তুই তো দেখি প্রেমবিশারদ হয়ে গেছিস রে নীতু। বকবকানি বন্ধ কর।
নীতু চুপ করে গেল এবং একটু হকচকিয়ে গেল। আতাহার বলল, তোর অভিনয় ভাল হয়েছে। আমি বুঝতেই পারিনি অভিনয়। বাসায় ফিরে সেই রাতে তোকে স্বপ্নও দেখে ফেললাম।
কি স্বপ্ন দেখলেন?
তুই কি পাগল হয়েছিস? কি স্বপ্ন দেখলাম–আমি তোকে বলব না-কি? পরে তুই এই নিয়ে হাসাহাসি করবি।
আতাহার ভাই, আমি কোনদিন হাসাহাসি করব না।
অবশ্যই হাসাহাসি করবি। প্রেমের অভিনয় দেখিয়ে তুই আমার আক্কেল গুড়ুম করে দিয়েছিস। তোর কাছে স্বপ্ন বলে ধরা খাব না-কি? আমাকে এই রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দে।
ওখানে গেলে ট্রফিক জ্যামে আটকা পড়বি। আমাকে নামিয়ে দে। নীতু ড্রাইভারকে গড়ি থামাতে বলল। সে মূর্তির মত বসে আছে। তার ইচ্ছা করছে চিৎকার করে কীদে। কেন সে বলল–অভিনয়। এটা বলে তার লাভটা কি হল?
আতাহার নেমে গেছে। নীতু তাকিয়ে আছে। কিছুতেই সে তার চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছে না। সেও কি গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়বে? ছুটে গিয়ে আতাহার ভাইকে বলবে–আতাহার ভাই, গাড়িতে যা করেছি। সেটা অভিনয়। আমি আর কোনদিন আপনার সঙ্গে অভিনয় করব না। কোনদিন না।
গনি সাহেব
গনি সাহেব অফিসেই ছিলেন। পান খাচ্ছিলেন। তিনি এমিতে পান খান না, কোন কারণে মেজাজ অত্যন্ত ভাল হলে জর্দা দিয়ে একসঙ্গে দুটা পান মুখে দেন। আজ তাঁর মেজাজ ভাল। শুধু ভাল না–অত্যন্ত ভাল, বিটিসির ফুল পেজ বিজ্ঞাপন পেয়েছেন। ছমাসের কনট্রাক্ট। সরকারি বিজ্ঞাপন বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। তিনি লোক লাগিয়েছেন–সরকারি বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থাও হবে। জায়গামত খরচ করার লাইন বের করছেন। এতদিন লাইনটা পাওয়া যাচ্ছিল না। এখন পাওয়া গেছে। তাঁর মন ভাল হবার আরেকটি সূক্ষ্ম কারণ হল তাঁর অরুন্ধতি পুরকায়স্থ। প্রািফ দেখার জন্যে সম্প্রতি তিনি এই মেয়েটিকে রেখেছেন। হতদরিদ্র মেয়ে। লাজুক এবং ভীতু ধরনের। সেদিন প্রািফ নিয়ে অরুন্ধতি তাঁর ঘরে ঢুকতেই তিনি বললেন, দরজাটা ভিড়িয়ে দাও তো। অরুন্ধতি চোখ-মুখ কালো করে বলল, কেন স্যার? তিনি বিরক্ত গলায় বললেন, টাইপ রাইটারের খটখট শব্দে মাথা ধরেছে। মাথা ধরা নিয়ে কাজ করতে পারি না। অরুন্ধতি দরজা ভিড়িয়ে দিয়েছে। তিনি গভীর মনযোগে অরুন্ধতি কাটা প্রক্লফের উপর চোখ বুলিয়েছেন। একবারও মেয়েটির দিকে তাকাননি।
অরুন্ধতি আজ অফিসে আসেনি। তার মায়ের অসুখ। মাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। এই খবর ফোন করে জানিয়েছে। গনি সাহেব দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন। অল্পবয়েসী মেয়েদের অনেক কথা সরাসরি বলা যায় না–টেলিফোনে বলা যায়। গ্রাহাম বেল সাহেবের এটা একটা অসাধারণ আবিহুকার। টেলিফোনে আজ তিনি অরুন্ধতিকে বলেছেন তার প্রতি তিনি অন্য একধরনের টান অনুভব করেন। ব্যাপারটা প্লাটোনিক। মর্তের ধূলি-কাদার কোন ব্যাপার না। অরুন্ধতি শুধু শুনে গেছে, মাঝে মাঝে শুধু বলেছে, জ্বি জ্বি। অরুন্ধতির সঙ্গে কথা বলা শেষ করেই তিনি জর্দা দেয়া পান আনিয়েছেন। পাঁচটা সিগারেট কিনিয়েছেন। জর্দা বেশি হয়ে গেছে, মাথা অল্প অল্প ঘুরছে, তবে তাঁর ভাল লাগছে।
সুবৰ্ণর অফিস সেগুনবাগিচায়। সরকারের কাছ থেকে এনিমি প্রপাটি বন্দােবস্ত নিয়ে অফিস করা। দেয়াল দিয়ে ঘেরা প্রায় এক বিঘার মত জায়গা নিয়ে দোতলা বাড়ি। বাড়ি ভাঙাচোরা, পলেস্তারা উঠানো। গনি সাহেব ইচ্ছা করেই ঠিক করছেন না। ঠিক করলেই লোকজনের নজরে পড়বে। এনিমি প্রপাটি দ্রুত হাত বদল হয়। তলে তলে গনি সাহেব অবশ্যি অনেকদূর এগিয়েছেন। ব্যাক ডেটের দলিল, কাগজপত্র জোগাড় করছেন। যে সব কাগজপত্র প্রমাণ করে যে জনৈকা হরিদাঁসি এই সম্পত্তি তার কাছে ১৯৫৮ সনে বিক্রি করেছেন। পরে তা বেদখল হয়ে যায়। এইসব কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাজ। পুরানো স্ট্যাম্প খাজনার রশিদ পাওয়া মুশকিল। প্রচুর অর্থ লাগে, সময়ও লাগে। গনি সাহেব ধীরে ধীরে এগুচ্ছেন। এক কোটি টাকার একটা প্রপাটির ব্যাপারে তাড়াহুড়া করা যায় না। এখন কেউ বাড়ি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলে গনি সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেন–আমার কেনা জমি। সরকার এনিমি প্রপাটি ডিক্লেয়ার করে আমার কাছেই লীজ দিয়েছে। মগের মুল্লকে বাস করলে যা হয়।
কেউ যদি বলেন, মামলা ঠুকে দেন না কেন? তখন গনি সাহেব মুখ করুণ করে বলেন, মামলা-মোকদ্দমা কি করে করতে হয় তাও তো জানি না। পত্রিকা নিয়ে থাকি–এর বাইরে কিছু চিন্তা করতে পারি না। তুচ্ছ জমিজমা নিয়ে চিন্তা করতে ভাল লাগে না। লীজ নিয়ে আছি, ভাল আছি–যদি সরকার কোনদিন নিয়ে নিতে চায় তখন দেখব।
আতাহারকে ঢুকতে দেখে গনি সাহেব আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, আরে আতাহার, এসো এসো।
ভাল আছেন গনি ভাই?
আমার আর ভাল থাকাথাকি–ওলন্ড-এজ ডিজিজ প্রায় সব কটা ধরেছে। পাইলসের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। চেয়ারে এখন ঠিকমত বসতে পারি না। বাকা হয়ে বসতে হয়। চা খাবে তো? খাও, চা খাও।
গনি সাহেব বেল টিপে আতাহারকে চা দিতে বললেন। আতাহার চায়ের জন্যে অপেক্ষা করছে। তার কবিতা এই সংখ্যায় কেন যায়নি সে প্রসঙ্গ কিভাবে তুলবে বুঝতে পারছে না।
নতুন কিছু লিখেছ আতাহার?
জ্বি না।
এই তো তোমাদের সমস্যা। এক-আধটা হাফ ভাল কবিতা লেখ, তারপর ছাপাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়। তোমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে মনে হয়–তোমরা একটা উদ্দেশ্যেই কবিতা লেখা–ছাপানোর উদ্দেশ্যে। কবিতা লেখা হবে প্রাণের তাগিদে। ছাপা হওয়া না হওয়া পরের কথা।
