আতাহার চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, টাকাটা নিয়ে আয়— আমি ব্যাক ডোর দিয়ে খালাস হয়ে যাই।
এখন কি আপনি কণার কাছে যাবেন?
না, এখন আমি যাব দি গ্রেট গনি ভাইয়ের কাছে। ব্লাফার অব দি সেঞ্চরী। সুবৰ্ণ পত্রিকার মালিক। কবিতা ছাপবে বলে কথা দিয়ে ছাপেনি।
ভাল হয়নি বলে ছাপেনি।
কি বলিস, ভাল হয়নি! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা। শুনিবি? আমার মুখস্থ আছে।
মাফ করুন–কবিতা শুনব না। টাকা এনে দিচ্ছি–বিদেয় হোন।
নীতু খামে ভরে তিনটা পঁচিশ টাকার নোট নিয়ে এল। একটা বাড়তি নোট কেন আনল সে জানে না। সে কি আতাহার ভাইকে উপহার দিচ্ছে? গোপন উপহার? আতাহার ভাই খাম খুলে তিনটা নোট দেখে ভাববেন–ভুলে চলে এসেছে। তারপর নীতুর সেই ভুলের জন্যে তিনি আনন্দিত হবেন। নীতু জানে, তার টাকার খুব দরকার। বেচারার দুটা পাঞ্জাবি, একটা শার্ট। গত এক বছরে সে এই তিনটা কাপড়ই আতাহার ভাইকে ঘুরে-ফিরে পরতে দেখছে। তার মধ্যে একটা পাঞ্জাবির অবস্থা ভাল না। রং-টং জ্বলে বিশ্ৰী হয়ে আছে। তার বোধহয় সেটাই পছন্দ। আজিও সেটাই পরে আছেন। গত ঈদের পর নীতুর ধারণা হয়েছিল, আতাহার ভাই নিশ্চয়ই নতুন কোন শার্ট বা পাঞ্জাবি পরে আসবেন। রোজার ঈদে সবাই নতুন কাপড় পরে। কিন্তু আতাহার ভাই ঈদের দেখা করতে এলেন সেই কুৎসিত পাঞ্জাবিটা পরে। নীতু সেদিন যে শাড়িটা পরেছিল তার দাম নহাজার টাকা। শাড়িটা খুবই সুন্দর–হালকা সবুজের উপর সোনালী কাজ। সবুজ এবং সোনালী রঙ এক সঙ্গে যায় না। কিন্তু শাড়িটাতে সোনালী কাজ সুন্দর ফুটেছিল।
শাড়ি যত সুন্দরই হোক নীতুর গায়ে মানায়নি। কোন ভাল কাপড়ই তার গায়ে মানায় না। আয়নায় নিজেকে দেখেই সে বুঝেছে তাকে দেখাচ্ছে গেছো পেত্নীর মত। লম্বা কোন বঁশিগাছের মাথায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকলেই তাকে মানাবে। অন্য কোথাও মানাবে না। ঈদের শাড়ি খুলে ফেলা যায় না বলে সে খেলেনি। আতাহার ভাইয়ের সামনে এই শাড়ি পরে বের হবার সময় সে লাজায় প্রায় মরে যাচ্ছিল। আতাহার ভাই তাকে দেখে বিদ্রুপ মাখা কঠিন কোন কথা অবশ্যই বলবেন। হো হো করে হাসতে হাসতে বলবেন, এই শাড়ি পরে তোকে তো পেত্নীদের রানীর মত লাগছে রে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, আতাহার ভাই সেদিন তাকে দেখে মুগ্ধ গলায় বলেছিলেন–তোকে তো সম্রাস্ত্রীর মত লাগছে রে নীতু। প্রথমে নীতু ভেবেছিল ঠাট্টা। যখন টের পেল ঠাট্টা না, তখন আনন্দে তার চোখে পানি এসে যাবার মত হওয়ায় সে দ্রুত সরে গেলো।
ঈদের দিনের সেই শাড়ি সে আর পরেনি। যত্ন করে তুলে রেখেছে। শুধু শাড়িটা না, সেদিন সে যা যা পরেছিল সবই তুলে রেখেছে। চুল বেঁধেছিল সাদা ফিতায়–সেই ফিতা, স্ট্রাইপ দেয়া জুতা সব তোলা আছে। কোন এক বিশেষ উপলক্ষে সে আবার পারবে। কে জানে হয়ত আতাহার ভাইয়ের বিয়ের দিনই পরবে।
নীতু গম্ভীর মুখে আতাহারকে খাম এনে দিল। তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল যখন সে দেখল আতাহার ভাই খাম পকেটে না ঢুকিয়ে টাকা বের করে গুনতে বসেছে।
আতাহার বিরক্ত গলায় বলল, নীতু, তোর টাকা বেশি হয়ে গেছে। পঁচিশ টাকা বেশি দিয়ে দিয়েছিস।
দিয়েছি যখন রেখে দিন।
রেখে দেব মানে! ধর, নে।
নীতু নোটটা হাতে নিল। আতাহার বলল, এখন দয়া করে পেছনের দরজা দিয়ে আমাকে বের করে দে। চাচার সামনে পড়তে চাচ্ছি না।
নীতু বলল, আরেক কাপ চা খেয়ে যাবেন?
না। দি গ্রেট গনিকে ধরতে হবে। দেরি করলে অফিসে পাব না।
গনি সাহেবের অফিসটা কোথায়?
সেগুনবাগিচায়।
আমি ঐ দিকেই যাব। বড় ফুপুর বাসায়। চলুন আপনাকে নামিয়ে দি।
বাসায় রোগী ফেলে তুই ফুপুর বাসায় যাবি কি জন্যে? ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের মত সেবা কর।
ভাইয়া কারো সেবা নেবে না। এখন জ্বর মাথায় নিয়ে দরজা বন্ধ করে কবিতা লিখছে। কাজেই আমার থাকা না থাকা সমান।
গাড়িতে উঠেই নীতু বলল, ঐ দিন আপনার মুখের ভঙ্গি দেখে খুব মজা পেয়েছি আতাহার ভাই।
কোন দিন?
ঐ যে, যেদিন আপনি জিজ্ঞেস করলেন–তুই কি আমার প্রেমে পড়েছিস? আর আমি বললাম—হুঁ।
এইসব কথাবার্তা ড্রাইভারের সামনে বলাটা কি ঠিক হচ্ছে?
নীতু কাঁধ বঁকিয়ে বলল, কোন অসুবিধা নেই। শুনুন আতাহার ভাই, ঐ দিন প্রথম আমি টের পেলাম যে, আসলে আমি খুব বড় মাপের অভিনেত্রী।
প্রতিটি মেয়েই খুব বড় মাপের অভিনেত্রী। জন্মসূত্রেই তারা অড্রে হেপবর্ণ।
আমার অভিনয়-ক্ষমতা তাদের চেয়েও ভাল। কারণ ঐ দিন। আপনার সঙ্গে আমি চমৎকার অভিনয় করলাম–চোখে পানি পর্যন্ত নিয়ে এলাম। আপনি বুঝতেও পারলেন না। ভাবলেন সত্যি। চোখ-মুখ কি রকম হয়ে গেল। হিহিহি।
অভিনয় ছিল না-কি?
অভিনয় তো বটেই। আমি শুধু শুধু আপনার প্রেমে পড়তে যাব কেন?
প্রেমে তো মেয়েরা শুধু শুধুই পড়ে।
আমি পড়ি না। যাই হোক, ঐ দিন আপনার সঙ্গে অভিনয় করাটা ঠিক হয়নি। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।
আচ্ছা বেশ, ক্ষমা করলাম।
আপনার কি মন খারাপ লাগছে আতাহার ভাই?
মন খারাপ লাগবে কেন?
নীতু তার ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল, একটা ছেলে যখন শুনে কোন মেয়ে তার প্রেমে হাবুড়ুবু খাচ্ছে তখন সেই ছেলে প্রচণ্ড মানসিক তৃপ্তি লাভ করে। মেয়েটা কালো কুচ্ছিত হলেও কিছু যায় আসে না। মেয়েটা দেখতে কেমন সেটা তখন ছেলেটার মনে থাকে না–তার মনে থাকে শুধু প্রেমের ব্যাপারটা। প্রেমের তো কোন বর্ণ নেই। কালো মেয়ের প্রেম যেমন, রূপবতী মেয়ের প্রেমও একই রকম …
