আতাহার মাথা চুলকে বলল, একটা খুব জরুরি কাজ আছে চাচা।
জরুরি কাজ তো থাকবেই। পৃথিবীর সব কাজই জরুরি–কার্লাইলের একটা কথা আছে– Most trivial job–is the most important job.
আতাহার বসবে কি বসবে না, মন স্থির করতে পারছে না। তাকে আরো কিছুক্ষণ এ বাড়িতে থাকতে হবে। নাশতা না খেয়ে সে বেরুতে পারবে না। খিদের চোটে এখন মাথা ঘোরা শুরু হয়েছে। নাশতা না খেয়ে সে বেরুতে পারবে না। খিদের চোটে এখন মাথা ঘোরা শুরু হয়েছে। নাশতা তৈরি হলে নীতু তাকে আলাদা ঘরে নিশ্চয়ই ডেকে নিয়ে যাবে। তখন মুক্তি পাওয়া যাবে। আশা করা যায়, নাশতা ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। দুটা পরোটা ভজতে তিন ঘণ্টা লাগার কথা না।
আতাহার
জ্বি চাচা।
আউট অব দ্য ট্ৰেক তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি–কিছু মনে করো না। কণা মেয়েটি কে?
কার কথা বললেন?
কণা। কাল রাতে জ্বরের ঘোরে সাজাদ কণা কণা বলে চেঁচাচ্ছিল। তার পছন্দের কেউ থাকলে তুমি আমাকে বলতে পার। ফ্যামিলি ব্র্যাকগ্রাউন্ড যদি ভাল হয়—আমার দিক থেকে কোন সমস্যা নেই। এইসব ব্যাপারে আমি খুবই লিবারেল। যুগ পাল্টাচ্ছে— যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরও পাল্টাতে হবে। আমাদের সময় আর এখনকার সময় তো এক না। তোমার চাচীকে যখন বিয়ে করি তখন তার বয়স ছিল ওনলি থারটিন। বিয়ের আগে আমি তাকে চোখেও দেখিনি। আমার এক মামা-শ্বশুর মুনশি সদরুদ্দিন পাশা–খুলনার নাম করা উকিল, সুফি মানুষ। তিনি আমাকে বললেন, হোসেন, সারা জীবনের জন্যে একটা মেয়েকে বিয়ে করতে যােচ্ছ–একবার চোখের দেখাও দেখবে না? মেয়ে ফর্সা না কালো, কানা না খোড়া, জানার দরকার না? আমাদের ধর্মে বিবাহের আগে কন্যা দেখার বিধান আছে। আমি বললাম, মামা, আপনারা তো দেখেছেন। আমার দেখার কোন দরকার নেই। বিয়ে হয়ে গেল। তোমার চাচীকে প্রথম দেখলাম বাসর রাতে। সে এক অভিজ্ঞতা। চল্লিশ বছর আগের কথা, এখনো মনে হয় এই তো সেদিন …
আতাহার নীতুর জন্যে অপেক্ষা করছে। এত দেরি করছে কেন মেয়েটা? কতক্ষণ লাগে দুটা পরোটা বানাতে?
আতাহার!
জ্বি চাচা।
বাসর রাতের ঘটনাটা শোন। খুবই ইন্টারেস্টিং–বিয়ে হয়েছিল চৌদ্দই শ্ৰবণ। ইংরেজ্বি ১৯৪০ সন–বৃটিশ পিরিয়ড। বিয়ের আসরে খুলনার কালেক্টর মিস্টার কেলভিন সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন। কেলভিন সাহেবের স্ত্রীর নাম–এলেনা, অনিন্দ্য সুন্দরী। অল্প অল্প বাংলা জানেন। অতি মিশুক স্বভাব …
পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। নিৰ্ঘাৎ নীতু। আতাহার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। এক্ষুণি মুক্তি পাওয়া যাবে। এখন ডাবল আগ্রহের সঙ্গে বৃদ্ধ ছাগলের বিয়ের গল্প শোনা যেতে পারে। যদিও বন্ধুর বাবাকে বৃদ্ধ ছাগল বলা ঠিক হচ্ছে না। মানুষটা খারাপ না। তার গল্পগুলি খারাপ। দুনিয়ার ডালপালা নিয়ে গল্প শুরু করে। গল্প বলা শিখানোর কোন স্কুল থাকলে এই ছাগলাকে সে নিজ খরচে ভর্তি করিয়ে দিত।
আতাহার ভাই, আপনার নাশতা দেয়া হয়েছে। আসুন।
হোসেন সাহেব ব্যস্ত হয়ে উঠলেন–যাও যাও, নাশতা খেয়ে আসা। তারপর জমিয়ে আডডা দেব। হাটের উপর একটা ধাক্কা চলে যাবার পর ঘরেই বসে থাকি। আমার বাসররাতের গল্প একটা অসাধারণ গল্প। তুমি ছেলের বয়েসী, তোমাকে বলা ঠিক হচ্ছে না। তবু শুনে রাখা–সংস্কৃতে একটা শ্লোক আছে … কি যেন শ্লোক–দ্বাদষ বর্ষেন্তু পুত্র … মনে পড়ছে না। স্মৃতি বিভ্রাট হচ্ছে। নীতু মা, আমাকে চিনি—দুধ ছাড়া এক কাপ চা।
আতাহার খুব আশা করেছিল নাশতায় পরোটা-গোশত থাকবে। তার আশা ভঙ্গ হল। রুটি, মাখন, কলা, একটা সিদ্ধ ডিম। ছোট্টগ্রাসে হলুদ রঙের কি যেন দেখা যাচ্ছে–মনে হচ্ছে কমলার রস–ইংলিশ ব্রেকফার্স্ট।
মিস রোবটী মুখ কালো করে নাশতার টেবিলে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ অন্যদিনের চেয়েও গভীর। আতাহার বলল, নীতু, সাজ্জাদের শরীর-টরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসছে। ওকে বরফের মধ্যে চুবাতে হবে।
নীতু জবাব দিল না। মনে হচ্ছে এই সংবাদ সে জানে।
আর শোন, আমাকে এক হাজার টাকা দিতে হবে। ভাবিস না যে আমার নিজের জন্যে দরকার। আর যাই করি, বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার করি না! সাজ্জাদের জন্যেই টাকা দরকার। আমার কথা বিশ্বাস না হলে সাজ্জাদের কাছ থেকে ভেরিফাই করতে পারিস।
নীতু বলল, আপনাকে এত কথা বলতে হবে না। নাশতা খান–আমি টাকা এনে দিচ্ছি।
টাকাটা কি জন্যে দরকার শুনতে চাস না?
আপনার বলার ইচ্ছা হলে বলতে পারেন। আমি আগ বাড়িয়ে শুনতে চাই না।
কণা নামের একটা মেয়েকে নিয়ে গিয়ে চিড়িয়াখানার বাঁদর দেখিয়ে আনতে হবে।
কণাটা কে?
জানি না কে। চাঁদের কণা হবে।
আপনি সত্যি জানেন না কে?
না।
জ্বরের ঘোরে কাল রাতে ভাইয়া কণা কণা বলে চেঁচাচ্ছিল। আমার ধারণা, খুব খারাপ ধরনের কোন মেয়ে–ভয়ংকর খারাপ। ভাইয়া আজেবাজে জায়গায় যায়। আপনিও হয়ত যান। ঐ মেয়ে সেই সব জায়গার।
হতে পারে–কবি চণ্ডিদাস বলেছেন–
যেথা যার মজে মন
কিবা হাড়ি কিবা ডোম।।
নীতু ভুরু-টুরু কুঁচকে বলল, এই জাতীয় একটা মেয়ের সঙ্গে ভাইয়ার পরিচয়ে আপনি মনে হয় খুব খুশি।
আমার খুশি-অখুশি কোন ব্যাপার না। সাজ্জাদ খুশি হলেই আমি খুশি। তাছাড়া তুই যা ভাবছিস তা না, কণা মেয়েটা খুবই ভদ্র একটা মেয়ে। কারোর বিবাহিতা লক্ষ্মী টাইপ স্ত্রী। যার সংসার আছে–পুত্রকন্যা আছে।
আতাহার ভাই, প্লীজ, আপনার বকবকানি শুনতে আর ইচ্ছা করছে না। বাবার সঙ্গে থেকে থেকে আপনারও বিশ্ৰী কথা বলা রোগ হয়েছে।
