিং হয়ে থাকে। বুড়াকে নিয়ে লেখা কবিতাটা সুবৰ্ণকে দিয়ে এলে কেমন হয়?
এক জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ ছিলেন নিজ মনে
আপন ভুবনে
জরার কারণে তিনি পুরোপুরি বৃক্ষ এক।
বাতাসে বৃক্ষের পাতা কাঁপে
তাঁর কাপে হাতের আঙ্গুল।
বৃদ্ধের সহযাত্রী জবুথবু—
পা নেই, শুধু পায়ের স্মৃতি পড়ে আছে…
আতাহার সিদ্দিকের খোঁজে বের হয়েছে। ঢাকা ক্লাবের সামনে পানের দোকানে খোঁজ করতে হবে। এইসব কাজ ভাল পারত মজিদ। মজিদ দলছুট হয়ে পড়েছে। নেত্রকোন। গার্লস কলেজে। সে এখন ইতিহাসের অধ্যাপক। ফাজলামির একটা সীমা থাকা দরকার। রুম ভর্তি সাজুগুজু, তরুণী। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। মজিদ গম্ভীর গলায় পড়াচ্ছে মোঘল পিরিয়ডে ভারতের অবস্থা। ভাবাই যায় না। এই মজিদ গাঁজা খেয়ে নেংটো হয়ে সারা রাত দি গ্রেট গনির বারান্দায় বসে ছিল। কবিতা না ছাপা পর্যন্ত কাপড় পড়বে না। গনি সাহেব কবিতা ছেপেছিলেন। শুধু যে কবিতা ছাপিয়েছিলেন। তাই না–কবিতার সম্মানী বাবদ পঞ্চাশটা টাকা দিয়ে বলেছিলেন–যাও, গাঁজা কিনে খাও। শুধু একটা জিনিস মনে রেখো, গাঁজা খেয়ে কবিতা লেখা যায় না। গাঁজা থেকে যে জিনিস বের হয় তার নাম–গাঁজিতা, কবিতা না।
মজিদ হাসিমুখে বলেছিল, আংকেল, সমাজে যেমন কবিতার দরকার আছে তেমন গাঁজিতারও দরকার আছে। আমি সমাজের দিকে তাকিয়ে কাজটা করছি। কাউকে না কাউকে তো অপ্রিয় কাজটা করতে হবে।
দি গ্রেট গনিকে আংকেল ডাকার দুঃসাহস একমাত্র মজিদেরই ছিল।
মেঘলা দিনে পুরানো বন্ধুদের কথা মনে হয়। আজ আবার মেঘলা করেছে। যে হারে এ বছর বৃষ্টি-বাদল হচ্ছে–ভয়াবহ বন্যা না হয়েই যায় না। পুরো ঢাকা শহর চলে যাবে পোচ হাত পানির নিচে। পানির উপর ভেসে থাকবে দালান-কোঠা। ঘরবাড়ির জানালা থেকে আসা টিউব লাইটের আলো পড়বে পানিতে। তরুণীরা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদাস চোখে পানি দেখবে। মেয়েদের সঙ্গে পানির গোপন কোন সম্পর্ক আছে। মেয়েরা পানি দেখলেই উদাস হয়। কে জানে পানিও হয়ত মেয়েদের দেখলে উদাস হয়। হৃদয় নামক বস্তু শুধু মানুষের থাকবে, জড় জগতের থাকবে না, তা হয় না।
অফিসে সাজ্জাদের প্রথম দিন
অফিসে আজ সাজ্জাদের প্রথম দিন। সে সারা জীবন শুনে এসেছে। দশটা-পাঁচটা অফিস। এখানে এসে দেখছে আটটা-চারটা। প্রথম দিনেই দু ঘন্টা লেট। প্রথম দিনে অনেক কিছু র চোখে দেখা হয়। দুঘণ্টা দেরিও নিশ্চয় ক্ষমার চোখে দেখা হবে। অফিসে পা দিয়ে কি করতে হবে না করতে হবে হোসেন সাহেব ছেলেকে ভালমত বুঝিয়ে দিয়েছেন–প্রথমেই চলে যাবি অফিসের যিনি প্রধান ব্যক্তি তার ঘরে। নিজের পরিচয় দিবি। তারপর বলবি, Sir, with permission I intend to join today.
ইংরেজিতে বলতে হবে?
ভদ্রলোক বাঙালী হলে বাংলায় বলতে পারিস। তবে মালিন্টন্যাশনাল কোম্পানি। সম্ভাবনা শতকরা ৯০ ভাগ যে, অফিসা—বস হবেন বিদেশী।
সে ক্ষেত্রে আমাকে বলতে হবে–Sir, with your kind permission I intend to join today,
হ্যাঁ। ভাল কথা, তুই মিটমিটি হাসছিস কেন?
তুমি যেভাবে আমাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পাঠাচ্ছ তাতেই হাসি আসছে। আমি স্মার্ট একটা ছেলে। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি।
হোসেন সাহেব সরু চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ছেলের কথা তার পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছে না–আবার অবিশ্বাসও হচ্ছে না। ছেলেটা দেখতে তার মার মত–স্বভাব-চরিত্র মার মত নয়। বাবার মতও নয়। অন্য কারোর স্বভাব নিয়ে সে পৃথিবীতে এসেছে। অথচ বৈজ্ঞানিক নিয়মে তাঁর অর্ধেক স্বভাব, তার মার অর্ধেক স্বভাব পাওয়ার কথা। ছেচল্লিশটা ক্রমেজমের ভেতর তেইশটা আসে মার কাছ থেকে, তেইশটা অসে বাবার কাছ থেকে।
সাজ্জাদ। বলল, বাবা, আমি রওনা হয়ে যাই।
হোসেন সাহেব বললেন, এক কাজ করলে কেমন হয়–আমিও বরং তোর সঙ্গে যাই।
তুমি যাবে কেন?
তোকে অফিসে দিয়ে এলাম, তোর অফিসটা দেখলাম। তোর যে বাস। উনার সঙ্গে এক কাপ চা খেলাম।
সাজ্জাদ বলল, বাবা, আমার মনে হয় তোমার,ব্লেনে শর্টসার্কিট হয়ে গেছে। তুমি আমাকে হাত ধরে অফিসে নিয়ে যাবে? এই উদ্ভট চিন্তা তোমার মাথায় এল কি ভাবে? আমাকে অফিসে দিয়ে আসবে এটা কখন ঠিক করেছ? কাল রাতে?
আরে না। এখন মনে হচ্ছে তোর সঙ্গে গেলে মনপা হয় না।
তোমার এখন মনে হয়নি। তুমি জামাই সেজে বসে আছা সকাল থেকে। হোসেন সাহেব অস্বস্তির সঙ্গে কাশলেন। সাজ্জাদের সঙ্গে অফিসের ভেতর ঢোকার তার কোন পরিকল্পনা ছিল না। তবে তিনি ভেবে রেখেছিলেন–সাজ্জাদের সঙ্গে গাড়ি করে যাবেন, তাকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে আসবেন।
বাবা যাই?
আচ্ছা। সালাম করে যা। শুভ কাজে যাচ্ছিস, মুরুঝবীদের দোয়া নিবি না?
