আতাহার সাত টাকা দিয়ে সুবর্ণ কিনল। নিজের কবিতা আছে কি-না এক্ষুণি দেখার দরকার নেই। আপাতত পত্রিকা পাঞ্জাবির পকেটে থাকুক। পরে শান্তিমত দেখা যাবে। সে দশ টাকা নিয়ে বের হয়েছিল–সাত টাকা পত্রিকা কিনতে গেল, দুটাকা গেল সিগারেটে। শুধুমাত্র এক টাকা সম্প্ৰল করে ঢাকা শহরে ঘোরা যায় না। আতাহার কি করবে বুঝতে পারছে না। টাকার সন্ধানে বাড়িতে ফিরে যাওয়া এই মুহূর্তে অর্থহীন। রশীদ সাহেব আজ ভোর ছটা থেকে তুর্কি নাচ নাচছেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র পরীক্ষা দেয়নি এই খবর তিনি আজ ভোরবেলা পেয়েছেন। কে তাকে খবর দিয়েছে সেটা একটা রহস্য। আতাহার দেয়নি, মিলিও দেয়নি। এক হতে পারে, কালপ্রিন্ট নিজেই দিয়েছে। তারপর দৌড়ে নিজের ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। ভোর ছটায় আতাহারের ঘুম ভেঙেছে তার বাবার চিৎকারে।
বাড়িঘর সব জ্বলিয়ে দেব। আগুন দিয়ে ছারখার করে দেব। আমার প্রতিটি পয়সা অনেস্ট পয়সা। রক্ত পানি করা পয়সা। এই বৃদ্ধ বয়সে গাধার মত পরিশ্রম করছি। আর আজি–এই তার প্রতিদান? না, আমি কিছু রাখব না। আগুন দিয়ে সব জ্বলিয়ে দেব।
বক্তৃতা দিতে দিতেই তিনি ফরহাদের দরজায় প্রচণ্ড লাথি দিলেন। লাথির সঙ্গে সঙ্গে হুংকার–আইনস্টাইন হয়েছে। সহজ প্রশ্ন দেখে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। আয় এখন কঠিন প্রশ্ন দেখ। তোর চামড়া আজ আমি খুলে নেব। জুতাপেটা করব। বাটা কোম্পানির জুতা কত শক্ত আজ পরীক্ষা হয়ে যাবে।
রশীদ সাহেব চিৎকার করেন, দরজায় লাথি দেন এবং দু হাতে প্রবলবেগে কড়া নাড়েন। আতাহারের ইচ্ছে করছে ছোট ভাইয়ের পাশে দাঁড়াতে, তবে এ রকম বিপদসংকুল অবস্থায় দরজা খোলার কোন মানে হয় না। আতাহার বাসি মুখে সিগারেট ধরিয়ে পশ্চিম রণাঙ্গন নিশ্চুপ হবার কামনা করতে লাগল। মা বাসায় থাকলে সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। তবে মিলি আছে। সে বাবাকে সামলাবার চেষ্টা করবে। এখনো করছে না কেন তা বোঝা যাচ্ছে না।
মনে হয় ঝড়ের প্রথম ধাক্কাটা পার হবার জন্যে অপেক্ষা করছে।
রশীদ সাহেবের হৈ-চৈ হঠাৎ বন্ধ হয়। পশ্চিম রণাঙ্গন পুরোপুরি নিশাচুপ। আতাহারের ধারণা হল মিলি তাকে তার ঘরে ঢুকিয়ে ফেলেছে। এই ফাকে ঘর থেকে বের হয়ে আজ দিনের মত ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া দরকার। আজ আর কিছুতেই বাবার সামনে পড়া ঠিক হবে না।
আতাহার দরজা খুলে বের হল। বারান্দা ফাঁকা। সে মোটামুটি নিশ্চিন্ত মনে রান্নাঘরের দিকে গেল। মতির মা বা মিলি রান্নাঘরে থাকলে চা পাওয়া যাবে।
মিলি রান্নাঘরে ছিল। আতাহার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বলল, চা-টা কিছু হবে না। বাবার মেজাজ খুব খারাপ। হৈ-চৈ করে এখন শরীর খারাপ করেছে। বুক ধড়ফড় করছে। শুয়ে আছেন। তুই বাইরে কোথাও চা খেয়ে নে। আজ নাশতা—টাশতা কিছু বানোব না। মাকেও দেখতে যেতে হবে। মার অবস্থা ভাল না।
বলিস কি!
মা বার বার তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল। একবার মনে করে দেখতে যাবি।
আচ্ছা যাব। ফরহাদ করছে কি? বাবার ঠেলা খাবার পর তার অবস্থা কি?
সে তার মতোই আছে। পড়ছে।
সাব্বাস! মনে হচ্ছে বাপকা বেটা।
রসিকতা করিস না ভাইয়া। আমার মন-টন ভাল না।
যেখানে বাসার এই পরিস্থিতি সেখানে টাকার সন্ধানে বাসায় যাওয়া যায় না। সবচে ভাল বুদ্ধি হাসপাতালে চলে যাওয়া। মার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্পগুজব করে উঠে দাঁড়ানো মাত্র মা বালিশের নিচ থেকে একটা নোট বের করে তার পকেটে খুঁজে দেবেন। সেটা একশ টাকার সবুজ নোট হতে পারে যা শস্যশ্যামলা বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দেবে। আবার পঞ্চাশ টাকার লাল নোটও হতে পারে যা মনে করিয়ে দেবে প্রভাতের সূর্যোদয়ের কথা। সমস্যা একটাই–হাসপাতালে যেতে হবে হেঁটে হেটে। ভোরবেলা খালি পেটে হাঁটতে পারেন। শুধু স্বাস্থ্য-প্রেমিকরা। যাঁরা দীর্ঘ দিন নিরোগ দেহে বাঁচতে চান। সে নিজেও দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকতে চায়, তবে তার জন্যে খালি পেটে মাইলের পর মাইল হাঁটতে চায় না।
হাসপাতালের মেইন কলাপসিবল গেট বন্ধ। টুল পেতে দুজন দারোয়ান বসে আছে। দুজনেরই মনে হয় খারাপ ধরনের জণ্ডিস হয়েছে। চোখ গাঢ় হলুদ। আতাহার গেটের কাছে দাঁড়াতেহ একজন বলল, পাস। পাস আছে?
দিনের শুরুতেই মিথ্যা বলা ঠিক হবে না ভেবে আতাহার বলল, পাস নেই।
পাস ছাড়া ঢোকা যাবে না।
পাস কে দেয়?
অফিসে গিয়ে খোঁজ করেন।
অফিস কোথায়?
জানি না।
হাসপাতালের কাজ করেন। আর আপনাদের অফিস কোথায় জানেন না?
গেইটের মুখে ঝামেলা কইরেন না। পাস ছাড়া ঢুকামু না। সোজা কথা। পাস দেখান–ভিতরে ঢুকেন?
আতাহার ফিরে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে শুধুমাত্র কবিদের জন্যে একটা বিশেষ পাস থাকা উচিত–ইউনিভাসেল পাস। যে পাস দেখিয়ে যে কোন জায়গায় যাওয়া যাবে। বঙ্গভবনের গেটে পাস দেখালে মিলিটারী পুলিশ এটেনশন হয়ে স্যালুট দেবে। সিনেমা হলে পাস দেখালে হলের ম্যানেজার নিজে এসে ডিসিতে বসিয়ে দেবে। ইন্টারভ্যালের সময় হাতে কোকের বোতল ধরিয়ে দেবে।
রাস্তায় যেতে যেতে আতাহারের মনে হল সুবৰ্ণতে তার কবিতা খুব সম্ভব ছাপা হয়নি। আজ দিনটা অশুভ। এই দিনে কবিতা প্রকাশিত হবার মত শুভ কিছু হবে না। ঝড়বৃষ্টির মধ্যে গনি সাহেবের এন্টাসিড কিনে দিয়েও ফল হয়নি। আতাহার পাঞ্জাবির পকেট থেকে পত্রিকা বের করল। যা ভেবেছিল, তাই। তার কবিতা নেই। তার মন ভয়ংকর খারাপ হয়ে গেল। পত্রিকাটা কুচি কুচি করে ছিড়তে পারলে রাগ কমার সম্ভাবনা আছে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পত্রিকা ছেঁড়া ঠিক হবে না। লোকজন আড়চোখে তাকাবে। কাগজ ছেড়ার সঙ্গে পাগলামির একটা সম্পর্ক আছে। প্রাথমিক স্তরের পাগলরা কাগজ
