উৎসাহ পাওয়ার জন্যেও তো দু-একটা কবিতা ছাপা হওয়া দরকার।
উৎসাহটা আসতে হবে প্ৰাণের ভেতর থেকে। ছাপা টাইপ থেকে না।
কবিতা না ছাপিয়ে ট্রাংক ভর্তি করে রাখারও তো কোন অর্থ হয় না। জীবনানন্দ দাশ যদি তাঁর কোন কবিতা না ছাপাতেন তাহলে তো আমরা জানতেই পারতাম না–এতবড় একজন কবি আমাদের মধ্যে আছেন।
গনি সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, তোমরা কি পেয়েছ জীবনানন্দ দাশের ভেতর আমি জানি না। যাই হোক, এই নিয়ে তর্ক করতে চাই না–অন্য কিছু বলার থাকলে বল।
এই সংখ্যায় আমার একটা কবিতা যাবে বলে বলেছিলেন–বাসর নাম।
বলেছিলাম না-কি?
জ্বি।
ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কিছু মনে করো না আতাহার, তুমি চলে যাবার পর কবিতোটা আবার পড়লাম।— কিছু হয়নি।
কিছু হয়নি?
যা হয়েছে সেটা না হবার মতই। বুঝতে পারছি মনে কষ্ট পোচ্ছ–তোমরা নিউ জেনারেশন পোয়েটস। তোমাদের উৎসাহ দেয়াও আমার দায়িত্ব। আচ্ছা, আরেকটা কবিতা রেখে যাও, দেখি বর্ষা সংখ্যায় দেয়া যায় কি-না। বর্ষা সংখ্যাটা ভাল মত বের করছি।
কবে দিয়ে যাব?
যত তাড়াতাড়ি পার। সম্ভব হলে রাতে বাসায় দিয়ে যেও।
তাহলে উঠি গনি ভাই?
আচ্ছা আচ্ছা। তোমরা আসা, কথা-টথা বলি–ভাল লাগে।
গনি সাহেব আন্তরিক ভঙ্গিতে হাসলেন। আতাহারও প্রাণপণ হাসার চেষ্টা করল। পারল না। হাসিটা কোথায় যেন বেজে গেল। গনি সাহেব বললেন, মুখটা এমন কালো কেন আতাহার? তোমাদের মুখ কালো দেখলে মনে কষ্ট পাই। বললাম তো বর্ষা সংখ্যায় ছেপে দেব। কথা দিলাম–আর কি চাও?
থ্যাংক য়্যু।
তোমার ঐ বন্ধুর খবর কি? সাজ্জাদ না নাম?
জ্বি।
অনেক দিন তাকে দেখি না। ওকে একটু দরকার ছিল। তোমার সঙ্গে কি দেখা হবে?
আপনি বললে এক্ষুণি দেখা করব।
তাহলে খুব ভাল হয়। ইন্ডিয়ান দুই লেখক আসছে–আমার বাসায় খেতে বলেছি। ওরা তো আবার জলযাত্রা ছাড়া কিছু বোঝে না। বাংলাদেশে তারা আসেই শুধু হুইস্পিকের লোভে। সাজ্জাদ। আবার জানে এইসব কোথায় পাওয়া যায়।
আমি বলব সাজ্জাদকে।
বলাবলি না, তুমি এক কাজ কর, সন্ধ্যাবেল ব্ল্যাক লেবেল একটা নিয়ে চলে এসো। সাজ্জাদের দুই-একটা কবিতা নিয়ে এসো। তোমাদের দুই বন্ধুকে এবার হাইলাইট করে দি। বক্স করে দুজনের দুটা করে মোট চারটা কবিতা। তুমি নতুন একটা কবিতা দিয়ে যেও আর দেখি বাসরটা ঠিকঠাক করে কিছু করা যায় কি-না।
আতাহার চুপ করে আছে। গনি সাহেব বললেন, সন্ধ্যায় চলে এসো। দেরি করো না।
দেরি করব না।
আরেকটা কথা শোন–তোমার ভালর জন্যে বলছি–প্রচুর পড়বে। তোমাদের কবিতায় এত ইরোটিক এলিমেন্ট অথচ আমি নিশ্চিত তোমরা বিদ্যাসুন্দর পড়নি। পড়েছ?
জ্বি-না।
অথচ আমাকে দেখা–আমি তো কবিতা লিখি না। কিন্তু আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুখস্থ বলে যেতে পারব—
“কি রূপসী অঙ্গে বসি অঙ্গ খসি পড়ে
প্ৰাণ দহে কত সহে নাহি রহে ধড়ে।।
মধ্যে ক্ষীণ কুচ পীণ শশহীন শশী
আস্যবর হাস্যোদর বিম্বাধর রাশি।।“
গনি সাহেব হাসিমুখে চুপ করলেন। আতাহার মনে মনে বলল–শালা বুড়া ভীম, তুই এই চার লাইনই জনিস।
গনি সাহেব আতাহারের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আতাহার বলল, শুনতে ভাল লাগছে, আরো বলুন।
আজ আর না। একদিনে বেশি শুনলে বদহজম হয়ে যাবে। বুঝলে আতাহার, পড়তে হবে, পড়তে হবে। আমাকে দেখ, ওলন্ড-এজ ডিজিজ। সব কটা ধরেছে, তারপরেও কোন রাতে তিন-চারটার আগে ঘুমুতে যেতে পারি না। কাল রাতে ঘুমুতে যাবার সময় শুনি ফজরের আজান পড়ছে।
বলেন কি?
কাব্বালা বিষয়ে একটা বই পড়ছিলাম–কাকবালাদের ব্যাপারটা জান তো–মিস্টিক গ্রুপ। শব্দ নিয়ে ওদের খুব অরিজিনাল থিংকিং আছে। তাদের ধারণা, শব্দ হচ্ছে সৃষ্টির মতো। সমস্ত জগৎ-সংসার সৃষ্টির মূল হল শব্দ। অবশ্য অন্যান্য ধর্ম এবং আধুনিক বিজ্ঞানও কাকবালাদের ধ্যান-ধারণা সমর্থন করে। বাইবেলে কি আছে? পরমপিতা ঈশ্বর বললেন, Let there be light, ওমি জগৎ সৃষ্টি হল। প্রথমে শব্দ, তারপর সৃষ্টি। এদিকে আমাদের হলি বুক দি কোরান বলছে–আল্লাহ বললেন কুন, ওমি জগৎ সৃষ্টি। বুঝতে পারছি?
বড়ই জটিল।
পড়াশোনা করি না বলেই জটিল বোধ হয়। কবিমাত্রেরই মিস্টিক কাকবালাদের সম্পর্কে জানা দরকার। কারণ কবি কাজ করেন শব্দ নিয়ে। কাব্বালাদের কাছে শব্দই সব। আচ্ছা, আজ যাও। আরেকদিন মডার্ন সায়েন্স শব্দ সম্পর্কে কি বলে বুঝিয়ে বলব।
আতাহার উঠে দাঁড়াল। তার অনেক কাজ–কণাকে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর যেতে হবে ব্ল্যাক লেবেলের সন্ধানে।ব
ঋতু গ্যালারী পাওয়া গেল। গ্যালারীর পাশে নিউমুন ফার্মেসীও পাওয়া গেল। ফার্মেসীর কর্মচারীদের ভেতর কাউকে পাওয়া গেল না, যার স্ত্রীর নাম কণা। শামছু নামের একজন কর্মচারীর দিন সাতেক আগে অষুধ চুরির দায়ে চাকরি গেছে। তার স্ত্রীর নাম কণা হতে পারে। তবে কেউ নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারল না। সামছু এখন কোথায় আছে তাও কেউ জানে না।
আতাহার নিশ্চিত বোধ করছে। চিড়িয়াখানা দেখানোর দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে। এক হাজার টাকা বেঁচে গেলো। ঐ টাকায় একটা হুইস্পিকার বোতল কিনে দিয়ে আসতে হবে। ঢাকা ক্লাবের কর্মচারিরা ক্লাবের হুইস্কি ব্ল্যাকে বিক্রি করে দেয়। একজন আছে, নাম সিদ্দিক। মুখ ভৰ্তি দাড়ি, মাথায় টুপি। দেখে মনে হবে বিরাট আল্লাহওয়াল। লোক। তলে তলে তার এই ব্যবসা। এক হাজার টাকায় ব্ল্যাক লেবেল হবে কি-না কে জানে।
