আতাহার সুবর্ণ ছিড়ে ছিড়ে টুকরো টুকরো করল না, তবে নর্দমার দিকে জুড়ে দিল। পেটের খিদে এই মুহুর্তে ভালই জানান দিচ্ছে। সরকার থেকে কবিদের যদি খাদ্য পাস দিত তাহলে চমৎকার হত। সেই পাস যে কোন রেস্টুরেন্টে দেখালেই রেস্টুরেন্টের মালিক একগাল হেসে বলবে–স্যার, বসুন। কি খাবেন বলুন।
কি আছে। আপনার এখানে?
অনেক কিছুই আছে। আপনার কি খেতে ইচ্ছে বলুন দেখি।
ড়ুবা তেলে গোটা দশেক লুচি ভাজুন। ভুনা গরুর গোশত দিন। এক প্লেট কলিজি, আর এক প্লেট মুরগির মাংস। সিরকায় ভিজিয়ে বড় বড় পেঁয়াজ দিন। ইন্ডিয়ান মিষ্টি পেঁয়াজ না, বাংলাদেশী পেঁয়াজ। ঝােঝ আছে। এ রকম পেঁয়াজ। ভুটানের কাচামরিচের আচার আছে? থাকার কথা না। ঐ আচার আনিয়ে দিন। নাশতার পর পর তিন কাপ চ্যা খাব। রেডি রাখবেন। চায়ের সঙ্গে রথম্যান সিগারেট। দেখবেন যেন ড্যাম্প না হয়। নাশতার সঙ্গের সিগারেট ড্যাম্প হলে নাশতাটাই মাটি।
স্যার, আরাম করে বসুন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সব এসে যাচ্ছে। এই ফাকে একটু তেহারী কি চেখে দেখবেন? এই মাত্ৰ হাড়ি নেমেছে। আপনাকে দিয়ে বিসমিল্লাহ করি।
দিন, খেয়ে দেখি আপনাদের তেহারী। সঙ্গে ঝাল কাঁচামরিচ দেবেন। কাচামরিচ মিষ্টি হলে, খবৰ্দার, তেহারী খাব না।
সারা পথ খাওয়াদাওয়ার কথা চিন্তা করতে করতে আতাহার সাজ্জাদাদের বাড়িতে উপস্থিত হল। গতকালের ভাঙা গাছ এখনো বাড়ির ওপর পড়ে আছে। তবে গাছ থেকে ঝরে পড়া ডাল, লতাপাতা, ভাঙা জানালার কাচের টুকরা পরিষ্কার করা হয়েছে। একটা গাছ বাড়িতে ভেঙে পড়ে আছে এই দৃশ্য এখন দেখতে ভালই লাগছে। এ বাড়িতে কোন ছেলেপূলে থাকলে গাছ বেয়ে ছাদে উঠে। মজা করতে পারত। তার নিজেরই গাছ বেয়ে ছাদে উঠতে ইচ্ছে করছে।
বাড়ির দারোয়নের কাছ থেকে জানা গেল সাজ্জাদ আছে। সুসংবাদ, বলাই বাহুল্য। যাবতীয় সুসংবাদের সঙ্গে সামান্য হলেও দুঃসংবাদ মিশে থাকে। জানা গেল হোসেন সাহেব মাঝের ঘরে বসে আছেন। দোতলায় সাজ্জাদের ঘরে যেতে হলে মাঝের ঘর দিয়ে যেতে হবে। হোসেন সাহেবকে ডিঙ্গিয়ে সাজ্জাদের কাছে যাওয়া সম্ভব হবে না। সে কি ফিরে যাবে? ফিরে যাবেই বা কোথায়? ক্ষিদেয় প্ৰাণ যাচ্ছে। বাড়ির উপর হেলে পড়ে থাকা আমগাছটা সেদ্ধ করে দিলে খেয়ে ফেলতে পারে এমন অবস্থা।
নীতু বারান্দায় ফুলের টবে পানি দিতে এসে আতাহারকে দেখল। তার চোখে আগ্রহ বা অনাগ্রহ কিছুই দেখা গেল না। আতাহার বলল, কটা বাজে রে নীতু?
নীতু সঙ্গে সঙ্গে বলল, নটা চল্লিশ। ঘড়ি দেখল না বা দ্বিধা করল না। মনে হচ্ছে কম্পিউটারের মত তার নিজের ভেতর ঘড়ি ফিট করা আছে।
তোদের নাস্তা করা হয়ে গেছে?
আপনি আবারো নাশতা না করে এসেছেন?
হুঁ। লজ্জা-শরম বিসর্জন দিয়েছি বলতে পারিস।
ভাইয়ার ঘরে বসুন। নাশতা পাঠিয়ে দেব।
রোবটের গলায় কথা বলছিস কেন? মানুষের মত কথা বল।
মানুষের মতই কথা বলার চেষ্টা করছি। আপনার কাছে হয়তো বা রোবটের মত শুনাচ্ছে।
আমার উপর কোন কারণে কি রেগে আছিস?
রাগ-অভিমান এইসব উচ্চ শ্রেণীর ব্যাপার। আমার মধ্যে নেই। আমি আসলেই খানিকটা রোবট।
রোবট না, তুই হলি রোবটী–রোবটের স্ত্রীলিঙ্গ রোবটী।
আমার সঙ্গে কথা বলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করছেন। দয়া করে ভাইয়ার ঘরে চলে ।
যব কিভাবে? সিঁড়ির গোড়ায় পাহারাদার।
বাবা ঘুমুচ্ছেন। চুপি চুপি সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাবেন। বাবা টের পাবেন না।
থ্যাংকস ফর দা টিপ। নাস্তা একটু তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিস নীতু। খিদেয় মারা যাচ্ছি।
নীতু জবাব দিল না। ঝাঝাড়ি দিয়ে টবে টবে পানি দিতে লাগল। তার চোখ-মুখ কঠিন হয়ে আছে। ঐ দিনের ঘটনার পর সে ঠিক করে রেখেছে আতাহারের সঙ্গে আবার দেখা হলে সে খুব খারাপ ব্যবহার করবে। এবং এক ফাঁকে জানিয়ে দেবে প্রেমে পড়ার ব্যাপারে ঐ দিন যে কথা বলেছিল সেটা আসলে অভিনয়। সে আতাহারের প্রেমে পড়েছে এটা শোনার পর আতাহারের মুখের ভাব কেমন হয় এটা দেখাই ছিল তার আসল উদ্দেশ্য।
সাজ্জাদ হাত-পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। তার গায়ে পাতলা চাদর। চোখ লাল। সাজ্জাদের গায়ে জ্বর। কিছুক্ষণ আগে থার্মেমিটার দিয়ে জ্বর দেখা হয়েছে। একশ তিন। সাজ্জাদের ধারণা, থার্মোমিটারে কোন সমস্যা আছে। এতটা জ্বর তার নিজের কাছে মনে হচ্ছে না। গা খানিকটা ম্যাজ ম্যাজ করছে, চোখ জ্বালা করছে এ পর্যন্তই। একশ তিন জ্বর হলে ঘরে আটকা পড়ে থাকতে হবে। ব্যাপারটা ভয়াবহ।
আতাহারকে দেখে সাজ্জাদ বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসল। আতাহার বলল, জ্বর না-কি?
হুঁ।
মুরগি-বসন্ত না তো? মুরগি-বসন্ত চারদিকে হচ্ছে। গায়ে কি র্যাশ বের হয়েছে?
না তো।
বের হবে। শুরুতে হেভি জ্বর আসে, তারপর র্যাশ ট্যাশ বের হয়ে ছোরা বেড়া। ভাইরাসের বেশ কিছু চেঞ্জ হয়েছে। মুরগি-বসন্তের মুরগি ভাব নেই–এখন রীতিমত শক্তিশালী। ঘোড়ার মতই শক্তিশালী। চিকেন পক্স নাম পাল্টে হর্স পক্স রাখার পাঁয়তারা হচ্ছে।
ভয় দেখাচ্ছিস না-কি?
ভয় দেখাব কেন? যেটা সত্যি সেটা বললাম। তোর জ্বর কি এখন একশ তিন?
হুঁ।
যা ভেবেছি তাই। প্রথম দু-তিনদিন জ্বর তিন-চারে উঠানামা করবে। তোর এখানে বেশিক্ষণ বসাও নিরাপদ না–আমি নাশতা খেয়েই বিদেয় হচ্ছি।
যাবি কোথায়?
গনি ভাইয়ের কাছে একটু যাব। কয়েকটা মিষ্টি কথা উনাকে বলব।
এই সংখ্যায় তোর কবিতা যাওয়ার কথা ছিল?
